অভিজিৎ কুমার সেন
খেরিয়া শবর-উপজাতি আদিবাসীদের মধ্যেও প্রান্তিক অবহেলিত একটি জনগোষ্ঠী। স্বাধীনতার বেশ কিছুদিন পর পর্যন্ত শবরদের বাসস্থানের চার পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যেও কোন চুরি বা অন্য কোনও অপরাধ হলে পুলিশ প্রথমেই এদের ধরে নিয়ে যেত। কারণ এরা ছিল ব্রিটিশ নির্ধারিত অপরাধী জাতি বা ক্রিমিনাল ট্রাইব।ওদের ভাগ্যে এই শিরোপা কেন জুটেছিল তা বলা মুশকিল। কিন্তু শবর অর্থে ব্যাধ জাতি। অতি প্রাচীন সাহিত্যেও এর উল্লেখ আছে। অর্থাৎ জঙ্গলে জীবজন্তু শিকার করেই ওদের দিন চলত। পরে তথাকথিত সভ্যতা বা নগরায়নের তাগিদে জঙ্গলের ক্রম অবলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে ওরাও নিজেদেরকে কৃষিকাজ থেকে শুরু করে নানান অনুসাঙ্গিক কাজকর্ম করেই দিনাতিপাত শুরু করে। কিন্তু মূলত জঙ্গলের পাতা কুড়োনো কাঠ কুড়োনো আর তা বিক্রি করেই (স্বভাবতই সভ্য মানুষদের কাছে বিপুল পরিমাণ ঠকেই) তারা কোনওক্রমে দিনাতিপাত করত। কিন্তু পুরুষানুক্রমে যে জঙ্গল জমি ওদের বেঁচে থাকার রসদ যুগিয়েছে, ক্রমে সেই জঙ্গল জমি যখন ওদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া শুরু হল তখন ওদের বেঁচে থাকাটাই দুঃসাধ্য হয়ে উঠতে থাকল। শহরের বাবুরা তো বটেই এমনকি আদিবাসীদের মধ্যেও বেশ কিছুটা অগ্রসর সাঁওতাল বা মুণ্ডারাও এদের ছোঁয়া বাঁচিয়ে চলে। মাথার ওপর ছাদ নেই, পেটে খাদ্য নেই, জোগাড়ের কোনও সংস্থানও যাদের নেই, তারা স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার থেকে সহস্র যোজন দুরেই থাকে। কাজেই এদের ঠকানোও খুব সহজ।
বছরের পর বছর সেটাই হয়ে চলেছে। অবশ্য কিছু শহুরে মানুষও আছেন যারা এদের জন্য সদর্থক কিছু করা যায় কিনা ভেবেছিলেন। এদের স্বাবলম্বী করার একটা প্রচেষ্টা আশির দশকের গোরায় কেন্দ্রীয় সরকারি প্রতিষ্ঠান পুরুলিয়া ডিসট্রিক্ট সায়েন্স সেন্টার নিয়েছিল। সেই সময় পুরুলিয়াতে প্রায় হাজার দশেক শবর ছিল যাদের মোট জমির পরিমাণ ছিল মোটামুটি ভাবে দুই থেকে তিন একর। পুরোটাই প্রায় বন্ধ্যা। সেচের কোনও সুযোগ নেই, অতএব বৃষ্টি নির্ভর চাষের পরিমাণও যৎকিঞ্চিত। পুরুলিয়া সায়েন্স সেন্টারের পক্ষ থেকে শবরদের স্বাবলম্বী করার জন্য প্রথমত সেচবিহীন জমিগুলোতে কুয়ো খননের ব্যবস্থা করা হল। এর জন্য ৪৪০০০ টাকা দিয়েছিল একটি এনজিও রুরাল কনসরটিয়াম ডেভেলপমেন্ট। এর প্রথম ফল পাওয়া যায় ১৯৮৩ সালের শেষের দিকে। ওই জলের সাহায্যে যে জমিতে একেবারেই ফসল ফলত না সেখানে ভালোই ফসল হল। বায়ওমাস প্ল্যান্টের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়ছিল ক্রেসিডার সাহায্যে। মনে রাখা দরকার তখনও ইজরায়েলি স্প্রিংক্ল সেচের কথা কেউ শোনেনি। এর পরের বছরেই মাল্ডি গ্রামে সায়েন্স সেন্টারের উদ্যোগে প্রায় ৫০০০ শবরদের নিয়ে ওদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান খেরিয়া শবর অয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন তৈরি হয়। এছাড়াও শবর মহিলাদের প্রথাগত নৈপুণ্যকে কাজে লাগিয়ে বেত ও বাঁশের নানান প্রয়োজনীয় এবং ঘর সাজানোর জিনিসপত্র তৈরির জন্য ছোটখাটো হস্তচালিত মেসিন তৈরি করে তাতে ওদের নানারকম প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল এই সেন্টার। শালপাতার থালা বাটি যাতে পোক্ত হয় তার জন্য হস্তচালিত মেসিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল ওই মহিলাদের। ওই সমস্ত জিনিসপত্র বিক্রির জন্য ‘সাসা’ নামে একটি বানিজ্যিক সংস্থার সঙ্গে একটি ব্যবস্থাও করেছিল সেন্টার।
১৯৮৫ সালে রাজ্য সরকার এক বছরের জন্য ৪১০০০০ টাকা বরাদ্দ করেছিল শবরদের জন্য ছাগ পালন, জলের ব্যবস্থা করা ও অন্যান্য কাজে। সেন্টারের উদ্যোগে বছর তিন চার এই প্রকল্প চলেছিল ঠিকঠাক। তারপর সেন্টারের কর্তাব্যক্তিদের পরিবর্তন, স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীন মানসিকতার জন্য সমস্ত প্রকল্পটাই নষ্ট হয়ে যায়। শবরেরা আবার ফিরে যায় পূর্বাবস্থায়। মেদিনীপুর অঞ্চলের শবরদের ভাগ্যে এই সুবিধাটুকুও জোটেনি। নিরন্তর প্রশাসনিক অব্যবস্থা অবহেলা শবরদের বেঁচে থাকার অধিকারটুকুও কেড়ে নিয়েছে। মনে পড়ছে আমলাশোলের কথা। সিপিএম নেতা কৈলাস মুর্মু বলেছিলেন, না খেতে পেয়ে ওখানে লোক মারা গেছে। প্রশাসনের উচ্চতম স্তর থেকে বলা হয়েছিল, মদ খেয়ে মারা গেছে। এখন শবরদের মৃত্যুতেও একই কথা শোনা যাচ্ছে। স্বাবলম্বী করার ব্যবস্থা না করে শুধু চাল দিয়ে কোনও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বাঁচানো যায় না এই বোধ প্রশাসনের উচ্চতম স্তরে এবং তার স্তাবকদের মধ্যে কবে হবে কে জানে। ততদিন পর্যন্ত এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষেরা মাঝে মাঝে মরে প্রমাণ করবেন তারা বেঁচে ছিলেন এবং তাদের অস্বিত্ব আছে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news