দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ কলাম : 
আপনি সঞ্জু দেখেছেন? যদি এখনও পর্যন্ত না দেখে থাকেন তাহলে দেখে নিন। সঞ্জয় দত্তের এই বায়োপিকে সঞ্জুবাবার জীবনের বিভিন্ন বাঁক ও উত্থান-পতনের সঙ্গে সংবাদ মাধ্যমের একটি বিশেষ দিক এমন ভাবে সামনে এসেছে যা এই সময় আপনার দেখা দরকার। অবশ্য যদি আপনি রাজনীতির শৌখিন হন তবেই। যাঁরা দেখেছেন তাঁরা সম্ভবত ইতিমধ্যেই বুঝতে পেরে গেছেন যে এই অধম রাজনৈতিক কলমচি কেন সিনেমার গল্প ফাঁদতে বসেছে!
যাঁরা দেখেননি তাঁদের ছোট করে জানিয়ে দেওয়া যাক যে এই ছবিতে কিভাবে প্রকট হয়েছে সংবাদ মাধ্যমের অন্দরমহলে ঘটে যাওয়া জিজ্ঞাসাচিহ্ন আর বিস্ময়সূচক চিহ্নের নিপুণ খেলা কী ভয়ানক নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পারে! ছবিতে পরিচালক দেখিয়েছেন যে একটি সংবাদ পত্রে খবরের শিরোনাম হয়েছে, ‘সঞ্জয় দত্তের বাড়ির সামনে অস্ত্র বোঝাই গাড়ি?’ পরিচালক দেখিয়েছেন, এই একটি হেডলাইন কি ভাবে তছনছ করে দিতে পারে মানুষের জীবন। সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, কেরিয়ার…
যাক, সিনেমার গপ্পো অনেক হল। ধান ভানতে শিবের গীতটি বেশ বড় হয়ে গেল। মোদ্দা কথা হল এই যে বৃহস্পতিবারও এমনই এক জিজ্ঞাসাচিহ্ন রাজ্য রাজনীতিতে শোরগোল ফেলে দিল। কোনও কোনও খবর যেমন সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে, তেমনই কোনও কোনও খবরে কোনও কোনও মহলও খুব উৎসাহিত হয়। আবার এই পেইড নিউজ আর ফেক নিউজের জমানায় কোনও কোনও মহলও আবার কখনও কখনও কোনও কোনও মহলকে দিয়ে খবর তৈরিও করে! অন্তত, সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় ‘জনগণ’-এর অভিমত এমনটাই! তাঁদের এমন অভিমত যদি সত্যি ধরে নেওয়া হয় তাহলে প্রশ্ন হল এমন জিজ্ঞাসা চিহ্ন সম্বলিত খবরের দরকার যাদের পড়ে তাদের কেন পড়ে!
বৃহস্পতিবারের ঘটনাটিকে কেস স্টাডি হিসেবে আলোচনা করার আগে সবিনয়ে নিবেদন কোনও সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা করা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। বরং যে জল্পনাটি বাজারে চালু হয়েছে তার উল্টোপিঠে উঁকি মেরে দেখার প্রয়াস এই রচনায় থাকবে।
জল্পনা ছাড়া যে রাজনীতির খবর হয় না, একথা ধ্রুব সত্য। তবে জল্পনা যুক্তিগ্রাহ্য না হলে ষোলো আনাই মাটি হয়। অন্তত ন্যূনতম যুক্তি। মুকুলপুত্র শুভ্রাংশুর আকস্মিক শারীরিক বিপর্যয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে হাসপাতালে দেখতে গেছেন। জল্পনার জন্ম যাঁরা দিয়েছেন, এই ঘটনা দুটি তাঁদের এ হেন জল্পনা নির্মানে তাড়িত করেছে। বলে রাখা ভাল, এই সময় মমতার বিবিধ সমালোচনা করার অবকাশ থাকলেও একথা সত্য যে তিনি ব্যক্তিগত সম্পর্ককে আলাদা গুরুত্ব দেন (যদিও কেউ কেউ বলেন রাজনৈতিক প্রয়োজন থাকলে তবেই দেন)। মুকুলকে বাদ দিলেও শুভ্রাংশুর সঙ্গে অভিষেক তো বটেই মমতারও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভাল। তিনি শুভ্রাংশুকে তাঁর জন্মাবধি দেখছেন। সেই দিক থেকে বিচার করলে শুভ্রাংশুকে দেখতে যাওয়া মমতার পক্ষে স্বাভাবিক। অভিষেকের পক্ষেও। মমতা নিজেও সেদিন বলেছেন, তিনি সৌজন্যের কারনেই হাসপাতালে ছুটে এসেছেন। সাংবাদিকদের একথা বলার অর্থই হল মমতা বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন যে এর মধ্যে কোনও রাজনীতি নেই। তারপরেও মাথা চাড়া দিয়েছে জল্পনা। জল্পনা প্রসঙ্গেও দুটি তত্ত্ব আলোচিত হচ্ছে। প্রথমতঃ এটি নিখাদ সংবাদমাধ্যমের অত্যুৎসাহ আর দ্বিতীয়তঃ এমন খবর বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে তৃণমূলেরই হাত। প্রথমটি সত্য হলে সংবাদমাধ্যমের রুচিবোধ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দ্বিতীয়টি সত্য হলে তা নিয়ে আলোচনার অবকাশ রয়েছে।
পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন যে জায়গায় দাঁড়িয়ে তা বোঝাতে রবীন্দ্রনাথের একটি গানের কলি ব্যবহার করা যেতে পারে। সেটি হল, জয় করে তবু ভয় কেন তোর যায় না! মারের সাগর পাড়ি দিয়ে যে পঞ্চায়েত নির্বাচন এবার হয়েছে তাতে পেশিশক্তির জয়গান, মহিলাদের অসম্মান, অনুব্রতর ভাষ্য, শঙ্খ ঘোষের কবিতা, শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ, আদালতের ভূমিকারও সমালোচনা… সব মিলিয়ে এক কথায় ইউনিক! এমন নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে এসে মমতা দেখছেন তরী তাঁর হঠাৎ ডুবে যাচ্ছে! বোর্ড গঠন নিয়ে তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব যে জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে তা সম্ভবত দলনেত্রী আগে আঁচ করতে পারেননি। তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ অংশটি কী মুকুলের নির্দেশে চলছে! এই সংশয় তৈরি হওয়া তৃণমূল নেত্রীর পক্ষে অস্বাভাবিক নয়। সেই কারনেই কী তিনি এমন খবর ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন! রাজনীতিতে যেভাবে মানি পাওয়ার, মাসল পাওয়ারের ব্যবহারের কথা শোনা যায়, সেভাবে মিডিয়া পাওয়ার ব্যবহারের কথা শোনা যায় না এমনটা নয়। এ হেন পরিস্থিতিতে এমন একটি খবর ছড়িয়ে দিয়ে মুকুল সম্পর্কে তাঁর দলের বিক্ষুব্ধ অংশের কাছে ধোঁয়াশা তৈরি করতে চাইছেন মমতা, নিতান্ত কৌশলগত কারনেই তিনি এমন করছেন। এই সম্ভাবনার কথা তথ্যাভিজ্ঞ মহলের একাংশ বলছেন। এই সম্ভাবনা সত্য হলে একটি বিষয় অবশ্যই প্রমাণিত হয় যে লোকসভা নির্বাচনের প্রায় দোরগোড়ায় এসে মমতা অনুভব করছেন মুকুল-ব্যথা! এক বছর ধরে মুকুল খুব সুচারু ভাবে মমতাকে বুঝতে না দিয়ে তাঁর খেলা খেলে গেছেন। তিনি তৃণমূলকে ওপর দিয়ে কাটেননি, কেটেছেন তলা দিয়ে। পঞ্চায়েতে বোর্ড গঠন করতে গিয়ে বোঝা যাচ্ছে একেবারে নিচু তলায় তৃণমূলের পায়ের তলার মাটি কিভাবে সরেছে।
আর একটি ছোট অংশ আছে যাঁদের বক্তব্য এই জল্পনার পলিটিক্সে লাভ মুকুলের। তাঁরা বলছেন, এর ফলে মুকুল বিজেপি নেতৃত্বের কাছে যেমন বোঝাতে পারলেন তৃণমূলে তাঁর শুন্যস্থান এখনও পূর্ণ হয়নি একই সঙ্গে তৃণমূল নেতৃত্বের কাছেও বার্তা গেল মমতার কাছে মুকুলের গুরুত্ব এখনও কমেনি। তবে এই মতামতের বিপক্ষের বক্তব্য আরও জোরাল। তাঁদের মতে, মুকুল এমন কাঁচা কাজ করবেন না। রাজ্য নেতৃত্বের কেউ কেউ তাঁকে মেনে নিতে না পারার কারনে তিনি তৃণমূলে ফিরে গিয়ে চোরের ওপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাবেন না। অমিত শাহ এমনকি মোদির থেকেও তিনি গুরুত্ব পেয়েছেন। রাজ্যের কোনও কোনও সঙ্ঘ নেতা তাঁর বিরোধিতা করলেও করতে পারেন কিন্তু সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বহু সঙ্ঘ নেতার সমর্থনও তিনি পেয়েছেন। তাঁদের মতে, মুকুল অভিজ্ঞ খেলোয়াড়। তিনি ধ’রে খেলতে জানেন। মুকুল নিজেও মনে করছেন কেন্দ্রীয় বিজেপিকে তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দিহান করে তোলার উদ্দেশ্যেই এই কাজ করা হয়েছে।
মুকুলের আইনি নোটিসের পর সেই খবর প্রত্যাখ্যান করেছেন কর্তৃপক্ষ। তবে সব কিছু বাদ দিয়ে একটি ৩৬ বছরের ছেলের, রাজনৈতিক কর্মীর, একজন বিধায়কের ও একজন নামী নেতার পুত্রের অত্যন্ত গুরুতর শারীরিক অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে যা ঘটল তা সংবাদমাধ্যম তো বটেই যদি কোনও রাজনীতির কুশীলব এই ঘটনায় জড়িয়ে থাকেন তবে তাঁর বা তাঁদের গায়েও লজ্জা চিহ্ন এঁকে দিল এই খবর।
সিনেমার সঞ্জুর মতো সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে শুভ্রাংশুও হয়ত বলবেন, ‘কুছ তো লোঁগ কহেঙ্গে, লোঁগোকা কাম হ্যায় কহেনা!’
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news