Breaking News
Home / TRENDING / এমন লেখা আরও লেখো, ‘তরমুজ’ কটাক্ষ হেসে উড়িয়ে বলে ছিলেন সোমেন

এমন লেখা আরও লেখো, ‘তরমুজ’ কটাক্ষ হেসে উড়িয়ে বলে ছিলেন সোমেন

রন্তিদেব সেনগুপ্ত:

এটা হচ্ছে নয়ের দশকের ওই সময়, যখন আমি বর্তমান পত্রিকায় লেখালেখিতে ছিলাম। একদিন একটা লেখার হেডিং ছিল ‘তরমুজ ফোবিয়া অথবা আধা বামপন্থী জ্বর’। ওই লেখাটা বেরোনোর পর তরমুজ কথাটা খুব প্রচলন হয়ে গিয়েছিল রাজ্য রাজনীতিতে। ওই লেখায় কংগ্রেসের দু’জন প্রথম সারির নেতার বিরুদ্ধে শ্লেষ ও আক্রমণ ছিল। একজন হচ্ছেন সোমেন মিত্র, আর আরেকজন হচ্ছেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। যতদূর মনে পড়ছে লেখাটা যখন প্রকাশিত হয়, সম্ভবত তখন সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় ছিলেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি।

ওই লেখাটি যেদিন বেরোল, সেদিন দুপুরে বিধানসভার লবিতে সোমেনদার সঙ্গে আমার দেখা। আমি দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম, এইভেবে যে সোমেনদা কী বলবেন? হয়তো রেগে যাবেন, যা তা বলবেন আমাকে। কিন্তু তা হল না। সোমেনদা হাসতে হাসতে আমাকে বললেন জানো আজকে একটা মজা হয়েছে। আমি বললাম, কী? সোমেনদা বললেন, সকালে আমি যখন বিধানসভায় আসব বলে তৈরি হচ্ছি, খাওয়া-দাওয়া করছি। দেখছি ভাইয়ের বউরা আমাকে খেতে দিচ্ছে, আর মিঠি মিঠি করে হাসছে। তো আমি বুঝতে পারিনি, কি হয়েছে। কী হয়েছে বলতে, ওরা আমাকে বর্তমান কাগজটা দেখাল। তোমার লেখাটা আমি পড়লাম। আমার বেশ ভাল লেগেছে। এরকম আরও দু’একটা লেখো।

সেদিন আমি অবাক হয়েছিলাম, যাঁর বিরুদ্ধে লিখলাম, তিনি কিন্তু একটুও আমাকে কটুক্তি করলেন না, শ্লেষ করলেন না, আঘাত করলেন না। তিনি কিন্তু ব্যাপারটা ভালভাবেই নিলেন। আর এটাই সর্বদা সোমেন মিত্রের মধ্যে ছিল। সোমেন মিত্র হচ্ছেন বাংলার গুটিকয়েক রাজনীতিবিদদের মধ্যে একজন, যিনি সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ছিলেন। আমি পেশাগত জীবনে সোমেনদাকে কাছ থেকে দেখেছি। সোমেনদা বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতেন। কেউ সমালোচনা করলে সেটা মন দিয়ে শুনতেন। ভালোভাবে গ্রহণ করতেন। কখনও ক্রুদ্ধ হতে দেখিনি। এখন যেটা হয় কেউ একটু বিরুদ্ধে লিখলে, বাড়িতে ঢুকতে দেবো না, পুলিশ লেলিয়ে দেবো পিছনে, নবান্নে ঢুকতে দেবো না, মাওবাদী দেগে দেওয়া হচ্ছে। সোমেনদার মধ্যে কিন্তু এগুলো ছিল না, একদম ছিল না।

সোমেন মিত্র হচ্ছেন সেই রাজনৈতিক নেতা যাঁর মামা, কাকা, দাদা, বাবা রাজনীতিতে ছিলেন না। তিনি কিন্তু আন্দোলন করে ওঠা একজন মানুষ। অসম্ভব দক্ষ সংগঠক ছিলেন সোমেন মিত্র। কংগ্রেসের প্রতিটি জেলার, প্রতিটি অঞ্চলের কর্মীকে নামে চিনতেন তিনি। আর এটা না হলে নেতা হওয়া যায় না। ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নেতা কিন্তু নেতা হয় না। সোমেনদার কিন্তু নেতা হওয়ার গুণটা ছিল। এমনকি দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে আপদে-বিপদে তিনি পাশে থেকেছেন। তাঁদের রক্ষা করেছেন। হাসিমুখে তাঁদের কথা শুনেছেন। একজন নেতার যা যা গুণ থাকা দরকার, সোমেন মিত্রের সবকটিই ছিল। এখন অনেকে নেতা হয়েছেন, ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নেতা। দলের কর্মীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নেই। আরেকটা বড় গুণ সোমেনদার যেটা ছিল এত বছরের রাজনৈতিক জীবনে, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধী নেতাদের কখনও অপমানজনক মন্তব্য করতে শুনিনি। এটা কিন্তু তিনি কখনও করতেন না। রাজনৈতিক সৌজন্য দেখিয়েছেন বরাবর। মতবিরোধ যাই থাক না কেন।

বয়স হয়েছিল চলে গেলেন সোমেন দা। এটা কংগ্রেসের রাজনীতিতে একটা শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। এবং এই মুহূর্তে সোমেনদার মতো নেতা কিন্তু প্রদেশ কংগ্রেসে নেই। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির শারীরিক অসুস্থতার কারনে রাজনীতি থেকে সরে যাওয়াটা কংগ্রেসের কাছে এক অপূরণীয় ক্ষতি ছিল। তারপর তো প্রিয় দা মারাই গেলেন। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার পর যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল তার মূল্য দিতে হয়েছে কংগ্রেসকে। কংগ্রেসের সংগঠন অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। সোমেন মিত্র চলে যাওয়াতে কংগ্রেসের সংগঠন আরেকবার দুর্বল হয়ে পড়বে। তার চেয়ে বড় কথা সোমেন মিত্ররা চলে যাচ্ছেন, আর এক এক যুগের অবসান হয়ে যাচ্ছে। এবং এটা হচ্ছে সেই যুগ যেখানে রাজনৈতিক সৌজন্য ছিল। নেতারা সব সময় যে ৮কোনও আন্দোলনের প্রথম সারিতে থাকতেন। মানে কর্মীরা এগিয়ে যাবে আর নেতা পিছনে থাকবে এটা ছিল না এনাদের মধ্যে। সেই যুগটা চলে যাচ্ছে ক্রমশ। সুব্রত মুখোপাধ্যায় রইলেন। সেই যুগের সাক্ষী হয়ে। সোমেনদাকে আমার প্রণাম। সোমেনদা যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন।

লেখকঃ বর্ষীয়ান সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ।

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *