রণবীর ভট্টাচার্য্য :
ইন্টারনেটের জমানায় একটি একটি বছর, এক একটি মুহূর্ত যেন নিয়ে আসে নতুন শব্দ। এই করোনা ভাইরাস ইতিমধ্যেই আমাদের মধ্যে আমদানি করে এনেছে বেশ কিছু নতুন শব্দ। তার মধ্যে কিছু আত্মস্থ করা গিয়েছে, কিছু রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অভিনীত হয়েছে আর কিছু অভ্যাস করার চেষ্টা করা হচ্ছে নিতান্তই দৈনন্দিন জীবনের সাদা চক দিয়ে আঁকা রাস্তার গোলের মত করে। তবে ‘সোশ্যাল ডিসট্যানসিং’ ওরফে ‘সামাজিক দূরত্ব’ শেষ দেড় মাসে পৃথিবী বদলে দিয়েছে। করোনার উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি, টিকা বিষয়ক গবেষণা অনেকটা এগোলেও ফলপ্রসূ হয়নি।
তবে আর্ন্তজাতিক দুনিয়া এবং ‘চৈনিক হু’ এই দূরত্বকেই মান্যতা দিয়েছে। কিন্তু এই সামাজিক দূরত্ব কি আগে দেখেছি ইতিহাসে? আন্তর্জাতিক ইতিহাসের পাতা ওলটালে আমাদের খেয়াল হবে যে প্রায় এক শতক আগে, অর্থাৎ ১৯১৮ এর স্প্যানিশ ফ্লু-তে কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। গবেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে ‘সামাজিক দূরত্ব’ না মানার ফলে অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়ে তথাকথিত ওই মারণব্যাধি। পরবর্তীকালে গাঁধী যেই ব্রিটিশ জমানায় হরিজন শব্দের প্রবর্তন করেছিলেন, সেই সময়ে অস্পৃশ্যতা ছিল এক সামাজিক সমস্যা। বর্ণ বিভেদ ছিল লজ্জার যা সামাজিক আন্দোলনের ফলে আমরা বাদ দিতে পেরেছি ভারতীয় জীবনধারার থেকে। এই করোনা-যুগে, সামাজিক দূরত্ব যেন একটু ভয় পাইয়েই দেয় ভবিষ্যতের কথা ভেবে। আচ্ছা, করোনা পরবর্তী সময় কেমন হবে কখনো আন্দাজ করেছেন? একটা ব্যাপারে, সকলেই একমত, যে করোনা ভারতের মত দেশকে আদর্শ স্বাস্থ্যবিধি শিখিয়ে যাবে। ভারতের রাস্তা সিঙ্গাপুর, দুবাই এর মত ঝকঝকে রাস্তা হয়তো একদিনে হবে না, আবার ‘মেট্রোয় থুতু ফেললেই’ জরিমানা লিখতে নাও হতে পারে। তবে এই মুখাবরণ পড়ার অভ্যাস কিন্তু থাকবেই। এছাড়াও করোনা ফিরে আসার মত ভয়ে এই দূরত্ব থাকবেই।
এই লকডাউনের সময়ে আমরা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছি শুনে যেখানে ডাক্তার বা নার্সকে পাড়া ছাড়া করার প্রবণতা চলছে। কিছু জায়গায় স্থানীয় পুলিশকে পাড়ায় পাড়ায় বোঝাতে হচ্ছে যে ‘সামাজিক দূরত্ব’ মানে দূরে সরিয়ে রাখা নয়। ফেসবুকের পাতায় অনেক মানুষ ইতিমধ্যেই সন্দেহজনক করোনা আক্রান্তের ছবি, ভিডিও, নাম দিয়ে খাপ পঞ্চায়েত খোলার দিকে দু -পা এগিয়ে গিয়েছেন। কিছু কিছু জায়গায় করোনা থেকে সেরে ওঠা মানুষের ক্ষেত্রে অমানবিক হয়ে উঠেছেন ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠা দেখা পাশের বাড়ির প্রতিবেশী! তাই টিভির পর্দায় ঝাপসা মুখে আসছেন নিজেদের লড়াইয়ের কথা জানাতে। সরকার বাহাদুর কি ‘সামাজিক দূরত্ব’ বলতে এই পাগলামি চেয়েছিলেন? সময় এসেছে স্পষ্ট বলার যে শুধু শারীরিক দূরত্ব চাই, সামাজিক নয়। ইতিমধ্যেই ‘সামাজিক দূরত্ব’ এর উবাচ বুঝতে গিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য প্রশ্নের মুখে পড়েছে। করোনাকে হারানোর সবচেয়ে বড় অস্ত্র হল ইমিউনিটি। শুধু মাত্র কয়েকদিন পুরোদস্তুর বাড়িতে থেকে করোনাত্তর বিশ্ব নিয়ে আশাবাদী হওয়া যদি যায়, তাহলে আখেরে লাভ তো সবারই। তাই আমাদের সকলের জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ নির্বিশেষে করোনায় সামাজিক নয়, চাই সুস্থ শারীরিক দূরত্ব।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news