কিশোর ঘোষঃ

ঠাকুরের তো মানুষের থেকেও বেশি হাত হয়। বিষ্ণুর চার হাত, মা-কালীরও, দূর্গাঠাকুরের তো একবারে দশ দশটি। সেখানে জগন্নাথ দেবের হাত কাটা! খুব অবাক হয়েছিল আমাদের ছোটবেলা। প্রায় অধিকাংশ বাঙালি বাড়ির দেওয়ালে তখনও বাংলা ক্যালেন্ডার। যার একটিতে অবশ্যই জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার ওই মূর্তির ছবি। সাল ফুরোলে যার স্থান হত ঠাকুর ঘরের দেওয়ালে। প্রথম প্রথম ওই মূর্তি দেখে হাঁ করে তাকিয়ে থেকেছি। আশ্চর্য হয়েছি রথের মেলায় বিক্রি হওয়া ছোট সাইজের মাটির বা কাঠের জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা দেখেও। যে ত্রীমূর্তি প্রধানত ছোটদের জন্য কেনা হত। আর রথের দিন ছোট রথটাকে মন ভরে সাজিয়ে, ঠাকুরের প্লেটে নকুল দানা প্রসাদ দিয়ে ছোটরা সেই ঠাকুর বসিয়ে পাড়াময় দড়ি টানত। বড়রা দিত প্রণামী। কিন্তু যে কথা হচ্ছিল, জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার মূর্তি সনাতন ধর্মের অন্য দেবতাদের সঙ্গে কিছুতেই মেলে না। সেই মহিমা নেই। বরং নাক-মুখ-চোখ আঁকা। অনেকটা লোকশিল্পীদের কাজের মতো। কিন্তু এমন কেন?
আসলে এর পেছনে আছে এক পুরাণ কাহিনি। সেবার কৃষ্ণ তাঁর ভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে দেখা দেন। দেখা দিয়ে আদেশ করেন, পুরীর সমুদ্রতটে ভেসে আসা একটি কাঠের খণ্ড দিয়ে তাঁর মূর্তি তৈরি করতে হবে। মূর্তি নির্মাণের জন্য রাজা একজন উপযুক্ত কাঠের মিস্ত্রি খোঁজ করেন। এমন সময় এক রহস্যময় বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ যিনি কিনা কাঠের মিস্ত্রি তিনি রাজার কাছে উপস্থিত হন। রাজা তাকে দায়িত্ব দেন। কাষ্ঠশিল্পী মূর্তি নির্মাণের জন্য কয়েকদিন সময় চান। তবে সেই শিল্পী রাজাকে একটি শর্ত দেন। বলেন, মূর্তি নির্মাণকালে কেউ যেন তাঁর কাজে বাধা না দেন। এবং বন্ধ দরজার আড়ালে শুরু হয় কাজ। স্বাভাবিক যে রাজা, রানি সহ সকলেই নির্মাণকাজের ব্যাপারে অতি আগ্রহী। প্রতিদিন তাঁরা বন্ধ দরজার কাছে যেতেন, শুনতে পেতেন কাঠ খোদাইয়ের আওয়াজ। ৬-৭ দিন বাদে যখন রাজা বাইরে দাঁড়িয়ে এক সময় আওয়াজ বন্ধ হয়। অত্যুৎসাহী রানি কৌতূহল সামলাতে না পেরে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে পড়েন। দেখেন মূর্তি তখনও অসমাপ্ত। কাঠের মিস্ত্রিও ঘরে নেই। পুরাণ মতে অন্তর্হিত রহস্যময় ওই কাঠের মিস্ত্রি ছিলেন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা। কিন্তু মূর্তির হাত পা তৈরি হয়নি দেখে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন বিমর্ষ হন স্বভাবতই। কাজে বাধাদানের জন্য অনুতাপ করেন। তখন দেবর্ষি নারদ ঘটনাস্থলে আবির্ভূত হন। নারদ রাজাকে সান্তনা দিয়ে বলেন, এই অর্ধসমাপ্ত মূর্তি পরমেশ্বরের এক স্বীকৃত স্বরূপ। সেই মূর্তিই পুরীর মন্দিরে আজও পূজিত হয়। প্রতিবার রথের সময় এই বাংলাতেও যার পুজো হয় ধুমধাম করে। তবু এক কথা বলতেই হয়।
জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার এই যে লোকশিল্পরূপ তা নিখাদ শিল্প হিসেবেও অন্যন্য। যা হয়তো কম মহিমাময়, তুলনায় অনেক বেশি ঘরের দেবতা। যে ভগবান থাকেন ভক্তের সুখ-দুঃখের কাছাকাছি।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news