পার্থসারথি পাণ্ডা:
জগন্নাথদেবের আবির্ভাব কাহিনীর একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে, পৌরাণিক ইতিহাস। বিচিত্র কাহিনী ও.দ্বন্দ্বের নানান পরত তাতে। আসুন, সেই পরত খুলতে খুলতে এগোই—
কৃষ্ণ-বলরাম তখন দ্বারকায়, নিজের রাজ্যে স্ত্রী পুত্রদের নিয়ে যদুরাজত্বে। কুরুক্ষেত্রযুদ্ধের পর ছত্রিশটা বছর কেটে গেছে। এবার যদুবংশ ধ্বংসের পালা। কুরুক্ষেত্রে কৌরবকুল ধ্বংস হয়েছিল, গান্ধারী তার জন্য কৃষ্ণকেই দায়ী করেছিলেন। অভিশাপ দিয়েছিলেন, ছত্রিশ বছর পর যদুবংশ ধ্বংস হবে। সেই কাল এখন উপস্থিত। ধ্বংসের হেতু তো আছে, উপলক্ষ্য কি হবে?
একদিন কণ্ব আর বিশ্বামিত্রকে নিয়ে নারদ এলেন শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে। তখন বাড়ির ছেলেদের কি দুর্বুদ্ধি হল, তিন ঋষির সঙ্গে মস্করা করতে গেল। কৃষ্ণপুত্র শাম্বকে বাড়ির গর্ভিনী বউ সাজিয়ে নিয়ে এসে বলল, হে ঋষিগণ বলুন তো এ কিরকম সন্তান প্রসব করবে?
ঋষিরা তো তাদের স্পর্ধা দেখে অবাক। তাঁরা দিব্যদৃষ্টিতে তো স্পষ্টই বুঝলেন কুলবধূর বেশে তাঁদের সামনে যাকে আনা হয়েছে, সে আসলে শাম্ব! তাঁদের মতো ত্রিকালদর্শী ঋষিদের সঙ্গে মস্করা! রাগে কেঁপে উঠলেন তাঁরা। রাগের মুখে বেরিয়ে এলো অভিশাপ, ও মুষল প্রসব করবে! লোহার মুষল। আর সেই মুষলের জন্যই যদুবংশ ধ্বংস হবে! রেগে ঋষিরা চলে গেলেন।
ঋষিদের কথা মিথ্যে হল না। শাম্ব লোহার মুষল প্রসব করলেন। তাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হল বটে। কিন্তু তাতেও প্রতিকার হল না। সমস্ত যাদব পুরুষ ও নারীদের মধ্যে উচ্ছৃঙ্খলতা দেখা দিল। তাঁরা পূজনীয় কৃষ্ণকে উপেক্ষা করতে শুরু করলেন। তাঁর সামনেই অকথাকুকথা বলতে লাগলেন, মদ্যপান করতে লাগলেন এবং কুরুক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা নিয়ে তাঁকে দোষ দিতে লাগলেন, ছোট ছোট ঘটনা নিয়ে কথা নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি করতে লাগলেন। নীতি ও সদাচার বলে আর কিছু রইলো না। রাতে মহাকালের ছায়া দেখা যেতে লাগল, ঘোড়ার পেটে গাধা, গাধার পেটে হাতি, নেউলের পেটে ইঁদুর, কুকুরের পেটে বেড়ালের জন্ম হতে লাগল, ত্রয়োদশীতে অমাবস্যা দেখা গেল, সমস্ত প্রেক্ষাপটে যেন ধ্বংসের লক্ষণ ফুটে উঠতে লাগল। যাদবদের বৃষণী, কুক্কুর, ভোজ, অন্ধক–এই চার সম্প্রদায়ের মধ্যে গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে মারামারি কাটাকাটি চলতে লাগল। মারা গেলেন কৃষ্ণের সব পুত্র ও আত্মীয়রা। তখন কৃষ্ণ আর থাকতে পারলেন না। তিনি এক গাছি তৃণ নিয়ে মন্ত্রবলে গড়ে তুললেন একটি লোহার মুষল। সেই মুষল হাতে নিয়ে লড়াইয়ে মত্ত, দুর্বৃত্ত ও অবাধ্য যাদবদের কিছুতেই নিরস্ত্র করতে না পেরে নিজের হাতে হত্যা করলেন। তখন পৃথিবী আবার শান্ত হল। গান্ধারীর অভিশাপ সত্য করে তিনি চোখের সামনে যদুবংশ ধ্বংস হতে দেখলেন।
এবার ফিরে যাওয়ার পালা। একরাশ বৈরাগ্য নিয়ে বলরাম সমুদ্রের জলে বসে তনু ত্যাগ করলেন। শ্রীকৃষ্ণ তাও দেখলেন। চোখের সামনে ও সংসারে তাঁর তখন চরম শূন্যতা। মনে চরম বিষণ্ণতা। এবার তাঁকেও তনু ত্যাগ করতে হবে। সময় এসে গেছে। এইসব ভাবতে ভাবতে হাঁটতে হনতিনি জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে এক জায়গায় এসে বসলেন। এমন সময় একটা তির এসে বিদ্ধ করলো তাঁকে। এই তো তনুত্যাগের হেতু হাজির! এটাই হওয়ার ছিল। এরও একটি ইতিহাস আছে। আর সেই ইতিহাসের সূত্র ধরেই আমরা পৌঁছে যাবো জগন্নাথদেবের আবির্ভাবের কাহিনীতে। সে কাহিনী আগামী কাল, দ্বিতীয় পর্বে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news