Breaking News
Home / TRENDING / শিবরামের চুমু-কবিতা এবং PUN-আসক্তি

শিবরামের চুমু-কবিতা এবং PUN-আসক্তি

 পার্থসারথি পাণ্ডা

হাসির গল্পের রাজা শিবরাম চক্রবর্তী থাকতেন উত্তর কলকাতার মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের মেসের ‘তক্তারামে’। একখানা তক্তপোষ ছাড়া তাঁর ঘরে পাপোষ-পুষ্যি কিচ্ছু ছিল না। যেন হুমায়ুন আহমেদের ‘হিমু’। ঘরে চাবিতালার বালাই নেই, ফুটপাথপ্রিয়, বোহেমিয়ান। শয়ণং মেস-মধ্যে, ভোজনং যত্রতত্র। কারও ঠিকানা বা ফোন নম্বর তিনি লিখে রাখতেন মেসের ঘরের দেওয়ালে, তাঁর অকাট্য যুক্তি কাগজ যদি বা হারিয়েও যায়, দেওয়াল তো আর হারাবে না! তারই ঠেলায় ধীরে ধীরে যেন দেওয়ালটা হয়ে উঠেছিল একেবারে সাদায়-লেখায় নামাবলী।

দেওয়াল লিখনটা বড় বেলার কাণ্ড হলেও, কাগজ-কলমে লেখালেখিটা শুরু করেছিলেন ছোটবেলা থেকেই। কৈশোরেই তিনি লিখে ফেলেছিলেন ‘চুম্বণ’ নামের, সে বয়সের পক্ষে দুঃসাহসিক একটি কবিতা। তাঁর ক্ষেত্রে অবশ্য দুঃসাহসিক ছিল না। কারণ, সে বয়সেই তাঁর চুমুপ্রাপ্তি ঘটে গিয়েছে এবং অযাচিত ও অভাবনীয়ভাবে। মালদার চাঁচলে। পাশের বাড়ির মেয়ে রিনি। খেলাধুলো, ঘোরাঘুরি তারই সঙ্গে। মনে মনে প্রেমও। সেদিন মা শিবরামকে ছোট ছোট দুটো তালশাঁস সন্দেশ দিলেন খেতে, কিন্তু রিনিকে না দিয়ে একা একা খান কী করে! ছুটলেন রিনিদের বাড়ি। সন্দেশ দুটো দেখেই রিনি কপাৎ মুখে পুরে নিল, শিবরামকে বলার সুযোগই দিল না যে, একটা তাঁর, অন্যটা রিনির। যখন বলতে পারলেন, তখন রিনি মুখ থেকে মা-পাখি যেমন ছানা-পাখিকে ঠোঁট থেকে ঠোঁটে খাইয়ে দেয়, তেমনি করে খাইয়ে দিল শিবরামকে। মুখের মিষ্টি এবং ঠোঁটের চুমু একইসঙ্গে পেলেন শিবরাম। এই তাঁর জীবনে পাওয়া প্রথম চুমু, স্যাকারিনের চেয়েও কয়েক হাজার গুণ বেশি মিষ্টি! ফলে তিনি যে ‘চুম্বণ’ কবিতা লিখবেন, তাতে আর আশ্চর্য কী!

তবে আশ্চর্য হয়েছিলেন স্বদেশী বিপ্লবী বারীন ঘোষ এবং নলিনীকান্ত সরকার। কবিতাটা ছাপা হয়েছিল তাঁদেরই কাগজ, ‘বিজলী’-তে। তাঁরা ভেবেছিলেন, চাপদাড়ি সমন্বিত কবি কবি চেহারার কোন বয়স্ক লোকই হয়তো কবিতাটি লিখে থাকবেন। কারণ, তখনও অব্দি রবীন্দ্রনাথের ‘চুম্বণ’ নামের একটি সনেট এবং শরৎচন্দ্রের কিরণময়ী দিবাকরের ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ‘চরিত্রহীন’-এ চুমু খাওয়া ছাড়া বাংলা সাহিত্যে তেমন চুমুর বাড়াবাড়ি শুরু হয়নি। তাই, ‘জানি জানি/ সবাই সবে/ছাড়বে/ চলার পথে/ কে কার চুমু কাড়বে।’—এমন পংক্তিমালা একজন পরিণত লোক না-লিখে যে একজন কিশোর লিখছে, সে-কথা তাঁরা ভাববেন কেমন করে! এদিকে গান্ধীজির উক্তি ‘এডুকেশন ওয়েট, বাট স্বরাজ কান্ট’ শিবরামের মাথায় এমনভাবে ঢুকে গেল যে, কলেজে ঢুকেই পড়াশুনোকে পাতকুয়োয় পাঠিয়ে কংগ্রেসে যোগ দিয়ে কলকাতায় চলে এলেন। সেখানে তখন ছাত্রযুবকদের ভিড়, পরস্পর সন্দেহ এবং নিয়ম-অধীনতা তাঁর সহ্য হল না। পোষালও না। ছোট থেকেই বাড়ি পালানো ছেলে মুক্তমানুষ শিবরাম, কংগ্রেসীদের আড্ডা ছেড়ে পথে নামলেন, এক খবরের কাগজের হকার বন্ধুর সহযোগিতায় হকার হবেন বলে যখন ‘বিজলী’-র দপ্তরে পৌঁছলেন; তখন তাঁর পরিচয় পেয়ে বারীন ঘোষ ও নলিনীকান্ত সরকার সেই দুঃসাহসী কবিতার কিশোর কবিকে দেখে আশ্চর্যই হয়েছিলেন। শিবরামের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের নামও ‘চুম্বণ’।

বলছিলাম যে, বড়দের লেখা দিয়েই শিবরামের লেখার শুরু। ‘চুম্বণ’ এবং ‘মানুষ’—দুটো কবিতার বই ছাড়াও লিখলেন প্রবন্ধের বই—‘মস্কো বনাম পণ্ডিচেরী’। তাঁর মতে, এখানে তিনি মস্কো নিয়ে পণ্ডিতি আর পন্ডিচেরি নিয়ে মস্করা করেছেন। ‘মানুষ’ কাব্যগ্রন্থের কাল থেকেই তাঁর মধ্যে সমাজতন্ত্রবাদের দিকে একটা ঝোঁক দেখা গিয়েছিল, তারই ফসল—‘মস্কো বনাম পণ্ডিচেরী’। তারপর নেহাতই পেটের তাগিদে তাঁকে কলম ধরতে হয়েছে, অন্তত তিনি তাই মনে করতেন। সেভাবেই ছোটদের জন্য তাঁর লেখার সূচনা। মার্ক টোয়েনকে গুরু মেনে বাংলা সাহিত্যে তিনিই পোলাপানদের PUNআসক্ত করে তুলেছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন শিশু-কিশোর সাহিত্যে এক নতুন রীতির জনক। তাঁর এই হাস্যরসাত্মক রচনার সূত্রপাত যেভাবে হল, সেটাও কিন্তু আশ্চর্যের।

তখন লিখেটিখে টাকা পাওয়া ছিল দুষ্কর ব্যাপার। লেখা ছাপা হলেই লেখকেরা কেতাত্থ হয়ে বাঁচতেন। কিন্তু সহায়সম্বলহীন শিবরামের তো আর কেতাত্থ হলেই চলে না। তাঁর পেটের চিন্তা আছে, তাঁর টাকা চাই। কাবুলিওয়ালার কাছে দেনা, সে ব্যাটা মাথা খাচ্ছে পথেঘাটে সামনে পরে গেলেই। এই অবস্থায় ‘মৌচাক’ পত্রিকার সম্পাদক সুধীরচন্দ্র তাঁকে ছোটদের জন্য একটা গল্প লিখতে বলায় শিবরাম বলে বসলেন, ‘টাকা দেবেন তো?’
‘নিশ্চয়ই। টাকা দেব বইকি। কত দাবি বলুন?’
শিবরামের দরকার ছিল পনের টাকা। তিনি তাই চাইলেন। এবং টাকাটা তক্ষুনি সুধীরচন্দ্র অগ্রিম দিয়ে দিলেন। লেখা পেয়েও অনেকে টাকা দেন না, এখানে লেখার আগেই টাকা পেলেন! মনে কেমন যেন একটা হাসির বুদবুদ উঠল শিবরামের। এই হাসিই হাস্যরসের দরজা খুলে দিল তাঁর কাছে। লিখলেন ‘পঞ্চাননের অশ্বমেধ’ গল্পটি। গল্পটি এরকম—
পঞ্চাননের একটি বেতো ঘোড়া ছিল, কোন কাজে লাগত না। পঞ্চানন গরীব মানুষ ভালো কিছু খেতে দিত পারত না। একদিন মহাজন দেনার দায়ে পঞ্চাননের ঘোড়াটা নিয়ে গেল। সাজানো আস্তাবলে তার জায়গা হল। যে ঘোড়াটা কোনদিন ছোলাটোলা চেখে তো বটেই, চোখেই দেখেনি; তাকে গামলাভরা ছোলা দেওয়া হল। হঠাত খাবারের এত সমারোহ দেখে ঘোড়াটার খুব হাসি পেল, হাসতে হাসতে সে মারা গেল। গল্পের জন্য অযাচিত-অগ্রিম টাকাটা পেয়ে গরীব লেখক শিবরামের যেমন হাসি পেয়েছিল, ছোলা দেখে গরীবের ঘোড়াটার তেমনি হাসি পেয়েছিল। গল্পের ঘোড়াটা মরে গিয়ে শিবরামকে বাঁচিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। গল্পে শব্দ নিয়ে যেমন তিনি ‘পান’ করেছেন, তেমনি নিজের নামটি নিয়েও ‘ফান’ করতে ছাড়েননি। নিজেকে বলতেন, শিব্রাম চকরবরতি। তাঁর হর্ষবর্ধন-গোবর্ধন ও কল্কেকাশি সিরিজের গল্প পড়ে হেসে লুটোপুটি খাননি, এমন পাঠক খুব কমই আছেন। আবার তাঁর আত্মজীবনী ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা’ এবং ‘ভালোবাসা পৃথিবী ঈশ্বর’-এ দর্শন-জীবন-সাহিত্যের অপূর্ব সমাবেশ খুলে দিয়েছে বংলা সাহিত্যের এক অন্য দিগন্ত।

১৯০৩ সালে ১৩ ডিসেম্বর শিবরাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *