সুমন ভট্টাচার্য
দোতলা এল-নাইন-এ উঠে চলে যাওয়ার আগে আপনি হাত নেড়ে বলেছিলেন, ‘চিন্তা করিস না মিহির, আমি ঠিক পৌঁছে যাব।’ সেটা আশি সাল, কংগ্রেস (স)-এর হয়ে দাঁড়িয়ে আপনি দক্ষিণ কলকাতা এবং পুরুলিয়া লোকসভা কেন্দ্র থেকে খারাপ ভাবে হেরে গিয়েছেন। এক সময় যিনি সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন, গোটা ভারতবর্ষের কংগ্রেস রাজনীতিতে চন্দ্রশেখরের উত্তরসূরী হিসেবে যা্ঁকে ভাবা শুরু হয়ে গিয়েছিল, সেই তরুণ তুর্কি আপনি তখন গাঁধী পরিবারের ‘রোষানলে’ পড়ে একেবারেই কক্ষচ্যুত। আলাদা দল গড়েও খুব একটা হালে পানি পাচ্ছেন না। তাই ঘনিষ্ট সহযোগীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে সিঁথি থেকে রাসবিহারির কাছে রাণি ভবানী রোড পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য এল-নাইনই ভরসা ছিল। কিন্তু কত অনায়াসে দোতলা বাসের পিছনের পাদানিতে পা রেখে সিঁড়ি দিয়ে উঠে চলে গিয়েছিলেন আপনি। কোনও দ্বিধা, কোনও সংকোচ ছিল না।
ঠিক ২৫ বছর বাদে, আপনি যখন আবার গাঁধী পরিবারের বধুর বিশ্বস্ততম সৈনিক এবং কেন্দ্রের একাধিক দফতরের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, তখনও একই রকম অনায়াস এবং স্বচ্ছন্দ। শাস্ত্রী ভবনে আপনার ঘরের সামনে যখন সেবির কর্তা থেকে প্রসার ভারতীর চেয়ারম্যান পর্যন্ত অপেক্ষায়, তখনও আপনি আমি কী করে ঘড়ি, আপনার দেওয়া ঘড়ি হারিয়ে ফেললাম, সেই চিন্তায় ব্যস্ত থেকেছেন। বিশ্বাসই করতে চাননি, পুলিশের সঙ্গে তর্কাতর্কিতে আমার হাতের ঘড়ি হারিয়ে যেতে পারে।

তর্ক তো আমার আপনার সঙ্গেও হত, যখন দেখতাম এককালের ‘সমাজতন্ত্রে’ বিশ্বাসী কীভাবে আপনি মনমোহনীয় অর্থনীতির সোচ্চার সমর্থক হয়ে উঠেছেন। তখন তো সংসদে আপনিই ইউপিএ-র প্রধান মুখ, এবং অবশ্যই সেরা বক্তাও। আর গাঁধী পরিবারও তো নিশ্চিত জানত—দলের নীতি অথবা অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আপনি কোনওদিন হিন্দি বা ইংরেজিতে ‘ভুল’ কিছু বলে ফেলবেন না। একদিন সংসদে আপনার বক্তৃতা শোনার পর রাতে লোদি এস্টেটের বাংলোয় যখন দেখা হচ্ছে, তখন আমার প্রশ্নের জবাবে আপনি বলেছিলেন, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবটাকেও বুঝতে হয় রে… আমি কী কারণে রাজনীতি করতে এসেছি? মানুষের উপকার করার জন্য যদি হয়, তাহলে কোনও নির্দিষ্ট দর্শনে আটকে থাকলে চলবে না। মনমোহন সিংহ যেটা করছেন, উদার অর্থনীতির যে পথে হাঁটছেন, লোকসভায় দাঁড়িয়ে আমি যেটা বলে এলাম, সেটাই আজকের বাস্তব। রাষ্ট্রকে সব সময় এগিয়ে যেতে হয় রে।’
উদার অর্থনীতির বিরুদ্ধে এবং রাষ্ট্রায়াত্ব সংস্থাগুলিকে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিবাদে বামপন্থী ছাত্র-যুবদের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ যুব কংগ্রেসও একসঙ্গে আন্দোলন করবে, আপনার মৃত্যু দিনের দ্বিতীয় বর্ষ পূর্তিতে এই খবরটা পড়ে বুঝলাম কেন ভারতীয় রাজনীতিতে, আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে এই বঙ্গের রাজনীতিতে আপনাকে দরকার ছিল। এবং এটাও বুঝলাম যে যুব কংগ্রেসকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আপনি শুধু প্রাসঙ্গিকই নন, সেই সত্তরের দশকে সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিলেন, আজ এই ২০১৯-এ সেই যুব কংগ্রেস শুধু যে আপনার স্মৃতি তর্পণ করে না তাই নয়, হয়তো তা করার আদর্শ এবং তাত্ত্বিক দিক থেকে যোগ্যও নয়।

প্রত্যেক মানুষের জীবনে কিছু গভীর, গোপন এবং ব্যক্তিগত যন্ত্রণা থাকে। আমার মতো তুচ্ছ ‘কলমচি’র জীবনেও আছে। ঋতুপর্ণ ঘোষ হোক কিংবা আপনি, অর্থাৎ প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি, যাঁদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি এবং যাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতার ঋণ রয়েছে, তাঁরা যখন মারা গিয়েছেন, তখন আমি অনেক দূরে; বিদেশে। তাই স্মৃতি তর্পণ জানানোর জন্য বিদেশ থেকে লেখা পাঠানো ছাড়া কিছু করে উঠতে পারিনি। কিন্তু বুঝেছি ‘তর্পণ’ অনেকভাবে হয়। কখনও কখনও সেই রাজনৈতিক বিশ্বাস, সংস্কৃতি বা আদর্শকে বয়ে নিয়ে যাওয়াটাও একটা তর্পণ হতে পারে। আপনার মতো আদ্যন্ত বাঙালি, আবার একইসঙ্গে প্রবলভাবে ভারতীয়, একই সঙ্গে সরস্বতী পুজোয় খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজায় আপ্যায়নে অভ্যস্ত, আপনিই দরগায় চাদর চড়াতেও দ্বিধা করতেন না। সেই আদর্শ এবং সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী হওয়াটাও তো অনেকের কাছে গর্বের বিষয় হতে পারে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news