Breaking News
Home / TRENDING / ঠাকুরের চোখে জগৎকল্যাণে জগতের মা

ঠাকুরের চোখে জগৎকল্যাণে জগতের মা

পার্থসারথি পাণ্ডা

 

আজ ঠকুরের ১৮২তম জন্ম তিথি। আজ থেকে দেড়শ বছর আগে, মা জগদম্বার লীলাক্ষেত্র দক্ষিণেশ্বরে সকলের প্রিয় ‘ছোট ভটাচাজ’ গদাধর একে একে প্রচলিত সব ধর্মের সাধনপথ পরিক্রমা করেছিলেন, সেই পথে সিদ্ধিলাভ করে হয়ে উঠেছিলেন ঠাকুর শ্রী শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। তাঁর সাধনায় ‘যত মত’-এর সমস্ত পথ এসে মিলেছিল মা জগদম্বার চরণতলে। মৃন্ময়ী মাকে অনুধ্যানে দেখেছিলেন জগতব্রহ্মে পরিব্যাপ্ত হতে। এই সাধনপথে চলতে চলতে কত সিদ্ধাই, কত তান্ত্রিক, কত যোগী, কত পণ্ডিতের সাক্ষাৎ পেয়েছেন, হয়েছে ভাবের আদানপ্রদান। তাঁরাই বারে বারে ছুটে এসেছেন দক্ষিণেশ্বরে এই নবীন যোগীর সান্নিধ্য পেতে। এভাবেই একদিন এসেছিলেন ব্রাহ্মণী ভৈরবী যোগেশ্বরী।

১৮৬১ সালের মাঝামাঝি, একদিন ভৈরবীর নৌকো এসে ভিড়ল দক্ষিণেশ্বরে মায়ের মন্দিরের গায়ে বকুলতলার ঘাটে। তখন তাঁর পরনে ছিল উজ্জ্বল গেরুয়া, আলুলায়িত কেশ, কন্ঠে ছিল লাল শালুতে বাঁধা ইষ্টদেবতা রঘুবীরের শিলামূর্তি। তাঁকে দূর থেকে দেখেই ঠাকুর বুঝেছিলেন ইনি তাঁরই পথের পথিক, তাঁকেই খুঁজতে এসেছেন। ভাগ্নে হৃদয়কে দিয়ে ডাকিয়ে আনলেন তাঁকে। ভৈরবী জানালেন, মা জগদম্বার স্বপ্নাদেশে ঠাকুরকে খুঁজতে খুঁজতেই তাঁর দক্ষিণেশ্বরে আসা।

কিন্তু, মা জগদম্বা কেন স্বপ্নাদেশে ডেকে আনলেন ভৈরবীকে দক্ষিণেশ্বরে? ঠাকুরের সাধনপথে কোন অভিপ্রায় পূর্ণ করতে?

ঠাকুরের ভাবজীবনে মায়ের জন্য আকুতি, ভাবাবেশ, মূর্ছা; সেসময় অনেকের মতো রানীর জামাই মথুরের কাছেও নেহাতই রোগলক্ষণ বলে মনে হয়েছিল। ভৈরবীই প্রথম মথুরকে বুঝিয়ে দিলেন, এ হচ্ছে ঠাকুরের আবেশ, যে আবেশ কৃষ্ণ বিহনে রাধার আসত, শ্রী চৈতন্যের আসত, তেমনি মায়ের জন্য ঠাকুরের আসে। গীতায় ভগবান যুগে যুগে যে অবতার নেবার সঙ্কল্প করেছিলেন, ইনি তাঁদেরই একজন, উনিশ শতকের ধর্মসঙ্কটের সন্ধিক্ষণে যুগাবতার রামকৃষ্ণ। একদিনের একটি ঘটনায় ভৈরবী চিনে নিয়েছিলেন তাঁর এই প্রাণের ঠাকুরকে।

সেদিন ভৈরবী ইষ্টদেবতা রঘুবীরকে অন্নভোগ নিবেদন করে তাঁরই ধ্যানে মগ্ন হয়ে চোখের জলে আকুল হয়ে তাঁকে আবাহন করছিলেন। তখন নিজের ঘরে বসে ঠাকুরের মনে হঠাত ভাবাবেশ এলো, বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে তিনি ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে ভৈরবীর আশ্রয়ে এসে হাজির হলেন। বসে খেতে লাগলেন রঘুবীরকে নিবেদিত অন্ন। তারপর হঠাত আবেশ কাটতেই তাঁর মনে হল, এ কী করলাম! রঘুবীরের অন্ন উচ্ছিষ্ট করলাম! কিন্তু ভৈরবী বুঝলেন, তাঁর নৈবেদ্য রঘুবীরই এসে গ্রহণ করলেন। যেমন কৃষ্ণ অবতারে অতিথির প্রার্থনায় গ্রহণ করেছিলেন, চৈতন্য অবতারে তৈর্থিক ব্রাহ্মণের প্রার্থনায় গ্রহণ করেছিলেন, এ-অবতারেও তেমনটাই করলেন। প্রাণের ঠাকুরকে এমন করে কাছে পেয়ে শিলার ঠাকুরকে তিনি গঙ্গায় বিসর্জন দিলেন।

ঠাকুরের এই নিজেকে চিনেও না-চেনা গন্ডি সরিয়ে দিতেই ভৈরবী এসেছিলেন মায়ের আদেশে ঠাকুরের কাছে। তন্ত্রসাধনার পথে নারীর মধ্যে সেই জগদম্বার রূপটি দেখিয়ে দেবার জন্যও দেবী তাঁকে পাঠিয়েছিলেন। ভৈরবীর যত্নে পঞ্চমুন্ডির আসনে বসে বীরভাবের সাধনায় প্রতিটি স্তর পেরিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন নারীর মধ্যে মায়ের রূপ। ‘শ্রী শ্রীরামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ’ গ্রন্থে স্বামী সারদানন্দ ঠাকুরের এই সাধনার কথা বলতে গিয়ে বলছেন, ‘রমনীমাত্রে মাতৃজ্ঞান সর্বতোভাবে অক্ষুন্ন রাখিয়া তন্ত্রোক্ত বীরভাবে সাধনসকল অনুষ্ঠান করিবার কথা আমরা কোনও যুগে কোনও সাধকের সম্বন্ধে শ্রবণ করি নাই।’ শক্তিগ্রহণ বা নারীসঙ্গম ছাড়া শ্রী শ্রীজগদম্বার প্রসন্নতালাভ অসম্ভব এই ধারণার বিপরীতে হেঁটে, ঠাকুর প্রমাণ করেছেন নারীর মধ্যে মাতৃভাবের সাধনাটাই বড় সাধনা।

একবার বাঁকুড়ার ইন্দাস থেকে ঠাকুরের কাছে এসেছিলেন তান্ত্রিক গৌরী পন্ডিত। ইনি পান্ডিত্যের দাম্ভিকতা আর সিদ্ধাইয়ের অহং নিয়ে ঠাকুরের কাছে এসে শান্ত হয়ে দাস্যভাব লাভ করেছিলেন, ঠাঁই পেয়েছিলেন ঠাকুরের শ্রীচরণে। ইনি দুর্গাপূজার সময় নিজের পত্নীকেপুজো করতেন জগন্মাতারূপে। স্বামী সারদানন্দ লিখেছেন, ‘ঠাকুরের শ্রীমুখে শুনিয়াছি, গৌরী প্রতি বৎসর দুর্গাপূজার সময় জগদম্বা পূজার যথাযথ সমস্ত আয়োজন করিতেন এবং বসনালঙ্কারে ভূষিতা করিয়া আলপনাদেওয়া পীঠে বসাইয়া নিজের গৃহিণীকেই শ্রী শ্রীজগদম্বা জ্ঞানে তিন দিন ভক্তিভাবে পূজা করিতেন। তন্ত্রের শিক্ষা—যত স্ত্রী-মূর্তি, সকলেই সাক্ষাৎ জগদম্বার মূর্তি—সকলের মধ্যেই জগন্মাতার জগৎপালিনী ও আনন্দদায়িনী শক্তির বিশেষ প্রকাশ।’

ঠাকুর, মা সারদার মধ্যে সেই জগন্মাতাকে এভাবেই ষোড়শোপচারে পুজো ১৮৭৩ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণাচতুর্দশীতে ফলহারিণী কালীপূজার দিন। মা সারদা সেদিন দেবী জগদম্বার মতো বসন আর অলঙ্কারে ভূষিতা হয়ে অধিষ্ঠান করেছিলেন আলপনা আঁকা পিঁড়িতে। মাকে ‘ত্রিপুরেশ্বরী’ সম্বোধন করে মন্ত্রপাঠ করে ঠাকুর পুজো করলেন। তারপর তাঁর চরণে সমর্পণ করলেন সমস্ত জীবনের সাধনার ফল আর ইষ্টনাম জপের মালা। জীবনসর্বস্ব উৎসর্গ করে মা সারদার মধ্যে জগজ্জননীর আবাহন করলেন। এগিয়ে দিলেন জগৎকল্যাণের পথে। বললেন, আমি অর্ধেক করে গেলুম, তুমি অর্ধেক করো। মানুষ জন্ম নিয়ে গুয়েপোকার মতো জীবনে ঐ যারা কিলবিল করছে, জগতের কল্যানেশ্বরী হয়ে তুমি তাদের দেখো!

 

বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

https://www.youtube.com/channelhindustan

https://www.facebook.com/channelhindustan

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *