দেবপ্রসাদ রায়
(প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ ও বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা)
আমি সোমেনদা কে চিনেছি পরে, জেনেছি আগে। ‘৬০-এর দশকের শেষদিকে বিধান সভা নির্বাচনের খবর পড়ছিলাম, জনসেবক (অধুনা লুপ্ত) পত্রিকার পাতায়। প্রথম পাতায় খবর,’বীজপুরে ভোট গণনার পর আক্রান্ত কংগ্রেসের যুব নেতা সোমেন মিত্র। এই প্রথম কংগ্রেস রাজ্যে সংখ্যাগড়িষ্ঠতা পেল না।বীজপুরে বীজেশ সেন পরাজিত হলেন। ‘৬৬ টির খাদ্য আন্দোলনের আবহে রাজ্যে কংগ্রেসের পরাজয় অপ্রত্যাশিত ছিল না। কিন্তু আমি উৎসাহিত হলাম, এক যুব নেতার কাহিনী পড়ে। বাইরে জনতার আক্রোশের আভাষ পেয়েও গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত হল না ছাড়ার মানসিক দৃঢ়তা কেউ এই দূঃসময়ে দেখাবার সাহস রাখে যে মানুষটি, তাকে দেখবার একটা তাগিদ অনুভব করি। দেখা যদিও হলো, আরও তিন বছর পর।
নকশালের তাড়া খেয়ে বরেন জেঠুর (বরেন ভৌমিক) পরামর্শে জলপাইগুড়ি ছেড়ে কোলকাতা এলাম।হ্যারিসন রোড ও আমর্হাষ্ট ষ্ট্রীটের মোড়ের মেস বাড়িতে বাচ্চুদা (অসিত বোস) থাকত।ওর ঘরেই ঢুকে পড়লাম। সমস্যা খুলে বলাতে ও বলল, চল বিকেলে তোকে সোমেনদার কাছে নিয়ে যাব। সেই প্রথম দেখা।৪৫, আমর্হাষ্ট ষ্ট্রীটে আস্তানা।কম্যুউন বলাই ভাল। নানা এলাকা থেকে তাড়া খেয়ে আসা কর্মীদের আশ্রয় স্থল। ভদ্রলোকের তাতে কোনও তাপ উত্তাপ নেই।মুখে স্মিত হাসি লেগেই আছে। দু’বেলা সবার জন্য রুটি তড়কা আসছে। আর সবাই দিন গুনছে কবে ছোড়দা এলাকায় ফেরার ব্যবস্থা করে দেবে।পরিস্থিতি পাল্টাতে বেশী সময় লাগেনি।বাংলাদেশের মূক্তিযূদ্ধ আমাদের সবাইকেই এক এক করে মূক্তি দিয়েছিল।ধীরে ধীরে যে যার এলাকায় ফিরে এসেছিলাম। ‘৭২ থেকে ‘৭৭ গোষ্ঠীদ্বন্দে বিদীর্ণ দলে কে কোথায় ছিলাম সেটা আজ আর প্রাসঙ্গিক নয়।
প্রাসঙ্গিক হল কঠিন দিন গুলোতে আবার একসঙ্গে চলার সিদ্ধান্ত নেওয়া। ‘৭৭-এ যখন প্রথম সারির নেতারা সবাই ইন্দিরাজীকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে, সেই বাতাবরণে কোলকাতার ‘লাহা বাড়ি’তে রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচনে আমি, সোমেন দা, বীরেন দা ‘নো ইন্দিরা, নো কংগ্রেস’ ব্যানার লাগিয়ে ভোট করে হেরে গেলাম ঠিকই কিন্তু আনুগত্য কোন দিকে তা সুস্পষ্ট করে তুলে ধরতে পারার ভেতর একটা শ্লাঘা ছিল। এবারও অপেক্ষা বেশীদিনের নয়। ‘৭৮ এর জানুয়ারীতে বিভাজন আর ফেব্রুয়ারীতে অন্ধ্র, কর্নাটক ও মহারাষ্ট্রে সরকার গঠন প্রমান করে দিল ইন্দিরা যেখানে কংগ্রেস সেখানে। আমরা তখন যুব কংগ্রেসে।আমি জাতীয়স্তরে সাধারন সম্পাদক, সোমেন দা রাজ্য সভাপতি।’৭২ থেকে টানা বিধায়ক, সংখ্যালঘু নিয়ন্ত্রিত শিয়ালদা কেন্দ্র থেকে। হাতের তালুর মত নিজের এলাকা চিনতেন, আর চিনতেন মানুষ গুলোকে। ‘৭৭ বাদ দিলে ২০০৬ পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে সেই কেন্দ্রের জন প্রতিনিধি থেকেছেন। ছোট কেন্দ্র ছিল। খুব কম পরিবার পাওয়া যাবে, যে বাড়ি তে ওনার কল্যানে কেউ না কেউ চাকরী পায়নি। চাকরীর ব্যবস্থা করে দেওয়া সোমেন দার প্যাশন ছিল। প্রনবদা বরকতদা,এমনকী সঞ্জয় গাঁধী ,রাজীব গাঁধীকেও সুযোগ পেয়ে কর্মপ্রার্থীর তালিকা ধরিয়ে দিয়েয়েছেন। রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন তিন দফায়। দু’বার নির্বাচিত,একবার মনোনীত। জনসম্মোহনী ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু সংগঠনে সোমেনদার প্রভাব ছিল ঈর্ষা করার মত। কুমারগ্রাম থেকে ঝাড়গ্রাম সর্বত্র তার অনুগামীরা দলে তার নেতৃত্ব কে সব সময় প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।
নুতন করে দায়িত্ব পেয়ে দিল্লীর সাউথ এক্সটেনশনের গেষ্ট হাউস থেকে ফোন করে ডেকে জানালেন, দল আবার দায়িত্ব দিয়েছে। আমাকে প্রদেশে সময় দিতে হবে। মনে মনে ভাবলাম,আমি তো সময় দেব, কিন্তু দল এ সময়ে তোমার সময় না চাইলেই ভাল হত। কারন আগের মানুষটা অর্ধেক হয়ে গেছে! শরীর উপেক্ষা করে শেষদিন অবধি দায়িত্ব পালন করে গেলেন। পরের প্রজন্ম যেন তোমার অবদানকে স্মরণ রাখার দায়িত্ব পালন করতে ভূলে না যায়।সোমেনদা ভাল থেকো
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news