মূল রচনাঃ হরিশঙ্কর পরসাই
অনুবাদঃ পার্থসারথি পাণ্ডা
হঠাৎ কোন এক দেশের সংসদ দারুণ উত্তাল হয়ে উঠল। না, রাজনৈতিক কোন সমস্যায় নয়; উত্তাল হল, দেশের এক বিশিষ্ট মন্ত্রীকে সম্পূর্ণ ন্যাড়া অবস্থায় সংসদে হাজির হতে দেখে। সবাই তাজ্জব, সবার মনেই খটকা। গতকালও যার মাথা ভর্তি কোঁকড়ানো চুল ছিল, রাতারাতি তাঁর এই অবস্থা হয় কী করে!
শুরু হল কানাঘুষো গুঞ্জন। উড়ে এলো নানান টিপ্পনী। কেউ বললেন, সম্ভবত ওনার মাথা উকুনে ভরে গিয়েছিল। কেউ বললেন, নিশ্চয়ই ওঁর পরিবারের কেউ মারা গেছেন! কেউ বললেন, তাই বা কি করে হয়, মন্ত্রীমশাইকে তো বেশ খোশমেজাজে বহাল তবিয়তেই দেখা যাচ্ছে! তাহলে?
শেষ অব্দি আর থাকতে না-পেরে এক সাংসদ প্রশ্নটা তুলেই ফেললেন, মাননীয় অধ্যক্ষ, আমরা জানতে চাই মাননীয় মন্ত্রীমশাইয়ের পরিবারের কেউ কি মারা গেছেন?
মন্ত্রীমশাই অবাক। বললেন, কই না তো!
সংসদে আবার গুঞ্জন উঠল। মন্ত্রীমশাই যাদের বিরুদ্ধে বিল পেশ করার চেষ্টা করছেন, তারাই তাঁকে বাগে পেয়ে ন্যাড়া করে দিল না তো!
বেপরোয়া বিরোধী এক সাংসদ প্রশ্ন তুললেন, মাননীয় অধ্যক্ষ! মন্ত্রীমশাই কি জানেন তাঁর মাথা ন্যাড়া হয়ে গেছে? যদি জানেন, তাহলে বলুন, কে তাঁকে ন্যাড়া করল?
মন্ত্রীমশাই পাক্কা সমঝদার লোক। তাই মুখে এক টুকরো অবাক ঝুলিয়ে বললেন, আমার মাথা ন্যাড়া নাকি? কই আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না!
বিরোধী সাংসদেরা চেঁচামেচি শুরু করলেন, বুঝতে পারছেন না মানে! সবাই তো দেখতে পাচ্ছে!
মন্ত্রীমশাই হেসে বললেন, সবাই দেখতে পেলেই তো আর হয় না। প্রশ্নটা হচ্ছে, সরকার দেখতে পাচ্ছে কিনা। দেখার জন্য সরকারকে তদন্ত করতে হয়। তাই সরকারই তদন্ত করে বলবে আমার মাথা ন্যাড়া কিনা।
বিরোধী এক সাংসদ বললেন, চাইলে তদন্তটা এখনই করা যায়। মন্ত্রীমশাই সরকারের লোক, তিনি নিজের হাত নিজের মাথায় একবার বুলিয়ে দেখুন। তাহলেই সত্যিটা বুঝতে পারবেন, বলতেও পারবেন।
মন্ত্রীমশাই বললেন, আপনারা বললেই যে আমি মাথায় হাত বোলাব, সেটা কি করে ভাবলেন! এরকম করাই যায় না। সরকার এসব ব্যাপারে এত তাড়াহুড়ো করে না। তবে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি, অবিলম্বে সরকার এ-ব্যাপারে সবকিছু খতিয়ে দেখে সমস্ত তথ্য সংসদে পেশ করবে।
বিরোধীরা একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলেন, সরকারের খতিয়ে দেখার কি আছে! মাথাটা আপনার, হাতও আপনার। নিজের মাথায় হাত বোলাতে আপনার আপত্তিটা কোথায়?
