পার্থসারথি পাণ্ডা:
বঙ্গজীবনে ‘হাল ফ্যাশান’ শব্দটি জায়গা করে নেওয়ার পেছনে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির সকলেরই কমবেশি অবদান আছে। এখন বলতে শুরু করেছি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা। তাঁর এ ব্যাপারে উদ্ভাবনী ক্ষমতা ছিল অসাধারণ।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি। ১৮৪৮ সাল। দেবেন্দ্রনাথ তখন তিরিশ-একত্রিশ বছরের যুবক। বিলেতে মারা গেলেন বাবা দ্বারকানাথ ঠাকুর। ব্যবসাবাণিজ্যে তিনি যেমন অনেক টাকাকড়ি করেছিলেন, তেমনি মারা যাওয়ার আগে অনেক দেনাও করে গেছিলেন। ফলে, উত্তরসূরী হিসেবে সেই দেনার দায় বর্তালো দেবেন্দ্রনাথের ওপর। তিনি যুবক, বাবুলোক এবং সম্ভ্রমজ্ঞান অসম্ভব রকমের। ফলে, বাবার দেনা পাইপয়সা ধীরে ধীরে মিটিয়ে দিলেন। আর সেসব মেটাতে গিয়ে তাঁর তখন কপর্দকশূন্য অবস্থা। ঠাকুরবাড়ির বিশাল পরিবারটিতেও সেকারণে ডামাডোল অবস্থা।
এইরকম পরিস্থিতিতে বাবু দেবেন্দ্রনাথের নেমন্তন্ন এলো শোভাবাজার রাজবাড়িতে। সেখানে গানের জলসা হবে। সেই জলসায় কলিকাতা শহরের মানীগুনী মানুষেরা যেমন আমন্ত্রিত, তেমনি যত বড়লোক, জমিদারেরাও আমন্ত্রিত। সেখানে যে কি পরিমাণ বড়লোকি ঘটা হবে, অঙ্গে হিরেজহরতের জাঁকজমক হবে, সে সকলেই আন্দাজ করতে পারছিলেন। বাবু দেবেন্দ্রনাথের অবস্থার কথা ততদিনে সবাই জেনে গেছেন। সবাই ভাবছেন এই আমন্ত্রণে কপর্দকশূন্য দেবেন্দ্রনাথ কি আসবেন? এলেও কোন সাজে আসবেন? কে বেশি বড়লোক সেটা জাহির করার মতো জায়গাই তো হল এইসব রাজকীয় সভা, জলসা। কাজেই, শুরু হল চামচামহলে কানাঘুষো।
এদিকে দেবেন্দ্রনাথও ভাবছেন সাধারণ বেশে গেলে মান থাকে না, না-গেলেও মান যায়। গায়ে সেকালের প্রথা অনুযায়ী দামী পোশাক আর অলংকারের জাঁক করার মতো সামর্থ্য তাঁর নেই। তিনি ভাবতে শুরু করলেন, কীভাবে নিজের সামর্থ্যে মাত দেওয়া যায়, ঝামা ঘষে দেওয়া যায় আদেখলা বাবুদের। ভাবতে ভাবতে তাঁর মাথা থেকে বেরুলো এক দারুণ উপায়!
ঠাকুর বাড়িতে এক পুরুষ ধরে চাহিদামাফিক গয়না গড়ে জোগান দেন করমচাঁদ জহুরী। তাঁর ডাক পড়ল। তিনি ছুটে আসতেই দেবেন্দ্রনাথ বরাত দিলেন মখমলের জুতো তৈরি করে মুক্তো বসিয়ে দিতে। করমচাঁদ দুধ সাদা মখমলের জুতো তৈরি করালেন। তারপর শিল্পীমনের ছোঁয়ায় মুক্তো দিয়ে অপূর্ব সজ্জায় সাজিয়ে দিলেন জুতোজোড়া। সে এক দেখার মতো জিনিস হল বটে। তবে মুক্তোর দাম আর মজুরি, ধার, জমিদারি খাতায় লেখা রইলো। এগুলো বছর শেষে মেটানোর কথা।
যাই হোক, জলসার দিন সাজ করলেন বটে দেবেন্দ্রনাথ! গায়ে সাদা আচকান উঠল, মাথায় ‘মোড়াসা পাগড়ি’, পায়ে সাদা মুক্তোখচিত সাদা মলমলের জুতো। সাদায় সাদায় তিনি যেন তখন এক সৌম্য ঋষি, সবার থেকে আলাদা। এই বেশে জলসায় যখন তিনি ঢুকলেন তখন গমগমে সভা তাঁকে দেখে বিস্ময় স্তব্ধ হয়ে গেল। তাঁর শ্বেতবসনের ছটায় রাজরাজড়ার হিরেজহরত যেন ম্লান হয়ে গেল। সভায় কৌচে মুক্তোখচিত পাদুকা দুখানি বের করে বসলেন! শেষটা বলি অবনীন্দ্রনাথের কথায়— খোদ শোভাবাজারের রাজা ছেলেছোকরাদের ইশারা করে বললেন, ‘দেখ তোরা দেখ, একবার চেয়ে দেখ এ দিকে, একেই বলে বড়লোক। আমরা যা গলায় মাথায় রেখেছি ইনি তা পায়ে রেখেছেন।’
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news