পার্থসারথি পাণ্ডা :
হীরের আংটি’ দিয়ে ১৯৯১-এ ঋতুপর্ণ ঘোষ এলেন বাংলা ছবির জগতে, সত্যজিৎ রায় তখনও বেঁচে । স্বপ্নালু চোখের এই মানুষটি ছবি করতে এসেছিলেন বিজ্ঞাপন জগতের কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে। এক্ষেত্রে তাঁর এই ছবিজীবনের শুরুটার মিল আছে সত্যজিৎ রায়ের ছবিজীবনের সঙ্গে। সত্যজিৎও বিজ্ঞাপন জগৎ থেকেই ছবির জগতে এসেছিলেন। দুজনেই কারও সহকারী হয়ে ছবি তৈরির তালিম নেননি। চোখ, কান, প্রতিভা আর কাজের অভিজ্ঞতা দিয়েই শিখে নিয়েছিলেন ছবি তৈরির কাজ। সত্যজিৎ সম্ভবত ‘হিরের আংটি’ দেখার সুযোগ পাননি। কারণ, ছবিটা তৈরি হয়েও মুক্তি পায়নি। সে-কারণেই ঋতুপর্ণের প্রথম মুক্তি পাওয়া ছবি ‘উনিশে এপ্রিল’।
‘উনিশে এপ্রিল’ থেকেই আমরা দেখতে পাই ছবিতে চরিত্রের মুখে চড়া মেক আপ একেবারেই তিনি পছন্দ করছেন না। এ ব্যাপারে তিনি ভীষণ খুঁতখুঁতে। কোথাও মেক আপ বেশি মনে হলে নিজেই টিস্যু পেপার দিয়ে তুলে হালকা করে দিতেন। সেটের ব্যাপারেও তাঁর খুঁতখুঁতেমি এমন ছিল যে, মনের মতো ডাইনিং টেবিল সাজানো হয়নি বলে একবার শ্যুটিং ক্যানসেল করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এই খুঁতখুঁতেমির জন্য তিনি নিজেই প্রপস কিনে এনে ছবিতে ব্যবহার করতেন, এমনি করে তাঁর গোডাউনে এত প্রপস জমে উঠেছিল, অত প্রপস সাপ্লায়ারের গোডাউনেও থাকে না। তাঁর ছবির আর্ট ডিরেক্টর ছিলেন তাঁরই সহোদর ইন্দ্রনীল ঘোষ। সেটের খুঁটিনাটি নিয়ে মাঝেমাঝেই দাদাভাইয়ের মধ্যে একচোট হয়ে যেত, তারপরেই আবার গলাগলি ভাব। দুই শিল্পমনস্ক মানুষোর কাছে তখন ষোল আনাই ছবি, তার থেকে বের করে নেওয়া দুএক চিলতের যেটুকু অবসর, সেটুকুই ব্যক্তিগত।
সোনার কলম নিয়ে জন্মেছিলেন ঋতুপরণ। ছবির ডায়লগ লেখার ক্ষমতা সবার থাকে না, কিন্তু তাঁর ছিল যেন জন্মগত। মানুষের অন্তরের কথা, বিশেষ করে মেয়েদের মনের কথা তাঁর অাগে এত দরদ দিয়ে খুব কম পরিচালকই লেখা থেকে ছবিতে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। খুব দ্রুত লিখতে পারতেন তিনি। ‘আর একটি প্রেমের গল্প’ ছবিতে তিনি যখন অভিনয় করছিলেন, তখন শ্যুটিংএর ফাঁকে ফাঁকে লিখেছেন টিভি ধারাবাহিক ‘গানের ওপারে’র স্ক্রিপ্ট। মাল্টি চ্যানেলের যুগে তাঁর লেখা ও পরিকল্পনায় এই ধারাবাহিকটি অভূতপূর্ব আলোড়ন তুলেছিল।
অবনীন্দ্রনাথের ‘নালক’ নিয়ে ছবি করার খুব ইচ্ছে ছিল তাঁর। কিন্তু বুদ্ধের ওপর বার্তোলুচির ‘লিটল বুদ্ধা’ ও ‘দ্য লাস্ট এম্পারার’ দেখে তিনি এতটাই আপ্লুত হয়েছিলেন যে, আর ‘নালক’ করতে চাননি। মনে হয়েছিল, যেন বুদ্ধকে শিশুর চোখে আবিষ্কারের আর কিছুই বাকি রাখেননি বার্তোলুচি। তবে স্বপ্নের প্রজেক্টটি তিনি একেবারেই বাতিল করে দিলেন না, ‘নালক’ একদিন তিনি করলেন, তবে একটু অন্যভাবে। শ্যুটিং শ্যুটিং খেলার মাঝে মনের কোণের রহস্যের জট খোলার ছবি ”খেলা’ র মধ্য দিয়ে। সেখানে অভিরূপ নামের বাচ্চা ছেলের চরিত্রের মধ্যে তিনি সেই সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন অসাধারণ মুন্সিয়ানায় অবন ঠাকুরকে। তার ইস্কুল যেতে ভালো না-লাগা, লাল মাছের একোয়ারিয়ামের জলে লাল রঙ মিশিয়ে দেওয়াতে সমস্ত মাছ মরে যাওয়ায় বাবার বকুনি খাবার ভয়—এ সবই অবন ঠাকুরের জীবনের ঘটনা। এসবের মধ্য দিয়েই তিনি অন্য এক ‘নালক’কে উপস্থিত করেছিলেন, অবন ঠাকুরকে আঁকড়ে ধরেও যে তাঁর একান্ত নিজের। এ ছবিতেই প্রথম তিনি গান লিখলেন ছায়াছবির জন্য। পরে ‘রেনকোট’ ছবির জন্য লিখেছেন ব্রজবুলিতে– ‘ মথুরা নগরপতি’, ‘ পিয়া তোরা ক্যায়সা অভিমান’ প্রভৃতি গান।
অভিনেতা হিসেবেও তিনি ছিলেন অসাধারণ। ঋত্বিক, সত্যজিতের মতো পরিচালকেরা স্ক্রিপ্ট পড়া বা শ্যুটিংএর সময় অনেক সময়ই চরিত্রটিকে কেমন দেখতে চান সেটা অভিনেতাদের অভিনয় করে দেখিয়ে দিতেন। ঋতুপর্ণ ছিলেন সেই ঘরানার সফল পরিচালক। তাঁর শেষ সম্পূর্ণ ছবি ‘চিত্রাঙ্গদা”য় তিনি সেই অভিনয় প্রতিভার অসামান্য ছাপ রেখে গেছেন। বলে গেছেন তাঁর জীবনধারার শেষ কয়েক বছরের নিজস্ব দর্শন ও লড়াইয়ের কথা। অাজ বাঙালির কাছে ঋতুপর্ণ ছায়াছবির পরিচালক মাত্র নন, একটি সম্পূর্ণ বিকশিত প্রতিভা।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news