দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়:
শনিবার শ্রীরামপুরে জয় শ্রীরাম ধ্বনির আবহে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে বেশ কয়েকজনকে বিজেপিতে যোগদান করালেন মুকুল রায়। এদিন তাঁর বক্তৃতায় মুকুল বেশ কিছু পুরনো কথার পুনরাবৃত্তি করেন। যেমন, কিছুদিন আগেই বলেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সিঙ্গুর আন্দোলন ভুল ছিল। এই ভুলের তিনিও অংশীদার ছিলেন। সিঙ্গুর থেকে অনতিদুরে শ্রীরামপুরে হুগলির মাটিতে দাঁড়িয়ে আবার সেই ভুলের কথা স্বীকার করেন মুকুল। কিন্তু এবার কথার ফাঁকে মুকুল এমনই একটি বক্তব্য গুঁজে দিয়েছেন, যা নিয়ে তৃণমূলের একটি পুরনো বিতর্ক নতুন ভাবে মাথা তুলেছে।
কী বলেছেন মুকুল? তিনি বলেছেন, সিঙ্গুর আন্দোলন আমাদের ছিল না। এই আন্দোলনে আমরা মমতা দেবীকে সমর্থন করেছিলাম মাত্র। এখানে ‘আমাদের’ বলতে মুকুল অবশ্যই তৃণমূলের কথা বলেছেন। সেই সময় তিনি ছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। তাহলে এই আন্দোলন কাদের ছিল? একথা সবার জানা—মমতা এই আন্দোলনটি করেছিলেন প্রথমে কৃষি জমি রক্ষা কমিটি পরে নাম বদলে কৃষিজমি ও জীবন জীবিকা রক্ষা কমিটির ব্যানারে। সেই দিক থেকে দেখলে মুকুলের এদিনের বক্তব্যে কোনও রহস্য নেই। যা আছে তা হল একটি প্রশ্ন। এতদিন পরে এই কথা তুলে মুকুল কেন সিঙ্গুর আন্দোলন থেকে তৃণমূলকে আলাদা করে দেখাতে চাইলেন। সিঙ্গুর আন্দোলন তৃণমূলের ব্যানারে হবে নাকি কমিটির ব্যানারে, এই নিয়ে তখনই দলের মধ্যে বিতর্ক ছিল। দলের একজন বর্ষীয়ান অভিভাবকসম নেতা এই আন্দোলনকে দলের ব্যানারে নিয়ে আসার পক্ষপাতী ছিলেন। এই নিয়ে তিনি একাধিকবার সরবও হয়েছিলেন। এমনকি একবার ঘোষণাও হয়ে গেছিল, কমিটি নয় দলের ব্যানারে লড়াই হবে। তবু সেই বর্ষীয়ান সিঙ্গুরে সভাস্থলে পৌছে দেখেছিলেন কমিটির ব্যানার টাঙানো রয়েছে এবং বুঝেছিলেন ওই ব্যানারের নিচে দাঁড়িয়েই তাঁকে বক্তৃতা দিতে হবে। এই দৃশ্য দেখার পর এবং দলে নিজের অবস্থান অনুধাবন করার পর ঘন ঘন সিগারেটে টান দেওয়া ছাড়া তাঁর আর কিছুই করার ছিল না। কার্যকরী ভাবে কৃষিজমি, জীবন ও জীবিকা রক্ষা কমিটির নেতা ছিলেন প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, পূর্ণেন্দু বসু, দোলা সেন ও আরও কয়েকজন। পিডিএস নেতা সমীর পুততুণ্ডর তখন বিশেষ ভূমিকা ও গুরুত্ব ছিল। এঁরা সকলেই কোনও না কোনও বামপন্থী দল থেকে এসে এই কমিটির ছাতার তলায় জড়ো হয়েছিলেন।
এই সবই ১২-১৩ বছর আগের কথা।
মূল প্রশ্নে ফিরে আসা যাক। এতদিন পর মুকুল রায় কেন সিঙ্গুর আন্দোলন থেকে তৃণমূলকে আলাদা করতে চাইলেন?
এমনিতে সিঙ্গুর আন্দোলনের রাজনৈতিক ফসল যেভাবে মহাকরণে ও পরে নবান্নে উঠেছে, সেভাবে কৃষকদের ঘরে কোনও লাভ পৌঁছয়নি, বরং যত দিন গেছে তাঁদের হতাশা বেড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী আদালতে জিতে জমি ফেরতের একটি ব্যবস্থা করেছিলেন ঠিকই কিন্তু সে ব্যবস্থা খাতায় কলমেই থেকে গেছে। ডেভেলপড জমিকে আবার কৃষিজমিতে রুপান্তর করার নামে বিস্তর সরকারি টাকা খরচ হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রীর প্রচার হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে অশ্বডিম্ব ছাড়া আর কিছুই প্রসব করেনি মুখ্যমন্ত্রীর এ হেন চেষ্টা। সিঙ্গুর, রতনপুর, কামারকুন্ডু আমও হারিয়েছে সঙ্গে ছালাও। সিঙ্গুরের মাটিতে কান পাতলে এই সত্য বুঝতে অসুবিধা হয় না। সিঙ্গুর আন্দোলন যাঁরা শুরুর দিন থেকে কাছ থেকে দেখছেন তাঁদের অভিজ্ঞতা এমনটাই।
ফলতঃ এই কৃষিবিঘ্নিত সিঙ্গুর আর শিল্প বঞ্চিত পশ্চিমবঙ্গের করুণ অবস্থার দায় তৃণমূলের নেতাদের গায়ে লাগতে দিতে চান না মুকুল। মুকুলের ঘনিষ্ঠ মহল বিষয়টিকে এভাবেই ব্যখ্যা করছে। কারণ শ্রীরামপুরের এই সভাতেই মুকুল বলেছেন, উত্তরপাড়া, রিষড়া, শ্রীরামপুর তৈরি আছে। শুধু সময়ের অপেক্ষা। অর্থাৎ তৃণমূল ভেঙে নেতা কর্মীদের বিজেপিতে আসতে আর দেরি নেই।
কর্মীদের কথা যদি বাদও দেওয়া যায়, বিজেপিগামী ট্রেন ধরতে ওয়েটিং রুমে বসে থাকা তৃণমূলের নেতাদের গা থেকে সিঙ্গুর কলঙ্ক এদিন সচেতন ভাবেই মুছে দিতে চাইলেন মুকুল।
অন্তত জেলার রাজনৈতিক মহল এমনটাই মনে করছে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news