পার্থসারথি পাণ্ডা:
ওস্তাদ কানাইলাল ঢেরী সিমলে স্ট্রিটে এসরাজ বাজানো শেখাতেন। অবন ঠাকুর জোড়াসাঁকো থেকে আসতেন তাঁর কাছে বাজনা শিখতে। মনে শখ আছে বড় বাজিয়ে হবার, অথচ কিছুতেই আর স্বরেতারে আঙুল সেট হয় না। আঙুলের ওপর দিয়ে ছড় টেনে ফেলেন। আঙুলে কড়া পড়ে গেল, তবু সুর বেরুলো না। সবাই টপকে এগিয়ে গেল, কেবল অবনেরই তখনও অব্দি কিছু হল না। তখন ওস্তাদের রোখ চাপল। কারণ, তিনি মোটেই ছাড়বার পাত্র নন, তার ওপর চ্যালা হচ্ছে বড়লোক বাড়ির ছেলে, প্রণামীদক্ষিণাও জোটে ভালো–ফলে তিনি উঠে পড়ে লাগলেন। এবং তাতেই একদিন অবনের হাত থেকে সুর বেরোলো অ্যা-ও করে। ব্যস, হাতে সুর এলো, কিন্তু মনে এলো না। তার মানে অবন কেউ গান গাইলে সুর ধরে রাগরাগিনী বুঝে পাকা হাতে বাজিয়ে যেতে পারেন, কিন্তু নিজে সুর সৃষ্টি করতে পারেন না। তবে, এসরাজ বাজিয়ে হিসেবে ঠাকুর বাড়িতে তাঁর সুনাম হল বেশ।
রবীন্দ্রনাথ তখন জোড়াসাঁকোয় সাহিত্যিকশিল্পী ও গুণী বন্ধুদের নিয়ে তৈরি করেছেন ‘খামখেয়ালি’ সভা। সভার অধিবেশনে বসে গানবাজনার আসর, তাতে নিয়মিত এসরাজ বাজান অবন ঠাকুর। এইভাবে ঠাকুর বাড়ির সংগীতিক পরিমণ্ডলটির তিনি যখন অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছেন, তখনই একদিন রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ডাকলেন গানের সুর তোলার জন্য। রবীন্দ্রনাথ নতুন গান লিখবেন। তিনি এক এক লাইন লিখতে লাগলেন আর সুর দিয়ে তাই গাইতে লাগলেন। অবন ঠাকুরও সুর ধরে নিয়ে মনের আনন্দে এসরাজে বাজাতে লাগলেন। এমনি করে সুর দেওয়া শেষ হল সমস্ত গানটির। বেশ হল। অবন ঠাকুরের ছুটি হয়ে গেল।

অঘটনটা ঘটল পরের দিন, যখন অবনকে ডাকিয়ে এসরাজে রবীন্দ্রনাথ সেই সুর বাজাতে বললেন। অবন তো আকাশ থেকে পড়লেন, সেই সুর মনে করে বাজাতে হবে নাকি! মনে তো নেই। শুধু সুর কেন, তালমাত্রা রাগরাগিনী কিচ্ছু মনে নেই। রবীন্দ্রনাথ তো তাঁকে মনে রাখতে বলেননি! তিনি তো মনের আনন্দে বাজিয়ে গেছেন শুধু, মনে রাখার কথা মনেও আসেনি! এদিকে মুশকিলের ওপর মুশকিল হল, সেই গানের সুর রবীন্দ্রনাথেরও মনে নেই। সুর ভুলে যাওয়ার বদঅভ্যেস তাঁরও আছে যে! রবীন্দ্রনাথ সুর দেন আর বাজিয়ে সেটা যে মনে রাখেন, সে তো আর অবন জানতেন না! কিন্তু এখন আর কি করা…উপায় নেই। রবীন্দ্রনাথ হেসে বললেন, আবার আমাকে খাটাবে দেখছি!
গানের সেই প্রথম দেওয়া সুরটি হারিয়ে গেল তো গেলেই। সে আর দুজনের কারুরই মনে পড়ল না। রবীন্দ্রনাথ নতুন করে গানটির সুর দিলেন। সে অন্য সুর। অবন ঠাকুর চিরকাল নিজেকে দোষ দিয়েছেন সুরটি হারিয়ে ফেলার জন্য। কিন্তু বয়সকালের ‘ঘরোয়া’ স্মৃতিকথায় গানটির চরণ উদ্ধৃত করে গানটিকে চিনিয়ে দেননি। তাহলে সেটা আমাদের কাছে হত বেশ একটা ইন্টারেস্টিং তথ্য। হয়তো, এটাও বয়স কালের ভুল–গানটির প্রসঙ্গ তাঁর মনে ছিল, কথাগুলো বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news