Breaking News
Home / TRENDING / রবীন্দ্রনাথ ও দেবেন্দ্রনাথ: পিতাপুত্রের বন্ধুতার ইতিহাস

রবীন্দ্রনাথ ও দেবেন্দ্রনাথ: পিতাপুত্রের বন্ধুতার ইতিহাস

 পার্থসারথি পাণ্ডা:

রবীন্দ্রনাথের তখন এগারো বছর বয়স। পৈতে হল। পৈতের সময় কানে ফুটো করে সোনার বীরবৌলি পরানো হল আর মাথাটি করে দেওয়া হল বিলকুল ন্যাড়া–দ্বিজ ব্রহ্মচারীত্ব দানের আচার। এই সময়ই স্কুলের পড়াশুনোর পাট চুকিয়ে ফেলার উদ্যোগও নেওয়া হল। সকলেই বুঝতে পেরেছিলেন স্কুলটা রবির জন্য নয়। তাই পৈতের ঠিক পরে পরেই বাবা একদিন তাঁকে ডেকে পাঠালেন তেতলার ঘরে।

তেতলার ঘরটি ছিল দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘর। পরে তিনি এই ঘরটি কাদম্বরী ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে দিয়েছিলেন। এই ঘরটি ছিল রবীন্দ্রনাথের জীবনে বিশেষ একটি ঘর, বহুল তার স্মৃতি। পৈতের পরে ব্রহ্মচারীদশায় এই ঘরেই তাঁর ঠাঁই হয়েছিল তিন দিন। সেই সময় এই ঘরেই নতুন বৌঠান কাদম্বরীর হাতে খেয়েছিলেন অমৃত স্বাদের হবিষ‍্যান্ন। এই ঘরটিতেই নতুন বৌঠানের প্রেরণায় যুবক রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা স্ফুরণের আখড়া, এই ঘরটিই কালজয়ী ‘ভারতী’ পত্রিকার আতুড় ঘর, এই ঘরেই মৃত্যু হয়েছিল মা সারদা দেবীর, এই ঘরেই আত্মহত্যা করেছিলেন নতুন বৌঠান। সেই ঘরে বাবার সামনে হাজির হলেন কিশোর রবীন্দ্রনাথ। বাবা বসেছিলেন শান্ত সৌম্য ঋষির মতো আরাম কেদারায়। রবিকে বললেন, তিনি হিমালয়ে যাবেন। রবি কি তাঁর সঙ্গে যেতে চান? এই প্রথম বাবা তাঁর মত জানতে চাইলেন। তাঁর ওপর চাপিয়ে দিলেন না যে, তাঁর ইচ্ছেয় রবিকে সঙ্গে যেতেই হবে। যেন এই প্রথম রবিকে বাবা সিদ্ধান্ত নিতে দিলেন। রবি সিদ্ধান্ত নিলেন সঙ্গে সঙ্গে। অন্য কথা ভাববার ইচ্ছে তাঁর ছিল না। তিনি তো প্রকৃতিকে কাছ থেকেই জানতে চান। সেক্ষেত্রে হিমালয় ভ্রমণের চেয়ে আকর্ষণীয় আর কিই বা হতে পারে! তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন।

ঠাকুরবাড়িতে দ্বারকানাথ ঠাকুরের চালু করা সাহেবি কেতার অনেক ফালতু রীতি ঠাকুরবাড়ির শিশুদের শৈশবকে বঞ্চিত করেছে। সেই রীতি অনুসারেই মায়ের আশৈশব স্নেহ ও সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। চাকরবাকরদের কাছে মানুষ হয়েছেন, ইচ্ছে করলেও মায়ের কাছে বা অন্তঃপুরে যখন তখন যেতে পারেননি, বিতাড়িত হয়েছেন। এমনকি শৈশবে মায়ের স্তন্যপান করার সুযোগও পান নি। স্তন্যপান করেছেন ভাড়া করা কোন স্তনদায়িনীর। এত বঞ্চনার মাঝে এই প্রথম বাবার কাছ থেকে তিনি যেন এতদিনে এমন আলাদা করে বাবার চোখে পড়ার সুযোগ পেলেন। দেবেন্দ্রনাথও যেন এই ছোট ছেলেটির প্রতি এতদিনে অন্য রকম একটা টান অনুভব করলেন, বঞ্চনার প্রায়শ্চিত্ত করতে চাইলেন, তাকে গুরুত্ব দিলেন।

