Breaking News
Home / TRENDING / রবীন্দ্রনাথের প্রিয় মেটাফোর ছিল রথ, উল্টে দেখুন হুতুম

রবীন্দ্রনাথের প্রিয় মেটাফোর ছিল রথ, উল্টে দেখুন হুতুম

কিশোর ঘোষঃ

রবীন্দ্রনাথের অন্যতম প্রিয় মেটাফোর ছিল রথ। যা বার বার তাঁর কবিতায়, গানে, নাটকে ফিরে এসেছে। তেমনই এক কবিতা তো আজকের বাঙালিরও ভুলতে পারেনি। কবিতার নাম ‘কৃপণ’। কবিতা শুরু হয় এই ভাবে—‘আমি ভিক্ষা করে ফিরতেছিলেম/গ্রামের পথে পথে,/ তুমি তখন চলেছিলে/ তোমার স্বর্ণরথে।’ এবং সেই অমোঘ শেষ দুটি লাইন—‘তোমায় কেন দিই নি আমার/ সকল শূন্য করে।’

শুধু রবীন্দ্রনাথে নয়, বাংলা সাহিত্যে রথের মেলার কথা ঘুরেফিরে এসেছে। আসবারই কথা। যেমন বঙ্কিমের গল্প ‘রাধারানী’। তবে সেকালের শহরের রথ, গ্রামের রথ এবং মেলায় ভিড় করা মানুষের চরিত্র লিখে গেছেন হুতুম। কালীপ্রসন্ন সিংহ লিখছেন—‘ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বার্নীস করা জুতো ও সেপাই প্যেড়ে ঢাকাই ধুতি পোরে, কোমরে রুমাল বেঁধে, চুল ফিরিয়ে, চাকর চাকরাণীদের হাত ধরে পয়নালার ওপোর পোদ্দারের দোকানে ও বাজারের বারান্ডায় রথ দেখতে দাঁড়িয়েছে। আদবইসি মাগিরা খাতায় খাতায় কোরা ও কলপ দেওয়া কাপড় পোরে রাস্তা ঘুড়ে চলেচে, মাটীর জগন্নাথ, কাঁঠাল, তালপাতার ভেঁপু, পাখা ও শোলার পাখি বেধড়ক বিক্রী হচ্চে, ছেলেদের দেখাদেখি বুড়ো বুড়ো মিনসেরাও তালপাতের ভেঁপু নিয়ে বাজাচ্চেন… বৈরাগীদের দু’তিন দল নিমখাসা কেত্তন, তার পেছনে সকের সংকীর্ত্তন গাওনা।… পেচোনে চোতাদারেরা চেঁচিয়ে হাত নেড়ে গান বলে দিচ্চেন।’ (বানান অপরিবর্তিত)
আর যদি বলি নিখাদ গ্রামবাংলার মেলা, তবে তার অপূর্ব বর্ণনা আছে মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাইলস্টোন উপন্যাস ‘পদ্মানদীর মাঝি’তে। সেখানে তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম এক নির্মম পর্যবেক্ষক। ফলে লোকজীবনের কোনও দিক বাদ যায় না। উপন্যাসের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয় এই ভাবে—‘রথ উপলক্ষে কেতুপুরে কোনোরকম ধুমধাম হয় না। পদ্মার ওপারে আছে সোনাখালি গ্রাম, রথের উৎসব হয় সেইখানে। সোনাখালির জমিদারের ছোটো একটি রথ বাহির করে। সোনাখালি হইতে মোহনপুর অবধি দশ মাইল লম্বা একটি উঁচু পথ আছে। বর্ষাকালে এই পথটিই এ অঞ্চলে জলের নীচে ডুবিয়া যায় না। পথটির নাম ছ কোশের পথ।…সোনাখালির জমিদারদের রথ এই পথ ধরিয়া আধমাইল খানেক গিয়া অন্নবাবার মাঠের একপাশে থাকে সাতদিন, তারপর উলটারথের দিন আবার রওনা হয় জমিদার বাড়ির দিকে।…রথের দিন এই মাঠে প্রকাণ্ড মেলা বসে, উলটারথ পর্যন্ত স্থায়ী হয। পদ্মা আগে তফাতে ছিল, এখন এত কাছে সরিয়া আসিয়াছে যে মেলার একটা প্রান্ত প্রায় নদীতীরেই আসিয়া ঠেকে। স্থলপথ ও জলপথে দল বাঁধিয়া আসিয়া মানুষ মেলায় ভিড় বাড়ায়। ভিড় বেশি হয় প্রথম এবং শেষ দিন, মাঝখানের কদিন মেলা একটু ঝিমাইয়া যায়। গ্রামবাসীব প্রয়োজনীয় ও শখের পণ্য সমস্তই মেলায় আমদানি হয়, এমন কী শহরেব নারী-পণ্যের আবির্ভাবও ঘটিয়া থাকে। কাপড়ের দোকান, মনোহারি দোকান, মাটির খেলনার দোকান, খাবাবের দোকান, দোকান যে কত বসে তার সংখ্যা নাই। গোরু-ছাগল বিক্রয় হয়, কাঁটাল ও আনারসে মেলার একটা দিক ছাইয়া যায়, বড়ো বড়ো নৌকায় মালদহ ও ত্রিহুতের আম আসে। লেমোনেডের নামে বোতলে ভরা স্যাকারিনের লাল নিস্তেজ জল বিক্ৰয় হয় অজস্র। মেয়েরা সাধ মিটাইয়া শাঁখা ও কাঁচের চুড়ি পরে, ছেলেদের কোমরে বাঁধিয়া দেয় নূতন ঘুনসি। কয়েকটি স্থানে গবর্নমেন্ট হইতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত জুয়াখেলা চলে। মেলার এটা একটা প্রধান অঙ্গ। সবচেয়ে বেশি ভিড় হয় বালাখেলার কাছে। চারকোনা বাঁশের বেড়ার চারিদিকে ভিড় করিয়া দাঁড়াইয়া চার চার পয়সায় চার চার বালা কিনিয়া বেশির ভাগ গরিব চাষাভুষারাই হরদম ছুঁড়িতে থাকে, রুদ্ধনিশ্বাসে চাহিয়া দ্যাখে নিক্ষিপ্ত বালাটি লাল শালুতে সাজানো টাকা আধুলি সিকি ও দোয়ানির অরণ্যে অন্ধের মতো ঘুরিযা ঘুরিয়া স্থির হইতেছে ফাঁকা জায়গায়। পুনরাবর্তিত ব্যর্থতায় তাহাদের কোনোমতে যেন বিশ্বাস হইতে চায় না।’ (বানান অপরিবর্তিত)

কালজয়ী উপন্যাসের অংশবিশেষের উদাহরণ হিসেবে হয়তো একটু বেশি হয়ে গেল। আসলে লোভ সামলানো গেল না। লোভ সামলানো যাবে না ফের রবীন্দ্রনাথের উদাহরণ দিতে গিয়েও। শেষ জীবনে তাঁর গদ্য কবিতার অসাধারণ অনুশীলন চলছে তখন।লিখে ফেললেন তেমনই একটি। আমার ধারণা যা কবিতা কম, বেশি অনুগল্প। জানি না অনুগল্প লেখার রেওয়াজ তখন কতটা ছিল। কিন্তু ‘লিপিকা’র ‘রথযাত্রা’ পুরোটাই পড়ে ফেলা যায় রথের মরসুমে—

রথযাত্রার দিন কাছে।

তাই রানী রাজাকে বললে, ‘চলো, রথ দেখতে যাই।’

রাজা বললে, ‘আচ্ছা।’

ঘোড়াশাল থেকে ঘোড়া বেরোল, হাতিশাল থেকে হাতি। ময়ূরপংখি যায় সারে সারে, আর বল্লম হাতে সারে সারে সিপাইসান্ত্রি। দাসদাসী দলে দলে পিছে পিছে চলল।

কেবল বাকি রইল একজন। রাজবাড়ির ঝাঁটার কাঠি কুড়িয়ে আনা তার কাজ।

সর্দার এসে দয়া করে তাকে বললে, ‘ওরে, তুই যাবি তো আয়।’

সে হাত জোড় করে বললে, ‘আমার যাওয়া ঘটবে না।’

রাজার কানে কথা উঠল, সবাই সঙ্গে যায়, কেবল সেই দুঃখীটা যায় না।

রাজা দয়া করে মন্ত্রীকে বললে, ‘ওকেও ডেকে নিয়ো।’

রাস্তার ধারে তার বাড়ি। হাতি যখন সেইখানে পৌঁছল মন্ত্রী তাকে ডেকে বললে, ‘ওরে দুঃখী, ঠাকুর দেখবি চল্‌।’

সে হাত জোড় করে বলল, ‘কত চলব। ঠাকুরের দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছই এমন সাধ্য কি আমার আছে।’

মন্ত্রী বললে, ‘ভয় কী রে তোর, রাজার সঙ্গে চলবি।’

সে বললে, ‘সর্বনাশ! রাজার পথ কি আমার পথ!’

মন্ত্রী বললে, ‘তবে তোর উপায়? তোর ভাগ্যে কি রথযাত্রা দেখা ঘটবে না।’

সে বললে, ‘ঘটবে বৈকি। ঠাকুর তো রথে করেই আমার দুয়ারে আসেন।’

মন্ত্রী হেসে উঠল। বললে, ‘তোর দুয়ারে রথের চিহ্ন কই।’

দুঃখী বললে, ‘তাঁর রথের চিহ্ন পড়ে না।’

মন্ত্রী বললে, ‘কেন বল্‌ তো।’

দুঃখী বললে, ‘তিনি যে আসেন পুষ্পকরথে।’

মন্ত্রী বললে, ‘কই রে সেই রথ।’

দুঃখী দেখিয়ে দিলে, তার দুয়ারের দুই পাশে দুটি সূর্যমুখী ফুটে আছে।

বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

https://www.youtube.com/channelhindustan

https://www.facebook.com/channelhindustan

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *