দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়:
সাধারণত শিশির পড়ার শব্দ হয় না। জীবনানন্দ দাশ ছাড়া শিশির পড়ার শব্দ খুব বেশি মানুষ শুনেছেন কি? জীবনানন্দ লিখে ছিলেন ‘শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে।’
সে সব সুরিয়ালিজ্মের নিভৃত গহীন জগতের কথা। রাজনীতির শুষ্ক রিয়েলিটিতেও কি শিশির পড়ার শব্দ হয়? নাকি হয় না? রাজনীতির আঙিনাতেও কি সন্ধ্যা আসে শিশিরের শব্দের মতো?
শিশির অধিকারি। পূর্ব মেদিনীপুরের অধিকারি সাম্রাজ্যের বৃদ্ধ সম্রাট। যুবরাজ শুভেন্দু আর রাজকুমার দিব্যেন্দুর পিতা।
একসময় মুহুর্মুহু ধূমপান করতেন, কয়েক বছর হল তাও ছেড়েছেন। ফাইভ ফিফটি ফাইভের প্যাকেট এখন আর থাকে না পাঞ্জাবির পকেটে। বৃষ্টি ছেড়ে গিয়ে বসন্ত এসেছে বঙ্গে। বৃহস্পতিবার সকালে তরুণ বৃদ্ধ সহাস্যে বললেন, এখনও অনেকদিন বাঁচব আমি। চট করে যাচ্ছি না।
এমন একটা রাঙা হাসি সকালে কোনও বেয়াড়া প্রশ্নের জন্য নিশ্চয়ই প্রস্তুত ছিলেন না, তবু প্রশ্নটি উঠেই পড়ল। রাজনীতির সাংবাদিকতায় জল্পনার মূল্য সম্ভবত খবরের চেয়েও বেশি। তার ওপর এমন একটা সময়, যখন হ্যামলিন হয়ে বাঁশি বাজাচ্ছেন মুকুল আর সুরের নেশায় পদ্মবনে মন পড়ে থাকা সাংসদ-বিধয়ক-নেতা-নেত্রীদের পুলিশের ভয় (!) দেখিয়ে আটকে রেখেছেন মমতা। জল্পনার জল ওথলাবেই না বা কেন! এমন একটা স্পর্শকাতর সময়ে শিশির অধিকারি এক সন্ধে কাটিয়ে দিলেন যোগগুরু রামদেবের সঙ্গে। তিনি চান বা না চান, যোগগুরু আর ভারতীয়ত্ব এখন প্রায় সমার্থক। আর ভারতীয়ত্ব আর সঙ্ঘ-বিজেপিও একই মুদ্রার দুই পিঠ। (যাঁরা ভারত ভাবনা নিয়ে এখনই তাত্ত্বিক তর্ক জোড়ার পক্ষপাতী, তাঁদের শান্ত থাকাই শ্রেয়। এই রচনার তেমন কোনও উদ্দেশ্য নেই। কংগ্রেস আর বামেদের জন্যে না হয় রইল ইন্ডিয়া।) ফলতঃ রামদেবের সঙ্গে শিশিরের সন্ধ্যাযাপনে, এক সোফায় পাশাপাশি আসন গ্রহনে প্রশ্ন তো উঠবেই। কে না জানে উত্তরপাড়ার সুপ্রিয় বড়াল তথা মুম্বইয়ের বাবুল সুপ্রিয়কে মোদী সকাশে নিয়ে গেছিলেন রামদেব স্বয়ং। যোগগুরু যোগসূত্র তৈরিতেও কম পটু না!
তাহলে কি রামদেবের সঙ্গে রামচন্দ্রের দলে?
কখনওই না। উচ্চকণ্ঠে বললেন শিশির।
আপনাকে প্রস্তাব দেননি?
আমাকে প্রস্তাব দেওয়ার হিম্মত হবে কারও? গলা এবার পঞ্চম থেকে সপ্তমে।
প্রয়োজনের তুলনায় কি একটু বেশি জোরে বাজলেন শিশির?
যাই হোক, বুঝিয়ে দিলেন উনি বিজেপিতে যাচ্ছেন না। তাঁর পরিচিত জনৈক শ্রী মান্নার বাড়ি রামদেব এসেছিলেন। তিনিও ছিলেন আমন্ত্রিত। নেহাতই কাকতালীয়।

নন্দীগ্রাম পর্বে তৃণমূল রাজনীতিতে শিশির অধিকারির অবদান যাঁরা জানার তাঁরা জানেন। তৎকালীন দোর্দণ্ডপ্রতাপ লক্ষ্মণ শেঠের হাত থেকে ম্যাচ বার করে আনা সহজ ছিল না।
মূলতঃ কংগ্রেসি শিশির সময়ের পরিবর্তনে তৃণমূল কংগ্রেসে এসেছিলেন। শোনা যায় তাঁর কংগ্রেস প্রীতির জন্য ‘ছোটবোন’ মমতার কাছে তাঁকে কয়েকবার মৃদু ধমকও খেতে হয়েছে। একবার দলের আভ্যন্তরীণ বৈঠকে বক্তৃতা দিতে গিয়ে শিশির বলেছিলেন, মমতার হাত শক্ত করতে হবে। সেই শুনে দলনেত্রী ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন, শিশিরদা বেশি হাত হাত করবেন না, এতে কংগ্রেসকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়।
একদা সোমেন ঘনিষ্ঠ কংগ্রেসি শিশির মমতাকে দেখে তৃণমূলে এসেছিলেন, এবার কী মোদীকে দেখে বিজেপিতে!
শিশির বলছেন, এবার দিল্লিতে হারবে বিজেপি। হারবেই হারবে।
রাজনীতির চৌহদ্দিতে যাঁদের অনেকদিন হয়ে গেল তাঁদের সন্দেহ যাচ্ছে না। এত জোর গলায় বিজেপি বিদায়ের ভবিষ্যৎবাণী করছেন শিশির আর সেখানেই চপে চুল দেখছেন তাঁরা। কারণ যে দলে যাওয়ার, যোগদানের আগের দিন পর্যন্ত সেই দলের মুণ্ডপাত রাজনীতিতে নতুন নয়।
তথ্য সহায়তা : নীল বণিক
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news