সুমন ভট্টাচার্য।
কৃত্তিকা,
তুমি সব সময অনুযোগ করো আমার সঙ্গে বাইরে বেরোলেই নাকি প্রাকৃতিক বিপর্যয় শুরু হযে যায। কখনও উডিষ্যায ফাইলিন তো কাশ্মীরে অবিরাম তুষারপাত। উডিষ্যায ফাইলিনের সেই রাতটা, বারকুলের ধারে পান্থনিবাসে সারা রাত তুমি মাযের বুকে ঢুকে শুযে ছিলে। আর বাইরে দিযে সেই দুশো কিলোমিটারের বেগে ঝড বইছিল। সেই রাতটার স্মৃতি আজ ও তোমার কাছে বিভীষিকা।
ওরা আজ কার কাছে আশ্রয় নেবে কৃত্তিকা? কার কাছে??
যাঁরা হেঁটে নিজের ঘরে ফেরার চেষ্টা করছে, যাঁদের শিশুদের স্যুটকেস এর উপর ই ঘুমিযে পডতে হচ্ছে। তাঁদের আজ, কাল ঝড়ের সময কি হবে? অন্ধ্র, তেলেঙ্গানা কিংবা উডিষ্যা থেকেও যাঁরা বাডি ফেরার জন্য হাঁটছে কিংবা ট্রাকে চেপে আসছে, তাঁদের রক্ষার উপায় কি? কি হবে যখন আকাশ ভাঙা বৃষ্টি নামবে, ঝডে রাস্তার ধারে একের পর এক গাছ উপড়ে পডবে?

তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে,উডিষ্যায ফাইলিনের সময পান্থনিবাসের ম্যানেজার আমাদের ভাগ্যের হাতে ছেডে দিযে চলে গিযেছিলেন। আমাদের ঘরের বাইরে থেকে তালা দিতে দিতে ওনারা বলেছিলেন, যদি ঝড থেমে যাওয়ার পর আমরা বেঁচে থাকি, তাহলে নিশ্চয়ই ওনার সঙ্গে দেখা হবে। উনি আমাদের খাওযাবেন ও।
একদিকে করোনা আর অন্যদিকে আমফানের ভযাল ভ্রুকুটি র মধ্যে আমরাও কি একদল মানুষকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতে ছেডে দিইনি? এবং পান্থনিবাসে র ম্যানেজারের মতোই একটা প্রতিশ্রুতি দিযে। যদি বেঁচে বর্তে থাকতে পারো, তাহলে সোনালী সকালে খাবার মিলবে। করোনা এবং আমফান যদি এদেরকে রক্ষা দেয, তবেই নিরাপদে ভোজন।
কৃত্তিকা, আমরা নিজের ইচ্ছেয ফাইলিনের মধ্যে উডিষ্যার উপকূলে পৌছেছিলাম। বেড়াতে গিযেছিলাম।
এই যাঁরা, যে মানুষগুলো আজ রাতে হাইওয়ে তে থাকবে,তাঁরা নিজের ইচ্ছেয এটা করবে না। তাঁরা বাধ্য এটা করতে।
ফাইলিনের মধ্যে, ওই প্রবল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে উডিষ্যার উপকূল শহরে থাকার জেদের জন্য সেদিন আমাদের জেলা প্রশাসন কে চিঠি দিতে হযেছিল।
এই অসহায় মানুষগুলো কে নিযেও চিঠি চালাচালি হবে। নিশ্চয়ই হবে। কিন্তু সেই চিঠির আদানপ্রদানের আগে আজ আর কাল রাতে কি হবে? ওদের বেঁচে থাকার জন্য, রক্ষা পাওয়ার জন্য কি ব্যবস্থা হবে?
আজ রাত থেকে ওদের জন্য, এই ঘরে ফিরতে চাওয়া মানুষদের জন্য সবটাই যে রেড জোন।
আকাশ ভেঙে যখন বৃষ্টি নামবে, ওরা স্মার্ট ফোনে ছবি তুলবে না, বৃষ্টি নিযে গান ওদের মাথায আসবে না। ওরা শুধু বাঁচার উপায় টা খুজবে। ঝডে যেন রাস্তার গাছ ওদের মাথাতেই ভেঙে না পডে, সেই প্রার্থনা টুকু করবে।
ফাইলিনের পরের সকাল টা তো তোমার মনে আছে কৃত্তিকা
কচুকাটা হযে যাওয়া গাছ, দুমড়ে যাওয়া বাডি দেখে আমরা বুঝেছিলাম কিসের থেকে রক্ষা পেযেছি। ট্রেন চলছিল না, হাইওয়ে জনমানবশূন্য, শুধু এধারে ওধারে গাছ পডে ছিল। তুমি অনেকবার আমায বলেছো, কি ভাবে আমরা ভুবনেশ্বরে ফিরেছিলাম, সেটা এখনও তুমি চোখ বুজলে দেখতে পাও।
ওরাও যেন ফিরতে পারে কৃত্তিকা। আমাদের সবার অবহেলা, উদাসীনতা এবং অনেকের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা কে অতিক্রম করে ওরাও যেন ঘরে ফিরতে পারে। এই প্রার্থনাটুকুই তো শুধু আজ রাতে করতে পারি।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news