মন্ত্রীমশাই বললেন, মানছি হাত আমার মাথাও আমার। কিন্তু আমাদের হাত নীতি আর ঐতিহ্যে বাঁধা। নিজের হাত নিজের মাথায় বোলানোর মতো স্বাধীনতা আমাদের নেই। সরকারের কিছু নিয়ম আছে নীতি আছে। বিরোধীদের চাপে আমি তো আর নিয়মবিরুদ্ধ নীতিবিরুদ্ধ কিছু করতে পারি না। সময় হলেই আমি সংসদে এ বিষয়ে আমার বক্তব্য পেশ করব।
সন্ধ্যের অধিবেশনে মন্ত্রীমশাই সংসদে তাঁর বক্তব্য পেশ করলেন—
মাননীয় অধ্যক্ষ! সংসদে প্রশ্ন উঠেছে, আমার মাথা ন্যাড়া কি না। যদি ন্যাড়া হয়ে থাকে, তাহলে সেটা করল কে? এটা বেশ জটিল একটা প্রশ্ন। এক্ষেত্রে সরকার তাড়াহুড়ো করে কোন সিদ্ধান্ত নেয় না। তাই আমিও বলতে পারব না, আমার মাথা ন্যাড়া কি না। এ-ব্যাপারে তদন্তের জন্য আমাদের সরকার তিনজনের একটি কমিটি তৈরি করেছে। কমিটির রিপোর্ট হাতে পেলেই আমি সংসদে পেশ করব।
বিরোধী সাংসদেরা একসঙ্গে বললেন, এ তো আর গাওলা মামলা নয় যে, তদন্তের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে। এটা আপনার চুলের মামলা, যে জিনিসটা প্রতিদিন বাড়ে এবং নিয়মিত কাটতে হয়। তাই এর রিপোর্ট এক্ষুনি চাই!
মন্ত্রীমশাই পাল্টা চালে বললেন, দেখুন, গাওলার সঙ্গে তুলনা টেনে আপনারা আমায় অপমান করতে পারেন না! যাই হোক, তদন্ত শেষ না হলে সরকার কিচ্ছু বলতে পারে না, বলবে না ।
এদিকে তদন্ত কমিটি তদন্ত করতে করতে বছর কাবার করে ফেলল। ওদিকে মন্ত্রীমশাইয়ের মাথাও কোঁকড়ানো চুলে ভরে উঠল। তখন মন্ত্রীমশাই অনুসন্ধান কমিটির রিপোর্ট সংসদে পেশ করলেন। রিপোর্টে লেখা, মন্ত্রীমশাইয়ের মাথা কখনই ন্যাড়া হয়নি, কেউ করেনি!
সরকারী দলের সাংসদরা টেবিল বাজিয়ে হর্ষধ্বনি করে এই রিপোর্টকে স্বাগত জানালেন। কিন্তু বিরোধীপক্ষ থেকে ‘শেম শেম’ আওয়াজ উঠল। প্রতিবাদ শোনা গেল, এই রিপোর্ট মিথ্যে! আমরা নিশ্চিত মন্ত্রীমশাই ন্যাড়া হয়েছিলেন!
মন্ত্রীমশাই তখন হাসতে হাসতে বললেন, ভুলও তো হতে পারে আপনাদের, হয়তো ভুল দেখেছিলেন! নিজেদের কথাই যদি আপনাদের সত্যি বলে মনে হয়, তাহলে প্রমাণ দিন। তেমন প্রমাণ পেলে আপনাদের কথা নিশ্চয়ই মেনে নেব!
কথাটা শেষ করেই মুখে একগাল হাসি নিয়ে মন্ত্রীমশাই তাঁর সুন্দর কোঁকড়ানো চুলে একবার হাত বুলিয়ে নিলেন। আর সংসদ? চুল থেকে সরে চুলকুনির সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news