গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় :
মাকর্সবাদীরা বিপ্লবের হুঙ্কার ছেড়েও এতদিনে যা করতে পারেননি, একা বিপ্লব গদিতে আসীন হয়েই তা করে দেখিয়ে দিলেন। দেখিয়ে দিলেন, ভারতের এক চিলতে রাজ্যে ক্ষমতায় এসে সারা ভারতে বৈপ্লবিক চেতনার প্রদুর্ভাব ঘটানো যায়। এই নব্য বিপ্লবের পিছনে ত্রিপুরার ভাবী মুখ্যমন্ত্রীর কাহিনিটা একটু গুছিয়ে বলতে হয়। তাঁর দল ক্ষমতায় আসা মাত্র লেনিন মূর্তিকে ভেঙে খানখান করেছে তাঁর দলের লোকজন। আর এই কারণেই ফের গা ঝাড়া দিয়ে উঠে মার্কসবাদীরা জানান দিতে পেরেছেন, বিপ্লব এখনও মরে নাই।
জানা গেল, খোদ রাশিয়াতে কম্যুনিস্ট পার্টি বিনষ্ট হলেও এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে মার্কসবাদ আজও উজ্জ্বল তারকার মতো আকাশে বিরাজমান।
এতে খোদ মার্কস বা লেনিনের প্রধান দফতরের গোঁসা হলেও কিছু করার নেই, কারণ ইহাই সত্য। খোদ রাশিয়াতে যেদিন লেনিন পপাত চ মমার চ হয়েছিলেন সেদিন ভারতের মার্কসবাদীদের মধ্যে এমন পিতৃশোক দেখা যায়নি, এখন যেরকমটি দেখা যাচ্ছে।
বামপন্থীরা যখন ক্ষমতায় থেকেছেন তখন মূর্তি যত না ভেঙেছেন তার চেয়ে বেশি হাতে মাথা কেটেছেন। ক্রমে ক্রমে যত বলশালী হয়েছেন তত নখ, দাঁত বেরিয়েছে। এ রাজ্যে তৃণমূল আসার পর সেসব নখ দাঁত ঢুকে গিয়েছিল। লেনিন সিংহাসনচ্যূত হতেই আবার তাঁদের মধ্যে এক বৈপ্লবিক জাগরণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সারা দেশ ধীরে ধীরে গৈরিক বসনাবৃত হয়ে যাওয়ায় তাঁরা এটা বুঝতে পারছেন না, শ্রেণিশত্রু বলতে কাকে চিহ্নিত করবেন। কোনও এক পৌরাণিক কালে খোদ ডাঙে সাহেব ভারতের কম্যুনিস্টদের পরামর্শ দিয়েছিলেন, কংগ্রেসের পাশে পাশে থাক, তাহলে অন্তত কিছুদিন দুধে-ভাতে থাকবে। সে কথা ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টি কানে তোলেনি। তাদের চোখে তখন বিপ্লবের স্বপ্ন। অবশেষে তারা এক থেকে দুই হল, দুই থেকে তিন। সিপিআই থেকে সিপিআই (এম), সেখান থেকে এম-এল। সেখান থেকে কলেজ স্কোয়ার। মাথা ফাটল ঈশ্বরের। মাথা ফাটানোর রাজনীতি তারপর থেকে চলেই এসেছে। তার আগে কংগ্রেসও এ বিষয়ে কিছু কম ছিল না। তবে তাদের হীনবল হতে সময় লাগেনি। কারণ দোর্দণ্ডপ্রতাপ সিপিআই (এম)-এর রণবাহিনীর কাছে বাকিরা তখন শিশু। এখন ডানা মেলেছে বিজেপি। তারাই বা ছাড়বে কেন? তারা জানে, এখনই তো মূর্তি ভাঙার সময়। থানায় নতুন দারোগা এলে প্রথম কাজটি যেটা করেন, তা হল, পুরনো পাপীদের ধরে এনে, আড়ং ধোলাই লাগানো, তাতে মাসের পয়লা হাতে নগদের জোগান বাড়ে। এ সূত্র ক্ষমতার সমস্ত অলিন্দে একই। এখন বিজেপির পালা। বহুদিন তারা রিজার্ভ বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করেছে, কবে মাঠে নামবে। মাঠে যখন একবার নামতে পেরেছে, তখন কসরৎ দেখাতে তারা ছাড়বে কেন?
উত্তরপ্রদেশ থেকে হিমাচল-এখন বিজেপি সর্বত্রগামী। গুজরাতের শিক্ষায় শিক্ষিত, আরএসএসের পাঠশালায় প্রশিক্ষিত বিজেপির প্রথম পাঠ কি মহম্মদ গজনি দিয়ে যাননি? যে সোমনাথ মন্দির ধ্বংস নিয়ে বিজেপি এতকাল মাইক ফুঁকে এসেছে, তারা কি বাবরি ভাঙেনি? তারা কি তাজমহল কে শিবমন্দির না বানিয়ে ছাড়বে? এ তো সবে শুরু। তবে লেনিনকে টান মেরে ফেলে দিয়ে বিজেপিও সম্ভবত, কিঞ্চিত লজ্জা পেয়েছে, না হলে কম্যুনিস্টদের জন্য সান্ত্বনা পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখত না।
ত্রিপুরার বেলোনিয়া পুরসভার সরকারি আধিকারিক প্রস্তাব দিয়েছেন, আপাতত লেনিনের মূর্তির খণ্ডিত মুণ্ড কাপড়ে মুড়ে রেখে দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে যদি কেউ ওই খণ্ডিত মস্তক নিয়ে চান তাহলে সে আবেদন খতিয়ে দেখা হবে। (আলিমুদ্দিন নিশ্চয় সে চেষ্টা করবে বলেই মনে হয়।) যদি তা না করে, তাহলে বুঝতে হবে লেনিনের পতন যথেষ্ট বার্তাবহ এবং ইঙ্গিতপূর্ণ।ভারতীয় কম্যুনিস্টদের বড়দা অর্থাৎ সিপিআই (এম) হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে যে ক্রমাগত লেনিন, স্ট্যালিন করতে গিয়ে, তাদের ঘটি, বাটি চাঁটি হয়েছে। এখন বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক শ্লোগান দিয়ে বাজার গরম করা যখন হয়েই গিয়েছে তখন বাজার ধরবার দায়িত্ব চুনোপুঁটিদের হাতেই বরং ছেড়ে দেওয়া যাক। বিপ্লবের আগুনে আপাতত গা সেঁকা হয়ে গিয়েছে, সে আগুনে এবার হাওয়া দিক অন্যরা।
হাতে রয়েছে পেন্সিল, তার নাম এসইউসি। লেনিন মূর্তি ভাঙার পর ত্রিপুরার সদর দফতর আগরতলায় তারা স্ট্যালিনের মৃত্যুবার্ষিকী পালন করে জানিয়ে দিয়েছে, প্রকৃত বাঙালী কম্যুনিস্টের হৃদয়ে এখনও মহামতি লেনিন, চেতনায় এখনও শ্রেণিশত্রু নিধনকারী স্ট্যালিন।
জয় হোক কম্যুনিস্টদের, জয় হোক বিজেপির। মূর্তি কর্তন, মুণ্ড কর্তনের মধ্য দিয়ে নির্মাণ হোক নতুন ভারতের।
মতামত লেখকের ব্যক্তিগত
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news