সুমন সেনগুপ্ত:
আজ থেকে ৩৮ বছর আগে সত্যজিৎ রায়ের মুখোমুখি হই আমি আর আমার এক কলেজের বন্ধু। বন্ধুকে দেখে সত্যজিৎ রায় বললেন, আপনি তো বোড়ালে থাকেন? আমরা তো শুনে বিস্ময়ে হতবাক। ওনার তো জানার কথা নয়, আমার বন্ধু বোড়ালে থাকে। এর যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা করছি। তখনই মাথার মধ্যে একটা সূত্র চলে এল। আরে উনি তো শুধু সিনেমা পরিচালক নন, উনি তো ফেলুদাও। সেই ঘটনার কথাই আজ বলব।
১৯৮০ সাল ‘পথের পাঁচালী’-র ২৫ বছর। উত্তেজনায় ছটফট করছি। ‘পথের পাঁচালী’-র স্রষ্টার সঙ্গে দেখা হবে। রাতেই আর একবার পড়ে ফেললাম, চলচ্চিত্রের ভাষা: সেকাল একাল নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের লেখা। তখন দেশ-এর বিনোদন সংখ্যা বেরুত। সেখানে গোদার সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন ছিল। কেন গোদার প্রসঙ্গ তুললাম। তখন আমি কলেজ ছাত্র। কলেজে সিনেমা নিয়ে আড্ডায় সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক থেকে গোদারের প্রসঙ্গ উঠত। অনেকেই গোদার ভক্ত ছিল। তাঁদের কাছে গোদার অনেক বেশি আধুনিক ‘পথের পাঁচালী’র সৃষ্টিকর্তার চেয়ে। আমি বেশ দ্বিধায় ছিলাম। সবে গোদারের ব্রেথলেস দেখেছি। সত্যি কথা বলতে সহজবোধ্য মনে হয়নি। গোদার সম্পর্কে সত্যজিৎ রায়ের মূল্যায়ন পড়ে ভুল ভাঙে। তিনি লিখছেন, ব্রেথলেস ছবির ভাষা বুঝতে হলে একটা কথা মনে রাখা দরকার। সেটা হল-গোদারের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কম খরচে ছবি করা। যে কারণে খরচ কমানোর নানা উপায় আবিষ্কার করলেন তিনি।
আর এইভাবে খরচ বাঁচিয়ে যে চলচ্চিত্র ভাষা তৈরি হল, সেটি ব্রেথলেস এর আনকনভেনশনাল কাহিনীর সঙ্গে চমৎকার খাপ খেয়ে গেছিল। সত্যজিৎ রায়ের এই মূল্যায়নের পরে আমার কাছে সত্যজিৎ ও গোদার দুইজনেই খুব স্বচ্ছ ও স্পষ্ট হয়ে গেলেন। ‘পথের পাঁচালী’ ইতিমধ্যে আমি দুবার দেখেছি। প্রথমবার খোলা মাঠে। দ্বিতীয়বার টিভিতে, সূর্যগ্রহণের দিন।ছবিটা যেমন বিষয়বস্তুতে,তেমনি তার প্রকাশভঙ্গীতে অসম্ভব আধুনিক ও অনন্য। একই অনুভবের কথা জানিয়েছিলেন, আমার খুব প্রিয় সাহিত্যিক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। সন্দীপন জানান, এ নিয়ে মোট নয় বার ‘পথের পাঁচালী’ দেখি। ১৯৫৫য় প্রথম চোটেই তিনবার। দু’বার টিভিতে,দু’বার ভিসিআর-এ,মাঝে দু’বার বড় স্ক্রিনে। মাত্র নয়বার। মনে পড়ে১৯৫৫য় বীণা সিনেমায় দ্বিতীয় দিন ‘পথের পাঁচালী’ দেখে আসি ম্যাটিনি শো-তে। একা? না, ঠিক একা নয়। সঙ্গে ছিলেন আরও শখানেক দর্শক। সেদিনই কফি হাউসে জমজমাট আড্ডা। পূর্ণেন্দু(পত্রী) প্রথম দিনই দেখেছে। পূর্ণেন্দুর একটাই কথা। সুবীর(হাজরা) আমাকে নিয়ে চল সত্যজিতের কাছে। শুধু একটা প্রণাম করব,গড় হয়ে। একটা কথাও বলব না।
‘পথের পাঁচালী’র ২৫ বছর।
উত্তেজনায় টগবগ করছি সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে দেখা হবে বলে। অনেকবারই ভেবেছি বিশপ লেফ্রয় রোডে চলে যাই। একটা গড় করে প্রণাম করে আসি। কিন্তু সাহসে হয়নি। বাঙালির সহজাত ভীরুতাই পেছনে টেনেছে। ‘পথের পাঁচালী’র ২৫ বছর সেই সুযোগ করে দিল। আমার এক বন্ধু যাদবপুরে পড়ে। ও জানাল সত্যজিৎ রায় মুখোমুখি হবেন ওর দর্শকদের। কী আশ্চর্য, এমনটাই তো আমি চেয়েছিলাম। ফলে সকাল থেকেই উত্তেজনায় ছটফট করছি। দিন দুয়েক আগেই এসএলআর ক্যামেরা কিনেছি। সেসময় একটি রাশিয়ান ক্যামেরা সস্তায় পাওয়া যেত, জেনিথ। ক্যামেরার উদবোধন হবে সত্যজিৎ রায়ের ছবি দিয়ে। বিষয়টা আমার কাছে অসম্ভব রোমাঞ্চকর। এর চেয়ে গভীর সুখ জীবনে আর কী আছে। অনুষ্ঠান শুরুর বেশ খানিক আগেই চলে এসেছি। নায়কের মতো প্রবেশ ঘটল মানিকবাবুর। এটা আমার কথা নয়, আমার পাশে বসা এক যুবতীর কথা। ‘পথের পাঁচালী’র স্রষ্টা বীরদর্পে হেঁটে আসছেন। নির্দিষ্ট চেয়ারে এসে বসলেন। তাঁর অক্ষয় কীর্তি ‘পথের পাঁচালী’ নিয়ে বলবেন ও শুনবেন।
এসে বসলেন আমার ঠিক পাঁচ হাত দূরে। এই দুর্লভ মুহূর্ত কেউ হাতছাড়া করে। ক্যামেরার স্যাটার টিপে দিলাম। কয়েক সেকেন্ড সময়ের ব্যবধান। এক ব্যারিটোন ভয়েস কানে এল– যখন কোনও পোট্রেট তুলবেন,খেয়াল রাখবেন ফ্ল্যাশের আলো যেন চোখে না পড়ে। অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম, সত্যজিৎ রায় আমাকেই বলছেন। ছোট্ট এক কথায় তিনি কত সহজেই ছবি তোলার সহজপাঠটা শিখিয়ে দিলেন। এই ঘটনার কয়েকদিন পর একদিন সাহসে ভর করে চলে গেলাম সত্যজিৎ রায়ের বাড়ি। যেমনই শুনেছিলাম তেমনই ঘটল। দীর্ঘকায়,সুদর্শন পুরুষটি দরজা খুললেন। আমার সঙ্গে এক কলেজ বন্ধু গিয়েছিল। তাঁর দিকে তাকিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি বোড়ালে থাকেন? বন্ধুটি তো থ। সত্যজিৎ রায় জানলেন কী করে ও বোড়ালে থাকে? বন্ধুটি শুধু হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়েছিল। তারপরই তিনি বলেছিলেন, পরিচালকদের তীক্ষ্ণ অবজারভেশন ক্ষমতা থাকতে হয়। এরপরে এ ব্যাপারে আর কোনও প্রশ্ন করার সাহস হয়নি। ঠিক যে সময় আমার প্রশ্নগুলো করব ভাবছি তখনই একটা ফোন এল। বেশ সময় নিয়েই ফোনে কথা বললেন। ফোন ছেড়ে আমাদের কাছে এসে বললেন, আজকে বেরিয়ে যাচ্ছি। অন্যদিন আসুন।
একটা প্রশ্ন না করে থাকতে পারলাম না। সমসাময়িক বাস্তবতা বলতে আপনি কি বোঝেন? সত্যজিৎ রায় এর উত্তরে বলেন, ” ডি সিকার বাইসিকল থিভস দেখে আমি মুগ্ধ। ওটাই আমার সমকালীন বাস্তবতার প্রথম পাঠ। তখনই আমি ঠিক করে ফেলি আমি ছবি করব। ঠিক এই ভাবেই ছবি করব।”
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news