জয়ন্ত চৌধুরী
ফাটা ডিমে আর তা দিয়ে কী ফল পাবে/ মনস্তাপেও লাগবে ওতে জোড়া/
অখিল ক্ষুধায় শেষে কি নিজেকে খাবে/ কে বলে শূন্যে চলবে না আগাগোড়া/
তার চেয়ে আজ আমার যুক্তি মানো/
…………
বলে চলেছেন অনর্গল। সুধীন দত্তের কবিতা উটপাখি। হাতে কবিতার বই। পাতা ওল্টাচ্ছেন বটে, তবে দৃষ্টি শ্রোতাদের দিকে। ঘরে ডিভানে এলিয়ে বসে প্রণব মুখোপাধ্যায়। সামনের দুটি সোফায় আমি, অলক বন্দোপাধ্যায় (হিন্দুস্থান টাইমস),অপর সোফায় আমার ক্যামেরা পার্সন শুভময় রক্ষিত, হিন্দুস্থান টাইমসের দেবাশীষ ভাদূড়ি।
এই চার শ্রোতা। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচন। জঙ্গিপুর কেন্দ্রে লোকসভা আসনে কংগ্রেস প্রার্থী প্রণব বাবু। সুদীর্ঘ তাঁর রাজনৈতিক জীবনে এই দ্বিতীয়বার প্রত্যক্ষ জনমত যাচাইয়ের পরীক্ষায় অবতীর্ন তিনি। উণসত্তর সাল থেকে রাজনীতিতে প্রবেশ। সেই থেকে বীরভূমের ভূমিপুত্র রাজ্যসভার খিড়কি দিয়ে সংসদে স্বমহিমায়। ‘ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া’ আমল থেকে কংগ্রেস ঘরানায় তাঁর দাপট।ইন্দিরার মৃত্যুর পর সাময়িক ছেদ পড়লেও সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর খ্যাতি দেশজোড়া।নানা কৌশলে বার চারেক রাজ্যসভার সদস্য হলেও আম আদমির ভোট ভাগ্যের শিকে ছিঁড়তে ২০০৪ পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হয়েছিল তাঁকে। কেন্দ্রের অর্থ, বিদেশ, প্রতিরক্ষা সামলানো দুঁদে রাজনীতিক বঙ্গসন্তান হলেও তাঁর ওই উত্থানে বঙ্গের সম্পর্ক কতটুকু -বা আদৌ কী?
মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর তাঁকে ঘিরে সেই সংশয় দূর করেছে, ২০০৪ সালে। এবার দ্বিতীয়বার।

দাদাঠাকুরের জঙ্গিপুরে কীর্ণাহারের ভূমিপুত্র ফের নির্বাচকমণ্ডলীর মুখোমুখি। বিদায়ী প্রথম ইউপিএ সরকারের বিদেশমন্ত্রী। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি প্রণব মুখোপাধ্যায় ভোট চাইতে জঙ্গিপুর ঢুঁড়ে বেড়াচ্ছেন।
খুব স্বাভাবিক, রাজ্যের তো বটেই, গোটা দেশের প্রথম সারির ইংরেজি, হিন্দির সঙ্গে দুটি দক্ষিণী টেলিভিশন চ্যানেলও হাজির। জঙ্গিপুরে রঘুনাথগঞ্জের কোর্টপাড়ায় যে দোতলা বাড়িটি ভোটের জন্য ভাড়া নিয়েছিলেন প্রণব বাবু, তার সদরের সামনে দিনমান দাঁড়িয়ে স্ট্যান্ডসহ ডজন খানেক ক্যামেরা। রাস্তার দুধারে সারি দেওয়া ডিএসএনজি ভ্যান। তারই মধ্যে বুলেটিন প্রোডিউসারের আবদারে সেই বাড়ির দিকে তাক করা ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কেউ চ্যাট, পিস টু ক্যামেরা, কেউ ওয়াক থ্রু দিয়ে চলেছি। গোটা দেশের অন্যতম নজর কাড়া কেন্দ্র জঙ্গিপুর।
প্রচার পর্বে কেউ সরাসরি কেউ নানা ছলে সিঙ্গল মাইক বাইট নিতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ। একটিবারের জন্য ধরা দিলেন না। বাড়ির সামনে নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া ঘেরাটোপ। সামনের চত্বরে চেনা মুখ বলতে প্রদ্যোৎ গুহ, সমীর চক্রবর্তী (বুয়া)। একতলার নির্বাচনী অফিস সামলাতেন মহম্মদ সোহরাব। অবসরপ্রাপ্ত স্কুল মাস্টার সোহরাব সাহেব সদা ব্যস্ত, মুখ গুঁজে থাকতেন খাতা পত্তরে। মালদার রতুয়ার বিধায়ক সমর মুখোপাধ্যায়, মুখে পান পুরে ভাবলেশহীন নির্বাক চরিত্র। সুতরাং দেশের ৫৪৫টি লোকসভা আসনের মধ্যে অন্যতম নজর কাড়া হাইপ্রোফাইল প্রার্থীকে নিয়ে আপনার যতই কৌতুহল থাকুক না কেন, ‘কোনও লাভ নেই’ গোছের নির্লিপ্তি ছেয়ে ছিল বাড়িময়!
