ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণে বর্ষীয়ান সাংবাদিক দেবাশিস দাশগুপ্ত
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দু’দিন আগেই মোবাইলে কথা হচ্ছিল সোমেন দার সঙ্গে। বললাম, এসব আন্দোলন তান্ডলন করছেন, ভালো কথা। কিন্তু শরীরের দিকে নজর দেবেন। সাবধানে থাকবেন। উনি বললেন, হ্যাঁ, দেবাশিস, সাবধানেই থাকছি। তুমিও সাবধানে থেকো।
সেটাই সোমেন দার সঙ্গে আমার শেষ কথা। তারপর তো হাসপাতালে ভর্তি হলেন। দিন চারেক আগেই আমার প্রিয় কংগ্রেস নেতা তাতা ভট্টাচার্যের একটা ফেসবুক পোস্ট দেখলাম, সোমেন দা সুস্থ হয়ে উঠছেন। দেখে একটু আশ্বস্ত হলাম। গতকাল রাতে সব ওলট পালট হয়ে গেল। চলে গেলেন আমার অভিভাবক সোমেন দা।
সেই ১৯৮৫-৮৬ সাল থেকে আলাপ। পরে ঘনিষ্ঠতা। যখন সোমেন দা জানলেন, আমার বাবা, কাকার পরিচয়, তখন সেই ঘনিষ্ঠতা হয়ে উঠল পারিবারিক। আমার বাবা (প্রয়াত সাংবাদিক কুমুদ দাশগুপ্ত) আদ্যন্ত বামপন্থী হলেও সোমেন দাকে খুবই স্নেহ করতেন। কাকার (প্রয়াত সাংবাদিক বিরাজ দাশগুপ্ত) সঙ্গেও খুবই সখ্যতা ছিল সোমেন দার। বাবা, কাকার সুবাদেই কি না, জানি না। সোমেন দা আমাকে খুবই ভালোবাসতেন। ১৯৯২ সালে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচনের সময় থেকে খুব কাছ থেকে দেখেছি মানুষটাকে। মমতা ব্যানার্জিকে হারিয়ে তিনি প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি হলেন। তার আগে থেকেই তাঁর সঙ্গে মমতার বিরোধ। কংগ্রেসে গোষ্ঠী রাজনীতি বরাবরই ছিল। আছে, থাকবেও। বরকত সাহেবের কাছের লোক হিসেবে পরিচিত সোমেন মিত্রের নিজেরও একটা গোষ্ঠী ছিল। সেটা অস্বীকার করে লাভ নেই। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচন পর্বে দলের একাংশ এবং মিডিয়ার অধিকাংশের প্রচুর গালাগালি, প্রচুর বিলো দা বেল্ট অপমান, আক্রমণ সহ্য করতে দেখেছি সোমেন দাকে। আমাকে বলতেন, ভোটটা হতে দাও। সভাপতি নির্বাচনে জিতে সব অপমানের জবাব দেব। ওই সময়ে এটাও দেখেছি, কিছু সাংবাদিক প্রকাশ্যে সভাপতি নির্বাচনে মমতার হয়ে মাঠে নেমেছিলেন। মিডিয়ার একাংশ এবং মমতার গোষ্ঠী সোমেন মিত্রকে সিপিএমের ‘দালাল’ বানিয়ে ছেড়েছিল। মূলত মমতার সেই অভিযোগ ঘিরেই পরবর্তীকালে তৃণমূলের জন্ম হয়। মমতা হয়ে ওঠেন অবিসংবাদী নেত্রী। তার আগে ১৯৯৬ সালে বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের প্রার্থী তালিকার বিরোধিতা করে তখনকার যুব কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা ব্যানার্জি আলিপুরে ট্রেজারি অফিসের সামনে গলায় চাদর জড়িয়ে আত্মহত্যার হুমকি দেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ওই তালিকায় কয়েকজন সমাজবিরোধীর নাম রয়েছে। তাঁদের বাদ না দিলে তিনি আত্মহত্যা করবেন বলে জানান। পরে দেখা গেল, তিনি যাঁদের সমাজবিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছিলেন, তাঁরা সকলেই ভোটে জিতে গিয়েছেন। ভাগ্যের এমনিই পরিহাস, তাঁর দাগিয়ে দেওয়া সেই সমাজবিরোধী কংগ্রেস বিধায়কদের মধ্যে কেউ কেউ পরে তৃণমূলে চলে যান। তাঁদের অনেকে আজ তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতা।
কংগ্রেস মহলে সোমেন দার পরিচিতি ছোড়দা বলে। বড় মনের মানুষ ছিলেন তিনি। তাঁর অনুগ্রহ বা সাহায্য পাননি, এমন কংগ্রেস সমর্থক খুব কমই আছেন। শুধু দলীয় কর্মী নন, অনেক সাধারণ মানুষকেও তিনি অযাচিত ভাবে সাহায্য করেছেন। এরকম অনেক ঘটনার সাক্ষী আমি নিজে। ১৯৭৭-এ প্রবল কংগ্রেস বিরোধী হাওয়ায় সোমেন দা হেরে গেছিলেন, এই বিরতি বাদ দিলে ১৯৭২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত টানা শিয়ালদা কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন তিনি। খুব আড্ডাবাজ ছিলেন। হাজি মহম্মদ মহসিন রোডে তখন কংগ্রেস দপ্তর ছিল। কত আড্ডা হয়েছে সেই সময়ে। ছাড়তেই চাইতেন না। বলতেন, আরে বসো, বসো। পরে যাবে অফিসে। এমনও হয়েছে, ফোন করে প্রদেশ কংগ্রেস দপ্তরে ডেকে নিয়ে গিয়েছেন স্রেফ আড্ডা দেবেন বলে। নিজে যেমন খেতে ভালোবাসতেন, তেমনি খাওয়াতেও ভালোবাসতেন। একটা ঘটনা মনে আছে। উত্তরবঙ্গের ফরওয়ার্ড ব্লক বিধায়ক রমজান আলি এমএলএ হস্টেলে খুন হন। তার প্রতিবাদে কংগ্রেস বাংলা বনধ ডেকে দেয়। পরে তদন্তে দেখা যায়, এর পিছনে মহিলাঘটিত কোনও বিষয় ছিল। তখন মোবাইল ফোনের যুগ নয়। তো বনধ সফল হল। বেলায় সোমেন দা অফিসের ল্যান্ড লাইনে ফোন করে প্রদেশ কংগ্রেস দপ্তরে চলে আসতে বললেন। তখন বর্তমান অফিস ছিল জোড়া গির্জার কাছে। কংগ্রেস অফিসে গিয়ে দেখি, আরও কয়েকজন সাংবাদিক হাজির। এলাহী খাওয়ার আয়োজন। ইলিশ মাছের নানা পদ। আমি বললাম, বনধ ডেকে এসব হচ্ছে, সোমেন দা? শুনে মৃদু হাসলেন।
কত আড্ডা হয়েছে বিধানসভায় কংগ্রেস অফিসে। অনেক কথা মনে পড়ছে। সেই প্রবল মমতা বিরোধী সোমেন দা ২০০৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে নিজের দল গড়লেন প্রগতিশীল ইন্দিরা কংগ্রেস। তখন তাঁর সঙ্গী এখনকার মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, জয়ন্ত ভট্টাচার্য ও আরও অনেকে। ২০০৯ সালে সেই দল তুলে দিয়ে সোমেন দা ভিড়লেন তৃণমূলে। ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের টিকিটে জিতলেন। আবার তৃণমূল ছেড়ে চলে এলেন কংগ্রেসে। যেদিন তিনি কংগ্রেসে ফিরলেন, মৌলালিতে বিধান ভবনের সামনে সে কী বিপুল জনস্রোত, কী উন্মাদনা! সেটাই বুঝিয়ে দিচ্ছিল, সোমেন দার জায়গা কংগ্রেসে, তৃণমূলে নয়।
শরীর অনেক দিন ধরেই খারাপ। সেই ভাঙা শরীরেই ২০১৮ সালে দিল্লি তাঁকে ফের প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি করল। অনেক দিন ধরেই সোমেন মিত্র বলে আসছিলেন, কংগ্রেস আর বামেরা হাত ধরে না চললে এই রাজ্যে বিজেপি আর তৃণমূলকে ঠেকানো যাবে না। বামেরাও সেটা বুঝেছে দেরিতে হলেও। এখন করোনা এবং আমপান পর্বে কংগ্রেস এবং বামেদের যৌথ কর্মসূচি চলছে। আগামী বিধানসভা ভোটে যাতে এই দুই শক্তির জোট আরও মজবুত হয়, সেই চেষ্টা চালাচ্ছিলেন সোমেন মিত্র। তাঁর মৃত্যুতে সেই প্রচেষ্টা বড় ধাক্কা খেল।
সেই সাতের দশক থেকে রাজ্য রাজনীতির অনেক উত্থান পতনের সঙ্গে জড়িত সোমেন মিত্রের নাম। আমহার্স্ট স্ট্রিটের তথা উত্তর কলকাতার ডাকাবুকো কংগ্রেস নেতা ছোড়দা যে পরবর্তীকালে রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি হবেন, তখন কে তা জানত। কংগ্রেসের গোষ্ঠী রাজনীতিতে কখনও কোণঠাসা, কখনও ডুবে যাওয়া, আবার কখনও ভেসে ওঠা, দলকে নেতৃত্ব দেওয়া, সব অভিজ্ঞতাই তাঁর হয়েছে। এখনও অনেকে রাজ্য কংগ্রেসে ভাঙ্গনের জন্য সোমেন মিত্রকেই দায়ী করে। তিনি কতটা দায়ী, সেটা ইতিহাস পরে প্রমাণ করবে। তবে কংগ্রেসের প্রতি তাঁর ভালোবাসা যে একেবারে একশো শতাংশ নিখাদ ছিল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
লক ডাউনের আগেও বেশ কয়েকবার বিধান ভবনে সোমেন দার সঙ্গে অনেক কথা হয়েছে রাজ্য রাজনীতি নিয়ে। লক ডাউনের মধ্যে চাক্ষুষ দেখা হয়নি। কিন্তু ফোনে কথা হত নিয়মিত।
আর কখনও মোবাইলের অপর প্রান্ত থেকে শুনতে পাব না, ‘দেবাশিস, বল, খবর কী।’
ভাবতে পারছি না।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news