Breaking News
Home / TRENDING / বিপ্লবের স্বপ্নমুখর শিল্পী উৎপল দত্ত

বিপ্লবের স্বপ্নমুখর শিল্পী উৎপল দত্ত

পার্থসারথি পাণ্ডা

সেক্সপিয়ারের নাটক, এবং তা ইংরেজিতেই মঞ্চস্থ করে শহর কলকাতার বুকে উৎপল দত্তের নাট্যজীবন শুরু। সেক্সপিয়ার দিয়ে শুরু করেও বাংলার নাট্যকলার প্রতি ছিল তাঁর অপরিসীম শ্রদ্ধা, বিশেষ করে গিরিশচন্দ্রের নাট্যপ্রতিভার প্রতি এবং তাঁর অভিনয়শৈলীর প্রতি ছিল তাঁর অমোঘ বিস্ময়। তিনি বুঝেছিলেন বাংলায় অভিনয়ের স্বতন্ত্র একটি ধারা যদি কেউ প্রথম প্রতিষ্ঠা করে থাকেন তো তিনি গিরিশচন্দ্র। ‘গিরিশ মানস’ বইটিতে তিনি সেই কথাই বলেছেন। সেইসঙ্গে এও লক্ষ্য করেছেন যে, ইংল্যান্ডে সেক্সপিরীয় অভিনয়রীতির যেভাবে চর্চা করা হয়, বাংলায় গিরিশকে নিয়ে সেসব কিছুই করা হয় না। তাঁর এসব মনে হওয়া ও আক্ষেপের একটাই কারণ, তিনি তো নিছক একজন অভিনয় শিল্পী নন, তিনি ইতিহাস সচেতন পরিপূর্ণ একজন শিল্পী, নাট্যকার, কবি এবং চলচ্চিত্র পরিচালক। তার চেয়েও বড় কথা, চল্লিশের উত্তাল সময়ে যারা শিল্প দিয়ে সমাজ বদলের কথা ভেবেছিলেন, স্বপ্ন দেখেছিলেন; তিনি তাঁদেরই একজন। ইতিহাস ছেঁকে বর্তমানকে বুঝে নেওয়ার এই ঝোঁক থেকেই তাঁর বামপন্থার দিকে এগিয়ে যাওয়া। মার্কস, লেলিন আর সংগ্রামী মানুষের ইতিহাস ঘেঁটে তিনি বুঝেছিলেন যে, নিজের অধিকারটা কখনও একক এবং কখনও ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আদায় করে নিতে হয়। সেই ভাবনা থেকেই তাঁর নাট্যরচনার সূত্রপাত। নিজস্ব নাট্যদল ‘লিটল থিয়েটার গ্রুপ’—যা পরে ‘পিপলস থিয়েটার গ্রুপ’ হয়ে ওঠে তার সূত্রপাত। ‘নীলকণ্ঠ’, ‘ফেরারি ফৌজ’, ‘অঙ্গার’, ‘কল্লোলের’র মতো আলোড়ন সৃষ্টিকারী নাট্যমালার আবির্ভাব।
চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটক একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, একদিন যদি জনগণের কাছে পৌঁছানোর জন্য সিনেমার চেয়ে বেটার মাধ্যম তিনি পেয়ে যান, তাহলে সিনেমাকে লাথি মেরে সেই মাধ্যমটিকেই আঁকড়ে ধরবেন। উৎপল দত্ত’ও বস্তুত তাই করেছেন। যখন বামপন্থী সতীর্থরা সত্তরের দশকে তাঁকে সন্দেহ করতে লাগল, দূরত্ব তৈরি করতে লাগল তাঁর থেকে এবং তাঁকে বয়কট করল; সেই সময় তিনি জনগণের কাছে সরাসরি পৌঁছে যাওয়ার জন্য যাত্রাপালাকে হাতিয়ার করলেন। লিখলেন ‘রাইফেল’, ‘সন্ন্যাসীর তরবারি’র মতো নাটক। গ্রামবাংলার মানুষের কাছে সরাসরি পৌঁছে দিলেন অতিবাম আন্দোলনের বার্তা। তাঁর আগেও বাংলার নাট্যরচনার ধারায় ঐতিহাসিক নাটক তো ছিলই, কিন্তু তাতে ছিল ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে হয় রোমান্স, নয় পরাধীন দেশকে স্বাধীন করার জাতীয়তাবাদ ও বোধকে সাধারণের মনে চারিয়ে দেওয়ার প্রয়াস। কিন্তু উৎপলের নাটকের ইতিহাস আশ্রয় করল সেই ধারাবিন্দুটিকে যাতে রয়েছে, গণ-উন্মেষণার বীজ। এ-বীজে আছে ঘুরে দাঁড়ানোর সত্তা, বিল্পবমন্ত্রের মহীরূহ।