এ হেন অচলায়তন ভেঙে তাঁর বসার ঘর। ভোটের আগের দিন। প্রচার শেষ। চব্বিশ ঘন্টার অপেক্ষা। রোজকার মতো ওইদিন সকালে ঢুঁ মারলাম কোর্ট পাড়ার ওই বাড়িতে। সঙ্গী অলক, আমার সহকর্মী, ভিডিও জার্নালিস্ট শুভময় রক্ষিত এবং অলকের চিত্রসংবাদিক ভাদুড়ী। সোহরাব সাহেবের সামনে কিছুক্ষণ ঘ্যানঘ্যান করার পর বেজার মুখেই বেরিয়ে আসছিলাম। হঠাৎ সিঁড়ির উপর থেকে প্রদ্যোৎ দার ডাক। যেন কোনও দৈববণী!
ইশারায় ‘ওপরে এস’। ‘তবে ক্যামেরা নয়। কোনও ছবি বা ইন্টারভিউ নয়’। সিঁড়ি আগলে তাঁর শর্ত আরোপ।
কেউ ক্যামেরা খুলবে না।সমস্বরে কথা দিলাম। কাজ হলো। চারজনই ঘরে, বসলাম সোফায়। মনে মনে ছকলাম এই ২৪ ঘন্টার অবসর নিয়ে যা বলবেন তাতে একটা সফট স্টোরি দাঁড়িয়ে যাবে। বাইট না হলেও গ্রাফিক্স দিয়ে ম্যানেজ হবে।
তোমাদের চা টা কিছু দেয়নি?
ঘরে ঢুকেই প্রণববাবুর জিজ্ঞাসা। কথা শেষ হতে না হতেই লুচি, আলুর তরকারি, সঙ্গে চা নিয়ে এলেন একজন।
আপনি ?
এই তো পুজো সেরে খেলাম।
জানলাম, সকালে ছাদে পায়চারি করে, স্নান পুজো, প্রাতরাশ সেরে ফেলেছেন।
এখন অখন্ড অবসর। কাল তো ভোট…এসব কথা পাড়তে না পাড়তে তিনি প্রগলভ!
অবসরে ঘুম বাদ দিলে বই তাঁর একান্ত সঙ্গী। সে কথা সর্বজনবিদিত। তাই বিশেষ ভণিতার দরকার হল না।
– কী বই পড়ছেন?
– এখন কবিতা পড়ছি।
কার কবিতা, প্রশ্ন করার আগেই, হাঁক দিলেন, ওই ঘরে খাটের উপর খোলা বইটা নিয়ে আয় তো…
আমরা ভাবছি নির্ঘাৎ রবীন্দ্র রচনাবলীর কোনও খণ্ড কিংবা নিদেনপক্ষে সঞ্চয়িতা।
……….
আমার কথা কি শুনতে পাওনা তুমি?
কেন মুখ গুঁজে আছ মিছে ছলে।
কোথায় লুকাবে ধুধু মরুভূমি।
……….