বাবার সঙ্গে তিনি যখন হিমালয়ের পথে যাত্রা করলেন, তখন তাঁর মাথা ন্যাড়া। তাই মাথা ঢাকার জন্য বাবা কিনে দিলেন জরির কাজ করা মখমলের গোল টুপি। রবীন্দ্রনাথের এই সময়ের ছবিতে তাই আমরা তাঁর মাথায় এই টুপিটি দেখতে পাই। টুপিটি অবশ্য একেবারেই রবীন্দ্রনাথের পছন্দ ছিল না। তাঁরা কলকাতা থেকে প্রথমে বোলপুরে গিয়েছিলেন। এখান থেকেই তিনি রবীন্দ্রনাথকে নিজের মতো শিক্ষা দিতে শুরু করলেন, সময় দিতে শুরু করলেন এবং নিজে পড়াতে শুরু করলেন। হয়তো এখান থেকেই মনে মনে তিনি ঠিক করে ফেলেছিলেন শান্তিনিকেতন ও জমিদারির ভার তিনি রবির হাতেই ন্যস্ত করবেন। খোয়াইয়ের ধারে তিনি পাথরের স্তূপ বানিয়ে পাহাড় গড়ছেন, বাবাকে টেনে নিয়ে গিয়ে দেখাচ্ছেন। ছেলের এই বাল্যক্রীড়াকে ব্যক্তিত্বময় বাবা উপহাস না করে প্রশ্রয় দিচ্ছেন, ছেলের আবদারে সেখানে বসে উপাসনাও করছেন। ছেলেকে দিয়ে গাইয়ে নিচ্ছেন ব্রহ্মসঙ্গীত। এভাবেই এই প্রথম রবীন্দ্রনাথ যেন দেবেন্দ্রনাথের মধ্যে এক শাশ্বত বাঙালি পিতাকে দেখতে পেলেন।

বাবার আভিজাত্য ও ব্যক্তিত্বকে তিনি সাক্ষাৎ উপলব্ধি করলেন হিমালয়ের পথে ট্রেন যাত্রার সময়। দেবেন্দ্রনাথ রবির জন্য কিনেছিলেন হাফ টিকিট। বারো বছরের কম বয়সীদের জন্য হাফ টিকিটই লাগত। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন এগারো। কিন্তু সেই বয়সেই রবীন্দ্রনাথ মাথায় বেড়েছিলেন অনেকখানি। দেখলে, একটু বেশি বয়স বলে মনে হত। তো, একটি স্টেশনে ট্রেন থামতেই টিটি এসে ধরল। দেবেন্দ্রনাথ তাঁর বয়স এগারো বললেও টিটির বিশ্বাস হল না। শুরু হল চাপান উতোর। দেবেন্দ্রনাথ নিজের সততায় অটল, টিটি নিজের অবিশ্বাসে। তখন তো আর এখনকার মতো লোকে বয়সের প্রমাণপত্র নিয়ে ঘুরত না, সে সুযোগও ছিল না। টিটির বিতণ্ডা দেবেন্দ্রনাথের মানে লাগল, তিনি বটুয়া খুলে পুরো ভাড়া মিটিয়ে দিলেন। তিনি এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে, টিটির ফেরৎ দেওয়া বাড়তি টাকা কটাও আর বটুয়াতে তুলে রাখলেন না, ছুঁড়ে ফেলে দিলেন প্ল্যাটফর্মে। আর ঠিক তখনই চলতে শুরু করল গাড়ি। এই ঘটনাটা বালক রবির মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। সত্যের জন্য বিক্ষুব্ধ বাবার ব্যক্তিটি তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

হিমালয়ে বাবা তাঁকে দিয়েছিলেন অবাধ বিচরণের স্বাধীনতা। প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর যোগটিকে পাকা হতে দিলেন। এই সময় বাবার সঙ্গে তাঁর পদ্যপাঠ এবং শব্দের অর্থ নিয়ে তর্কও হত। বাবা সেই তর্ককে প্রশ্রয় দিতেন। পুত্রের কল্পনাকে, ভাবনাকে আরো পরিসর দিতে চাইতেন। এই সময় তাঁদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল বেশ একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক। যে সম্পর্ক রবীন্দ্রনাথকে রবীন্দ্রনাথ হওয়ার পথে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছিল।

হিমালয় থেকে ফেরার পর অন্তঃপুরে রবির প্রবেশ অবাধ হয়ে গেল। যেন তিনি এক ধাক্কায় অনেক বড় হয়ে গেলেন। মায়ের স্নেহের দ্বার অবারিত হল তাঁর কাছে। মায়ের সান্ধ্যসভায় সাহিত্য পাঠের আসরে তিনিই তিনিই হয়ে উঠলেন প্রধান বক্তা। হিমালয় ভ্রমণের রোমাঞ্চকর কথক। এই সময় তাঁর কাছে ঘর আর বাহির এক হতে পারল, আর সেটা হতে পারল তাঁর এই সময়ের এক প্রিয় বন্ধু বাবার জন্যই। তার পরের কথা তো ইতিহাস, সে আর এক অধ্যায়।

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *