পার্থসারথি পাণ্ডা:
রাজা রামমোহন রায়ের প্রকৃত পদবি ছিল ‘বন্দোপাধ্যায়’। তাঁর পূর্বপুরুষ কৃষ্ণচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় মুর্শিদাবাদের নবাবের অধীনে চাকরি করতে গিয়ে ‘রায়’ উপাধি পেয়েছিলেন। এই উপাধিই পদবি হয়ে ওঠে।
রামমোহনের বাবা রামকান্ত ছিলেন বৈষ্ণব পারিবারের সন্তান এবং মা তারিণী ছিলেন শাক্ত পরিবারের মেয়ে। যে সময়ের কথা বলছি, সেই আঠেরো শতকেও শাক্ত-বৈষ্ণবের দ্বন্দ্ব প্রবল। সেই দ্বন্দ্বের মাঝেও রামকান্ত ও তারিণীর যে বিয়ে হল, সেটা একটা গল্প।
সেকালে গঙ্গাতীরের হিন্দুদের মধ্যে একটা প্রথা খুব চালু ছিল, মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে বুঝলেই দেহের অর্ধেকটা গঙ্গার জলে ডুবিয়ে মাথাটি পাড়ের দিকে তুলে রেখে ইষ্টদেবতার নাম স্মরণ করতে করতে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করার প্রথা। এতে নাকি মোক্ষলাভ সহজে হতো, এমনটাই ভাবনা ছিল। রামমোহনের পিতামহ ব্রজবিনোদ যখন সেভাবেই মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিলেন, তখন তাঁর কাছে এলেন শ্রীরামপুর চাতরার শাক্ত শ্যাম ভট্টাচার্য। শ্যাম ভঙ্গকুলীন বামুন। কুলের দায়ে জর্জরিত। মেয়েকে কুলীন পাত্রের হাতে দিতে না পারলে যেটুকু কৌলীন্য আছে, সেটুকুও যাবে! ভঙ্গকুলীন বলে প্রকৃত কুলীনরা তাঁর মেয়েকে ঘরে তুলতে চায় না। তাই কুল বাঁচাতে শ্যামকে ফিকির খাটাতে হল। তিনি হাজির হলেন ব্রজবিনোদের কাছে। প্রথমেই প্রার্থনা করলেন কথা রাখার আশ্বাস, তারপর সুযোগ বুঝে আব্দার জানালেন কন্যাদায় থেকে উদ্ধার করার জন্য। এমনিতে ভঙ্গকুলীন, তায় আবার শাক্ত; বৈষ্ণবে আর শাক্তে বনে নাকি! অন্যসময় কিছুতেই এ বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হতেন না। কিন্তু এখন আর তাঁর কিছু করার নেই। প্রকারান্তরে কথা দিয়েই ফেলেছেন। ডাকালেন ছেলেদের। সাত ছেলে। কিন্তু ছয় ছেলেই এ বিয়েতে বাবার মুখের ওপর না বলে দিল। পঞ্চমপুত্র রামকান্ত তিনিই একমাত্র পিতৃসত্য পালনের জন্য রাজি হলেন। সুতরাং, রাধাকান্ত ও তারিণীর বিয়েটা হয়ে গেল। কথা দেওয়ার দায়ে শাক্তের ঘরের মেয়েকে ঘরে তোলা হল বটে, কিন্তু এমনি এমনি না। বিষ্ণুমন্ত্রে দীক্ষা দিয়ে তবেই ঘরে তোলা হয়েছিল। এবং অদ্ভুতভাবে তিনি অল্পদিনেই ঘোর বৈষ্ণব হয়ে উঠলেন। এ বাড়িতে বউ হিসেবে তাঁর ডাক নাম হল, ‘ফুলঠাকুরানী’।
বাড়ির ধর্মীয় পরিবেশে রামমোহন শৈশব থেকেই ধর্মের শিক্ষা পেয়ে পরম ধার্মিক হয়ে উঠেছিলেন। গৃহদেবতা রাধাগোবিন্দের পরম ভক্ত। বিগ্রহ পূজা ও ভাগবত পাঠ না করে জলগ্রহন করতেন না। এমনও হয়েছে এক আসনে বসে সমগ্র রামায়ণ পাঠ করে উঠে তবেই আহারগ্রহণ করেছেন। সেই সময় তিনি কৃষ্ণপ্রেমে এতটাই মাতোয়ারা হয়েছিলেন যে, রাধাকে একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। বাড়িতে একবার ‘মানভঞ্জন’ পালা অভিনয় করানোর কথা উঠলে তিনি সটান না করে দেন। এই ঘোর পৌত্তলিক মানুষটাই কীভাবে পৌত্তলিকতার বিরোধী হয়ে উঠলেন?
আসলে বাবা রামকান্ত ছিলেন মুর্শিদাবাদের নবাবের সেরেস্তার উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন। সে সময় নবাবী কাজের জন্য আরবি ও ফারসি জানা ছিল অত্যন্ত জরুরি। সেইসঙ্গে হিন্দুশাস্ত্র পাঠের জন্য চর্চার জন্য জরুরি ছিল সংস্কৃত শেখা। ফলে এই তিন ভাষা শিক্ষা ও চর্চার ব্যবস্থা করলেন ছেলের জন্য। এর মধ্য দিয়ে রামমোহন একাধারে কোরআন শরীফ এবং বেদান্ত পড়ে ফেললেন। দুই ধর্মগ্রন্থেই পেলেন নিরাকার ঈশ্বর ও ব্রহ্মের উপাসনার নির্দেশ এবং একেশ্বরবাদের ভাবনা। এই পাঠ ও ভাবনা থেকেই তাঁর পৌত্তলিকতা বিরোধীতার উপলব্ধি। মাত্র ষোল বছর বয়সে ‘হিন্দুদিগের পৌত্তলিকতা ধর্ম্মের প্রণালী’ নামের বই লিখে ফেললেন। তাতে প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে লিখলেন। বই পড়ে বাবা খুব আঘাত পেলেন এবং পিতাপুত্রে ধর্মকে কেন্দ্র করে মনান্তর প্রবল হয়ে উঠল।
রামমোহনকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলেন। ষোল বছরের ছেলেটি বাড়ি ছাড়লেন, মতের সঙ্গে আপোষ করলেন না। এই বয়সেই সারা দেশ ভ্রমণ করলেন, নানক, দাদুর মতের সঙ্গে পরিচিত হলেন, তিব্বতে গেলেন, বৌদ্ধধর্মকে ভালোভাবে জানলেন। চার বছর দেশ ভ্রমণে বিচিত্র অভিজ্ঞতায় কাটিয়ে তিনি কুড়ি বছর বয়সে দেশে ফিরলেন। তাঁর ফেরার সংবাদ পেয়ে বাবা লোক পাঠালেন ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে। ততদিনে বাবা বুঝেছিলেন, ধর্মের চেয়ে ছেলে বড়। ছেলেকে আদরের সঙ্গে ঘরে ফেরালেন। এরপরই লেখালেখি ও প্রচারের মধ্য দিয়ে শুরু করলেন ব্রাহ্মমতবাদের প্রসারের কাজ।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news