সেই চারের দশকে মধু বসুর ‘মাইকেল মধুসূদন’ ছায়াছবিতে মধুসূদনের চরিত্রে অভিনয় করে পাদপ্রদীপের আলোয় তিনি এসেছিলেন বটে, কিন্তু নায়ক নয়, চরিত্রাভিনেতা হিসেবেই তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন। পরবর্তীকালে সত্যজিৎ রায়ের ‘জন অরণ্য’, ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’, ‘আগন্তুক’—বেশ কয়েকটি ছবিতে তিনি ভিন্ন ভিন্ন ধরণের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। পাঁচের দশকে সাড়া ফেলেছিল মৃণাল সেনের ‘ভুবন সোম’ ছবিতে তাঁর অনবদ্য অভিনয়। টাইপ ভিলেন থেকে কমিক রিলিফ সমস্ত ধরণের চরিত্র চিত্রণের ক্ষেত্রেই ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ, জীবনের অভিজ্ঞতা আর অনুভবের পরিধি বিপুল না হলে এটা কিছুতেই সম্ভব হতো না। তবু তাঁর প্রথম ও শেষ ভালোবাসা ছিল কিন্তু ঐ মঞ্চই। আর মঞ্চঘিরে থাকা দর্শক। নাটক করতে এসে তিনি বুঝেছিলেন যে, দর্শককে এন্টারটেইন করতে হবে, এন্টারটেইনমেন্টের ভেতর দিয়েই তাঁকে জাগিয়ে তুলতে হবে, শুকনো বিপ্লবের কথায় মানুষের উন্মাদনা আসে না। তাই মঞ্চ নির্মাণ থেকে আলো সবকিছুতেই তাঁর প্রযোজনায় অভিনবত্ব থাকত, চমক থাকত। অভিনয় করতে করতে মঞ্চ থেকে নেমে দর্শকের মধ্যে চলে যাওয়া, স্টেজটাকে আয়ত আকারে বেঁধে না রেখে তাঁকে দর্শকদের দিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং এভাবে দর্শক ও নাটকের কলাকুশলীকে একাত্ম করে তোলার প্রয়াস তাঁর এই পর্বের প্রযোজনা-ভাবনার মধ্যে দেখা যায়। নাটককে দৃশ্যমালায় ভাগ না করে তিনি লিখতেন উপন্যাসের পরিচ্ছেদ-বিভাগের ধারায় এক-দুই ক্রমাঙ্কে। এমনি করে নাটকের আঙ্গিকে, পরিবেশনায় এবং রচনার ক্ষেত্রে উৎপল দত্ত পালাবদল ঘটিয়েছিলেন ভাঙা বাংলার বুকে। তাঁর সেই ঐতিহ্য ধরেই কিন্তু আজ বাংলার নাট্যচর্চায় ব্যাক-প্রজেকশন, সিনেমার মতো ট্রানজিশন, পথনাটকের ফর্ম, লোকশিল্পের ফর্ম অন্যতম আঙ্গিক হয়ে উঠেছে, আর হয়ে উঠেছে ইতিহাস ছুঁয়ে সময়ের দর্পণ। এই যে নাটকের মধ্যে প্রযুক্তি ও লোকশিল্পের আঙ্গিকগত ছোঁয়াছুঁয়িতে একইসঙ্গে ইতিহাস আর বর্তমানের প্রেক্ষাপটে দিনবদলের স্বপ্ন দেখানোর শিক্ষা, নিজের বক্তব্যকে শিল্পিত সোচ্চারে বলার শিক্ষা—এ সমস্ত কিছুর জন্যই উত্তরকাল উৎপল দত্তের কাছে ঋণী।
Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *