ঋত্বিক মুখোপাধ্যায়:

আমরা কয়েকজন সাংবাদিক তখন রাজনীতির বিট করতাম। তাই বিভিন্ন দলের পার্টি অফিসে যেতাম। সেই সময় এখনের মতো পরিবেশ এতটা কলুষিত ছিল না। তবে সাংবাদিকদের মধ্যে সোমেন-মমতা গোলোযোগ নিয়ে একটা মুখরোচক ব্যাপার ছিল। যদিও তখন দু’জনে একই দল করতেন। একদিন এই গোলযোগ নিয়ে মমতার সঙ্গে সোমেনের রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়। ওই বৈঠক শেষে সোমেনদা বেরোনোর সময়, এক সাংবাদিক বলেন, ‘সোমেনদা আপনিও ব্যাচেলর, মমতাও ব্যাচেলর। দু’জনের এতক্ষন ধরে এমন কী নিয়ে কথা হল যে আলোচনা শেষই হতে চাইছিল না? না, মানে আমি বলছি না ছেলে ছোকরারা বলছে।’ সোমেনদাও পানের পিকটা ডাস্টবিনে ফেলে আস্তে আস্তে উত্তর দিলেন, ‘আমরা এটা নিয়ে আলোচনা করছিলাম যে বেরিয়ে রণেনদা যখন জিজ্ঞাসা করবে তখন কী বলব।’ ওই সাংবাদিকের নাম ছিল রণেন।
আরেকবার মনে আছে এখন প্রয়াত জয়নাল আবেদিন সাহেব, কংগ্রেসের মন্ত্রী ছিলেন প্রবীণ নেতা। ওনার ছেলে কিছুতেই বিয়েতে রাজি হচ্ছিল না বলে খুব চাপ চলছিল। বিশেষ করে জয়নাল সাহেবের স্ত্রীর দিক থেকে চাপ আসছিল খুব। আবেদিনদা সোমেনদাকে দায়িত্ব দিয়েছিল বিয়েতে রাজি করানোর জন্য। যেহেতু ওনার ছেলে সোমেনদার খুব ভক্ত ছিল তাই বিয়েতে রাজি করানোর দায়িত্ব সোমেনদার ওপর! জয়নালদার ছেলেকে বেশ কিছুক্ষণ বোঝানোর পরে বেরিয়ে এসে সোমেনদা আমাদের বলেছিলেন, ‘বাবা কি খপ্পরে জয়নাল ফেলেছিল আমাকে! এতক্ষণ বোঝালাম। ছেলে চুপ করে শুনল। শেষে বলে কী না, ছোটদা আমি এত দিন বিয়ে করেননি কেন?
তখনও সোমেনদা সাংসারিক জীবনে পা রাখেনি। এরকম নানা মজার ঘটনা আজকে বিশেষ করে মনে পড়ছে। ওই সময় কয়েকজন বিরল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কাছাকাছি আমরা চলে এসেছিলাম।
আমার মনে আছে আমার চিনের উপর লেখা প্রথম বইটা বেরোনোর পরের কথা। নিজের বই নেতাদের দেওয়ার একটা আলাদা উত্তেজনা থাকে। সোমেনদা বইয়ের কভারটা দেখে বলেছিলেন, ‘ভূমিকা অনিল বিশ্বাস! বাবা আমি জানতাম তুই কৃষ্ণেন্দুর বন্ধু এখন অনিল বিশ্বাসের কাছে পৌঁছে গেলি! চিনতে কি ভুল করেছিলাম? তখন আমি বলেছিলাম, না চিনতে ভুল করেননি, বইটা চিনের তো তাই অনিল বিশ্বাসের নামটা গিয়েছে।
আমি ইকোনোমিক টাইমসে যখন কাজ করতাম, তখন সেই কাগজের সম্পাদক সোমেনদার নামে অন্ধ ছিলেন। আমরা তাই সহ কর্মীরা আড়ালে আবডালে বলতাম উনি হচ্ছেন চোরা কংগ্রেসি। সাংবাদিক এবং সম্পাদক পরিচয়টা আছে বলে হয়তো প্রকাশ্যে কিছু বলেন না। কিন্তু ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে থেকে থেকে সেটা প্রকাশ পায়। সেই সময় নির্বাচন ছিল, সম্পাদক বললেন, একদিন সময় কর যাব সোমেনদার বাড়িতে। সোমেনদার আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়িতে সম্পাদককে নিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখলাম উনি পরবর্তী মিটিং নিয়ে রকে বসে আলাপ আলোচনা চালাচ্ছেন। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরে উনি আমাদের কাছে এলেন। কথাবার্তা শুরু হল। এই সময় সম্পাদক বিড়বিড় করে কিছুক্ষন বলার পর সোমেনদার পায়ের উপর রাখা হাতটা ধরে বললেন, সোমেনদা কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে অর্থমন্ত্রী কে হবেন? সোমেনদা কিছু না ভেবেই বললেন, আছে আছে। আর না থাকলে আপনি তো এত বড় সম্পাদক আপনাকেই বানিয়ে দেব! এরপর যখন আমরা ওই বারান্দা দিয়ে হেঁটে এগোচ্ছি, এগোতে এগোতে আমার সম্পাদক মহাশয় ওনাকে বলেছিলেন, ‘যদি অভয় দেন, তাহলে আরেকটা ব্যাপারে আপনাকে জিজ্ঞেস করি। আপনি যে প্রতিদিন নির্বাচনী প্রচারে বেরোচ্ছেন সারাদিন ধরে, আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে পুরোটা কভার করব আমরা।’ শুনে সোমেন দা বলেছিলেন, ‘এই প্রথমবার শুনলাম কেউ আমার প্রচার কভার করার অনুমতি চাইছে! সব তো এমনিই এসে পড়ে। আপনি চলে আসুন। না আসতে পারলে আমার ভাগ্নের বন্ধু (অর্থাৎ আমি ) আছে, ও চলে আসবে।
এরকমই অজস্র ঘটনা রয়েছে। সব মিলিয়ে এইটুকু বলতে পারি এই সময়টা অন্য রকম ছিল।

আমার এক বন্ধু আমাকে বলত। ওনার রাজনৈতিক জীবন, রাজনৈতিক মতাদর্শ, রাজনৈতিক চাল তা যেমনই হোক। তিনি এমন একজন চরিত্র যেন গল্পের বই বা উপন্যাস থেকে উঠে আসা উত্তর কলকাতার একটা দাপুটে লোক। আক্ষরিক অর্থে যিনি পাঞ্জাবির হাতার আস্তিনটা গুটিয়েই রাখেন। এমনিতে কলার ছাড়া পাঞ্জাবি পরেন। চোখ, মুখ সবেতেই ওই একটা চরিত্র ফুটে ওঠে। সব মিলিয়ে উনি একজন চরিত্র। যিনি কথা বলতে বলতে পানের পিক ফেলেন। দলের সমস্ত কর্মীদের বিপদে আপদে ঝাপিয়ে পড়েন। একবার খুব ঘনিষ্ঠ একজন, তিনি দার্জিলিংয়ে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন। তার জন্য যেভাবে দিন রাত জেগে, প্রণবদাকে বলে কেয়ার লিফটিংয়ের ব্যবস্থা করে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন, নিজে জেগে থেকে ওনাকে সুস্থ করে হাসপাতাল থেকে নিয়ে এসেছিলেন।
এরকম একাধিক ঘটনা সোমেনদার আছে। কর্মী, সহকর্মীদের বিপদে-আপদে ঝাপিয়ে পড়াটা ছিল ওঁর চরিত্র। এই বিধান ভবন দফতরটি ওঁর উদ্যোগেই করা হয়েছিল। এইটুকু বলব যে উনি একজন বিরল খোলামেলা মানুষ। যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন ছোড়দা, সোমেনদা।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news