জয়ন্ত চৌধুরী :
লাইভ বিতর্কে সোমেন মিত্র!
শুনে খটকা লাগা স্বাভাবিক। ২০০১ সালে সেটা হয়েছিল। ওই একবারই , এই দুই দশকে তার পুনরাবৃত্তি হয়নি। কোনো টিভি বিতর্কে অংশ নেননি সোমেন দা। চলতি শতকের গোড়ায় বাংলায় বেসরকারি বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যমের যাত্রা শুরু বলা যেতে পারে। অবশ্য ১৯৯৮ সালে দুরদর্শনে অর্থাৎ সরকারি মাধ্যমে প্রথম বেসরকারি দৈনিক খবরের ক্যাপসুল সম্প্রচারিত হয় ,খাস খবর। কিন্তু সেখানে লাইভ প্রোগ্রামের অবকাশ ছিল না।

২০০১ সালে বিধানসভা নির্বাচন। বছর খানেক আগে ‘খবর এখন’ শুরু হয়। কেবল চ্যানেলে সেই খবর সম্প্রচারিত হত। কলকাতা কেন্দ্রিক ‘খবর এখন’ জন্মলগ্ন থেকেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাই ভোটের মুখে অন্য ধরনের কিছু প্রোগ্রাম করার পরিকল্পনা করে কর্তৃপক্ষ। কলকাতার সবকটি বিধানসভার প্রধান দুই প্রতিপক্ষকে স্টুডিওতে মুখোমুখি বসিয়ে বিতর্কের আয়োজন।
টিভি তে এর আগে লাইভ প্রোগ্রাম বিশেষত রাজনৈতিক বিষয়ে হলেও তাতে দর্শকদের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল না। টিভি স্ক্রিনে ফুটে ওঠা ফোন নম্বরে শ্রোতা-দর্শক নিজেদের প্রশ্ন নিজের বিধানসভার প্রার্থীকে সরাসরি করতে পারত। রাজনীতি নিয়ে এমন প্রোগ্রাম তার আগে হয়নি। অন্তত বিধানসভা নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে তার আগে কোনও টিভি বিতর্ক কেউ কল্পনা করেছিল কি না বলা কঠিন। সেই অর্থে ‘খবর এখন’ এর উদ্যোগ শুধু ব্যতিক্রমী নয় , তৎকালীন বাংলার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে দুঃসাহসিকও বটে।
খবর এখন- এর নিউজ বুলেটিনের পর শুরু হত ‘নারদ নারদ’ লাইভ । প্রতিদিন একটা করে বিধানসভার প্রধান দুই প্রতিপক্ষের প্রতিনিধি হাজির হতেন। মূলত তৃণমূল ও বামফ্রন্টের প্রার্থী মুখোমুখি , মধ্যে বিতর্কের পরিচালক বা অ্যঙ্কর। কয়েকটি ক্ষেত্রে অবশ্য কংগ্রেস প্রার্থীও অংশ নিতেন। তখন তিনজন প্রার্থী একসঙ্গে থাকতেন। এই ধারাতেই এল শিয়ালদহ বিধানসভা কেন্দ্র। সেখানে বিধায়ক সোমেন মিত্র। তাঁর বিরুদ্ধে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সিপিআই এর চঞ্চল ঘোষ। আমার উপর দায়িত্ব পড়ল সোমেন মিত্র কে নির্দিষ্ট দিনে সাউথ এন্ড পার্কের স্টুডিও তে হাজির করানো। সোমেন সেই সময় নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত। অন্য কেন্দ্রের প্রার্থীরা কমবেশি নিজের কেন্দ্রেই প্রচারে ব্যস্ত থাকেন। সোমেন দা রাজ্য কংগ্রেসের মুখ। তাই নিজের বিধানসভার বাইরে ভিন জেলাতেও কংগ্রেস প্রার্থীর জন্য তাঁকে প্রচারে যেতে হত। ভোটের তখন সপ্তাহ খানেক বাকি। সোমেন দার ঠাসা কর্মসূচি। কিন্তু তার মধ্যেই তাঁকে স্টুডিও তে লাইভ ইন্টারাক্টিভ প্রোগ্রামে ঘড়ির কাঁটা মেপে নিয়ে যাওয়াটা কঠিন নয় অসম্ভব। এমনটাই জানিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠরা। বেগতিক দেখে সোমেন দার ছায়া সঙ্গী বাদল দা (ভট্টাচার্য) র শরণ নিলাম। তিনি আমার বিপন্নতা মালুম পেলেও সোমেন দা ভোটের মুখে ওই ধরণের প্রোগ্রামে আদৌ আগ্রহী নন বলে সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন। আমি আরও আতান্তরে। কেননা বাদল দার কথাই শেষ কথা , বিশেষত নির্বাচনের মরশুমে। তাঁকে রাজি করানো কঠিন চ্যালেঞ্জ আমার মতো সামান্য কেবল চ্যানেলের রিপোর্টারের কাছে। উল্লেখ্য, সেবার সুব্রত মুখোপাধ্যায় কে বাদ দিলে কলকাতায় বিরোধী শিবিরে সোমেন দার মতো হেভিওয়েট মুখ নির্বাচনের ময়দানে ছিল না। অগত্যা সরাসরি তাঁর কাছে গিয়েই আর্জি জানালাম। প্রথমে নিমরাজি হলেও শেষে সম্মত হলেন। সোমেন দা কে রাজি করানো গিয়েছে। স্বভাবতই বেশ স্বস্তি নিয়েই ফিরলাম অফিসে। ‘নারদ নারদ’ অনুষ্ঠান এ অংশগ্রহণকারীদের নাম দিয়ে প্রত্যেক প্রোগ্রামের দিন খবরের কাগজে ছোট্ট একটা বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হতো। সোমেন দার সম্মতি পেতে তা ছাপাও হয়ে গেল। বিকেল নাগাদ সোমেন দা নিজের এলাকায় পদযাত্রায় বার হবেন। আমি সেই প্রচার কভার করতে গেলেও আসল উদ্দেশ্য সন্ধ্যা সাত টার আগেই সোমেন দা কে সাউথ এন্ড পার্কে স্টুডিও তে হাজির করানো।
মির্জাপুর স্ট্রিটের কাছে একটা অপরিসর গলিতে পদযাত্রা ঢুকতেই শুরু হলো বৃষ্টি। আর সোমেন দা তো নিছক ভোট প্রার্থী নন, শিয়ালদার গলিঘুঁজির ঘরের ছেলে। ফলে বৃষ্টির মধ্যে পদযাত্রা থমকালেও একটি বাড়ির উঠোনে বসেই চললো জনসংযোগ। অফিস থেকে ম্যানপ্যাক এ ঘন ঘন জানতে চাইছে আমরা কতদূর। ততক্ষনে চঞ্চল ঘোষ পৌঁছে গিয়েছেন। হাতে ঘন্টা খানেক সময় নেই। কোনও মতে প্রতিপক্ষ স্টুডিও তে উপস্থিত না হলে গোটা প্রোগ্রাম অর্থহীন হয়ে পড়বে। খবর এখন এর মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে। শরীরের পারদ চড়তে শুরু করেছে। প্রচন্ড টেনশন। হটাৎ ভিড় ঠেলে সোমেন দার কাছে পৌঁছে গিয়ে আমার অবস্থার কথা জানালাম। সোমেন দা আমার করুন আর্জি শুনে হেসে বললেন , যাও আমি আসছি। হাতে তখন মিনিট চল্লিশ। বাদল দা কে জানিয়ে দিলেন ,পদযাত্রা ঐদিনের মতো স্থগিত। সেদিন ঠিক সাতটার মধ্যে ঘর্মক্লান্ত সোমেন দাকে নিয়ে পৌছেছিলাম স্টুডিও তে। বিতর্কে তো বটেই এমনকি টেলিফোনে শ্রোতা- দর্শকদের আলটপকা সওয়ালের জবাবও দিয়েছিলেন আমহার্স্ট স্ট্রিটের ‘ছোড়দা ‘। সেই প্রথম , সেই শেষ। সোমেন দা কে কোনও দিন আর টিভি তে লাইভ বিতর্কে দূরস্ত কোনও লাইভ প্রোগ্রামে হাজির হতে দেখা যায়নি। শিয়ালদহ কেন্দ্র তাঁর ঘরবাড়ি। বরাবরের মতো সেবার মসৃন জয় পেয়েছিলেন সোমেন দা। সেই বিজয়ে ওই বিতর্ক আদপে কোনও সদর্থক ভূমিকা নিয়েছিলো কিনা ,তা নিয়ে সংশয় থাকলেও ,তাঁর সেদিনের সহযোগিতা আজ তাঁর বিদায় লগ্নে ফের উঁকি দিল।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news