হাতে বই পৌঁছানোর আগেই শুরু।

এত চেনা কবিতা। সুধীন্দ্র নাথ দত্তের ‘উট পাখি’ ।
পাশের ঘর থেকে সুধীন্দ্রনাথ দত্তর কাব্য সংগ্রহ আসার আগেই শুরু হয়ে গিয়েছে আবৃত্তি। উটপাখি, পৃষ্ঠা খুলে রাখলেন। কিন্তু পাতায় নয় আমাদের দিকে তাকিয়ে গড়গড় বলে গেলেন আস্ত কবিতাটা।
আমরা নির্বাক শ্রোতা।
রবীন্দ্রনাথের ঘরানার বাইরে সুধীন দত্তই আমার অন্যতম প্রিয় কবি,
নিজেই জানালেন।উটপাখি-র উপর দুর্বলতা প্রকাশেও অকপট তিনি। ‘সুধীন দত্তের উটপাখি আমার ভীষণ প্রিয় কবিতা। ‘
যে মানুষটি রাজনীতি ,অর্থনীতি বা ইতিহাসের সন-তারিখ স্রেফ স্মৃতি হাতড়ে অনায়াসে বলে যেতে পারেন। অভ্যস্ত নিয়মিত চন্ডীপাঠেও (বই না দেখেই)। তিনি উটপাখি তেও সাবলীল! শুধু সুধীন্দ্রনাথ দত্ত নয়, জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে-তেও তাঁর আসক্তি, নিজেই কবুল করলেন। শেষে ধবলেন রবি ঠাকুরের সোনার তরী।
আবৃত্তি বলতে তাঁর আপত্তি। ‘আরে আবৃত্তি একটা আর্ট। আমি ওটা জানি না। যেসব কবিতা বেশ ভালো লাগে, তা বার বার পড়ি। মুখস্থ হয়ে গিয়েছে তাই বললাম।’
কবিতা শোনা আর আনুষঙ্গিক নানা বিষয়ে মজলিশি মেজাজে প্রথম ইউপিএ সরকারের সেকেন্ড ম্যান ইন কমান্ড। হাতে গরম সিঙ্গুরের জমি বিতর্ক, শিল্প থেকে নেতা হয়ে ওঠার কী কী গুণাবলী আবশ্যিক, এমন নানা বিষয় উঠে এল খোলামেলা কথায়।
‘রাজনীতি করতে এসে এমন কোনও কিছু করা উচিত নয় যে ক্ষমতায় গেলে তা তার গলার কাঁটা না হয়ে যায়।’
কথাটা বলেই ফের নিজেই অলকের দিকে তাকিয়ে ‘এসব লিখ না কিন্তু’ আগেই বলেছি আমি লেখার জন্য কিছু বলবো না আজ।’
আমার তো ক্যামেরা, না খুললে খবরই হয় না, বলে অভয় দিলাম তাঁকে।
যদিও ওই দিন খবর হতে পারে এমন অনেক কথাই উঠে এসেছিল। কিন্তু ওই যে শর্ত, লেখা যাবে না।
প্রণব বাবু উটপাখি আবৃত্তি করছেন-এটা যে কী মহার্ঘ স্মৃতি হতে চলেছে ততক্ষনে টের পেয়ে গিয়েছি। কৃতজ্ঞতা মেশানো আবেগে তখন ভাসছি।
বাড়ির বাইরে এসে শুভময় বোমাটা ফাটালো! বলল,ব্যাক লাইট স্ট্রং তাই ফ্রেম খুব বাজে কিন্তু অডিও ওকে। পুরো কবিতাটা রেকর্ড করেছি। আমি ও অলোক দুজনে হেডফোন লাগিয়ে শুনলাম। পুরোটাই স্পষ্ট।ক্যামেরা ওর কোলে তবে আগাগোড়া তা অন রেখেছিল শুভময়।
লোভ বেসামাল। সরাসরি হায়দ্রাবাদে নিউজ ডেস্কে বিভাগীয় প্রধান সিদ্ধার্থ দা (সরকার) কে জানালাম পুরোটা। সিদ্ধার্থ দা এমনই মানুষ উত্তেজিত হলেও বোঝা দায়।
‘কলকাতা কলকাতা’ বুলেটিন প্রোডিউসার কে বলছি, তোমায় ফোন করতে। কী করা যায় দেখছি। তুমি ইমিডিয়েটলি ডিএসএনজি দিয়ে পুরো রেকর্ডিং পাঠাও।
সেদিন সন্ধ্যার বুলেটিন ‘আমার বাংলা’ শেষ হওয়ার পর ফের গেলাম কোর্টপাড়ার বাড়ির সামনে। ঘন্টাখানেকের ব্যবধানে ই টিভি বাংলায় দুটো বুলেটিন প্রণব বাবু ঘরে বসেই শুনেছেন।
স্বকণ্ঠে উটপাখি।
প্রতিশ্রুতি ভেঙেছিলাম । তাই দুরুদুরু চিত্তে, রাতেই ফের গেলাম বাড়ির একতলায় নির্বাচনী দফতরে। কৃতকর্মের প্রতিক্রিয়া জরিপ করার তাগিদে। প্রদ্যোৎ দা আমায় দেখেই এক গাল হাসি। জানলাম দুবারই ‘প্রণব দা’ বুলেটিন দেখেছেন।
শুনে বেশ হালকা লাগল। উল্লেখ্য, ওইদিন ইটিভি বাংলার তিনটি বুলেটিনেই
প্রণব বাবুর আবৃত্তি সিংহভাগ দখল করে নিয়েছিল।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news