দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়
ভোটের আগে আরও একবার নিজের সৎ ইমেজ প্রদর্শন করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রতিবার একুশের সভায় কিংবা যে কোনও নির্বাচনের আগে নিজের ছবির, থুড়ি নিজের ইমেজের প্রদর্শনী করে থাকেন মমতা। এবারও করলেন। শুক্রবার, নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে সেই প্রদর্শনী প্রত্যক্ষ করল গ্যালারি ভর্তি তৃণমূলের বড়-মেজ নেতা। সেই কবে কবীর সুমন তৃণমূল নেতাদের তোলাবাজির বিরুদ্ধে সরব হয়ে মমতার কাছে প্রিয় কবীরদা থেকে ‘স্যাট’ করে দলের অতিথি হয়ে গিয়েছিলেন। ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তৃণমূল নেতাদের এমন খাই খাই স্বভাব ইতিউতি ধরা পড়েছে। নিন্দুকেরা বলে শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে এগারোর আগেও খাওয়া দাওয়া যে এক্কেবারে হয়নি এমনটা নয়! অবশ্য সাধারণ মানুষের ধারণা রাজনীতির চৌহদ্দিতে এ হেন হাতের কাজে কেউই পিছিয়ে নেই। এ বলে আমায় দেখ ও বলে আমায়। গোল বাঁধছে অন্য জায়গায়। প্রশ্ন উঠছে সভায় সভায় নিয়ম করে মমতা নীতিকথা শোনালেও কাজ হচ্ছে না কেন? কাজ যে হচ্ছে না তা প্রমানিত। কাজ হচ্ছে না বলেই শেষ কয়েক বছরের ২১ জুলাইয়ের সভায় মমতার বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে থেকেছে নীতিকথার পাঠ। এদিনও রইল। তাহলে এতদিন ধরে দলনেত্রী পাখি পড়ার মত করে সততার শিক্ষা দিয়ে এলেন তবু কানে তুলল না দল! প্রশ্ন উঠছে, তাঁর দল কী তাঁকে সিরিয়াসলি নেয় না! তিনি কী দলের ইউএসপি ছাড়া আর কিছু না!
নাকি গল্পটা অন্য!
মমতা খুব ভাল করেই জানেন যে ক্ষয়ীভূত শিলার মতো তাঁর ইমেজ আগের চেয়ে অনেক ক্ষয়ে গেলেও এখনও যা আছে সেটাই তাঁর দলের ভর্সা। তাই কী নেহাত কৌশলগত কারণে, নিজের লড়াকু রাজনৈতিক জীবন ও সংবাদমাধ্যমের যুগ্ম ভূমিকায় তাঁর যে ইমেজ প্রস্তুত আছে, বারবার সেই ইমেজেরই বিপণন করে যাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়!
সত্যজিতের নায়ক ছবির মতো পাবলিকের নাড়ি বোঝা মমতা জানেন তিনি ছাড়া দলটায় আর কিছু নেই। তিনি না তাঁর ইমেজ? সেটা অবশ্য অন্য প্রশ্ন। বিভিন্ন জায়গায় দলের চূড়ান্ত নৈতিক অধঃপতনের পর মমতা জানেন মানুষের মনে তাঁর পুরনো ইমেজকে জাগরুক রাখাই একমাত্র পথ। যে মানুষ পঞ্চায়েত নির্বাচনে শাসকের হিংসার ছবি দেখে চমকে উঠেছিল, তৃণমূলের গুণ্ডাবাহিনী মেয়েদের চুল টেনে মাটিতে ফেলে মারছে, এমনকি লাথিও মারছে দেখে যাঁরা লজ্জায় মাথা নামিয়ে ছিলেন, শিক্ষামন্ত্রীর পিএইচডি নিয়ে বিতর্ক দেখে যাঁরা অবাক হয়ে ছিলেন, ঐতিহ্যবাহী মেয়রের চেয়ারে বসে শোভনের পরকীয়া দেখে যাঁরা রেগে উঠে ছিলেন, অনুব্রতর স্থুল হুংকার শুনে, শঙ্খবাবুর অসম্মান দেখে যাঁদের রক্তচাপ বেড়ে ছিল, তাঁদের সকলের কাছে মমতা ‘পুরনো মমতাকে’ জাগিয়ে রাখতে চাইছেন। দলের থেকেও কী নিজেকে আলাদা করে দেখাতে চাইছেন! বোঝাতে চাইছেন মানুষ যা দেখছেন তাতে তিনি নেই। ভাবটা এমন ধর্মস্থানে দুর্নীতি থাকলেও ঈশ্বর নিষ্কলুষ!
মমতা সংবাদমাধ্যমের সামনে ধমকাচ্ছেন একজন বয়স্ক বিধায়ককে। ভদ্রলোক কাঁচুমাচু হয়ে বসে পড়ছেন চেয়ারে। পাবলিক (হ্যাঁ হ্যাঁ বলা সঙ জাতীয় পাবলিক) হাততালি দিচ্ছে। ভদ্রলোক বাড়ি ফিরে স্ত্রী-কন্যার কাছে অপদস্থ হচ্ছেন। সন্ধেবেলা পার্টি অফিসে তাঁর রাজনৈতিক সুহৃদ তাঁকে পরামর্শ দিচ্ছেন, তুমি এবার এর সঙ্গ ছাড় তো হে, ওর সঙ্গ ধর! ও কে? কে ও!
মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠবৃত্তের সঙ্গে সম্পর্কের দেনাপাওনা ভাল রাখতে পারলেই, বকুনি খাওয়া নেতাটি যে ভাল থাকতে পারবেন, তাঁর সুহৃদ সে কথা তাঁকে বোঝালেন সেই সন্ধ্যায়!
মমতা এদিনও তাঁর ইমেজাস্ত্রে শান দিয়েছেন।
বলেছেন, ‘এতদিন অনেক চেয়েছেন, এবার দেওয়া শুরু করুন।’ আরও বলেছেন, ‘মানুষের জন্য কাজ করুন। নাহলে চেঞ্জ করে দেবো। নেতা হওয়া মানে ঘরে বসে থাকা নয়।’
বাড়ি ফেরার পথে তাঁর ‘কথাঞ্জলি’ নেতারা নয়ানজুলিতে ফেলেছেন কী না তা তাঁরাই জানেন! তাঁরা যাই করুন না কেন!
এদিনের বক্তৃতা পাবলিক কিভাবে নিল সেটাই বড় কথা।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news