দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়।
নিজেদের উন্মুক্ত পৃষ্ঠদেশ যাঁরা পাবলিক টয়লেটের দেওয়ালে পরিণত করেছেন এবং সেই দেওয়াল অশ্লীল গ্রাফিতিতে ভরিয়েছে কেউ বা কারা, সেই রমণীদের একজন কলকাতারই একটি কলেজে সাংবাদিকতার পাঠরতা।
পাঠ কি হচ্ছে তা এখনই বলা না গেলেও তাঁর পিঠ কি বলছে তা ইতিমধ্যেই অনেকে দেখেছে। সূত্রের খবর, ছাত্রীটির নাম অনিন্দিতা সুর। অনিন্দিতার সাম্প্রতিক পৃষ্ঠপ্রদর্শন শুধুমাত্র অশ্লীল শব্দের জন্য নয়, খবরের শিরোনামে এসেছে আরও বেশি করে এই কারনে যে এই অশালীনতা রবীন্দ্রনাথকে, তাঁর সৃষ্টিকে কলুষিত করার চেষ্টা করেছে। এই চেষ্টা সচেতন নাকি নেহাতই অশিক্ষিত, অসভ্য বাচালতা তা এখনও সম্পূর্ণ জানা যায় নি।

সম্প্রতি কু-কথার মুক্তাঞ্চল, যে কোনও সময় যে কোনও মানুষকে অপমান করা, গালি দেওয়ার অবাধ চারণভূমি হয়ে ওঠা ফেসবুকে রবীন্দ্রসঙ্গীত কে বিকৃত ভাবে পরিবেশন করা একজন প্যারোডি গাইয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। শুরুতে সুরের বিকৃতি পরে অশ্নীল শব্দ যোগ করে রবীন্দ্রসঙ্গীত কে নষ্ট করার একটি অসম্ভব প্রয়াস তিনি করেছেন ও করছেন। তাঁর রচনা ও পরিবেশনায় অনেকে অশ্নীলতার মধ্যেও যে এক প্রকার আনন্দ থাকে তা খুঁজে পেয়েছেন ও তাঁকে গ্রহন করেছেন। কোনও কোনও নেটিজেন বুদ্ধিজীবী তাঁর রচনার মধ্যে প্রতি-কবিতা বা না-কবিতার গুণ খুঁজে পেয়েছেন। তবে এইসব গুণাবলী নিয়ে তিনি যদি নিজের প্রতি-সাহিত্যে মনোযোগী হতেন তাহলে সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ, যাঁর রচনা, বিশেষত গান (যেটি এখানে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু) এমন ভাবে কালিমালিপ্ত হত না। কবি জয় গোস্বামী তাঁর একটি দু-লাইনের কবিতায় অনেকদিন আগে লিখেছিলেন,
‘হে আমার দেশ নদীমাতৃক
পাগল কুকুরে ছিঁড়েখুঁড়ে তোকে শেষ করে দিক।’
এই পংক্তিগুলির মধ্যে একটি সময় ধরা রয়েছে। হতাশা, অসহায়তা, দিশাহীনতা, বিষাদ, ক্রোধ, আক্রোশ, গরল ইত্যাদি শব্দ হয়ত এমন একটি সময়কে ব্যখ্যা করতে পারে। যাবতীয় সৌন্দর্য কে ধর্ষণ করা বা অনাবিলকে আবিল করা বা পবিত্রকে নোংরা করার মত এক ধরনের বিদ্রোহ, ভগবান বুকে পদচিহ্ন এঁকে দেবার মত বিদ্রোহ, রবীন্দ্রনাথের গান নষ্ট করার প্রয়াসের মধ্যে থাকতে পারে। পারিপার্শ্বিকে কিছুই পছন্দ নয়, কেউ ভাল নেই, তবু কেন চাঁদ উঠবে গগনে? তাই একটি মাত্র শব্দ যোগে এই সুন্দরকে নষ্ট করা।
রোদ্দুর রায় নামধারী এই ব্যক্তিটিকে কেউ ধর্ষক বলুন বা বিদ্রোহী তিনি গীতবিতানকে তাঁর যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়ে আজকের এই পরিস্থিতিটি তৈরি করেছেন। তবে দোষ যদি দিতেই হয় তবে তাঁকে একা দেওয়াও সমীচীন নয়। ক্ষেত্র আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। ইতিমধ্যে তাঁর ফেসবুক পেজে ৩৬ হাজারের ওপর ফলোয়ার আছে। তাঁর সাঙ্গীতিক অবদান যে স্কুল কলেজের ছাত্রদের ছুঁয়েছে তা এখন আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
এই মৌষল পর্বে জেনে বা না জেনে, বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে বা না বুঝে রবীন্দ্রভারতী থেকে মালদার স্কুল, ছেলে মেয়েরা যেভাবে অশ্লীলতার সাধনায় নেমেছেন তা ঠিক কিসের দিকনির্দেশ এখনই বোঝা না গেলেও উল্কার মত উঠে আসা এই রোদ্দুর রায় কিয়দংশে সফল বৈকি। পরিণত মনে সেভাবে প্রভাব ফেলতে না পারলেও অশিক্ষিত কাঁচা মনে তিনি জায়গা করেছেন। শুধুমাত্র তাই নয় অনেক সিরিয়াস আলোচনাতেও তিনি থাকছেন। থাকতেই পারেন। প্রাপ্তবয়স্কদের নিমিত্ত কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে কি তথাকথিত অশ্লীল শব্দ থাকে না? থাকে তো। গানেও থাকবে। সেভাবে দেখলে প্রাচীন বাংলা গানেও ছিল। কথা হচ্ছে তিনি তাঁর মৌলিক সাহিত্য নিয়ে যা খুশি করবেন। গ্রহন বা বর্জন শ্রোতা বা পাঠকের নিজস্ব পছন্দ। কিন্তু রবীন্দ্রগান বহু মানুষের আশ্রয়, বহু মানুষের পুজার মন্ত্র, বহু মানুষের প্রেমের অনুভব। সেই রবীন্দ্রসঙ্গীতে তাঁর আইকনক্ল্যাসটিক হাতটি না লাগিয়েও তিনি আসরে নামার চেষ্টা করতে পারতেন। হয়ত বাজার। এভাবে না এলে বাজার পেতেন না। বাজার বলতেই বিকিকিনি এমনটা নয়। পরিচিতিরও তো বাজার হয়।
শুক্রবার, পুলিশ যাঁদের শনাক্ত করেছে তাঁদের মধ্যে কয়েকজন,ঐতিহ্যবাহী শ্রীরামপুর কলেজের ছাত্রছাত্রী। এই ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে নিয়ে ওই ছাত্রছাত্রীরা ক্ষমাও চেয়ে নিয়েছেন।
যে নোংরা তাঁরা ছড়িয়েছেন তার ক্ষমা হয় কি?
তবু, রবীন্দ্রনাথই শিখিয়ে গেছেন, সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী হল ‘ক্ষমা করো।’
প্রার্থনা যদি সৎ হয় তবে ক্ষমা ছাড়া আর উপায়ই বা কি আছে!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news