চ্যানেল হিন্দুস্তান ব্যুরো।
ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসের এক ঝাঁ চকচকে পাঁচতারা হোটেলে ফরওয়ার্ড ব্লক (Forward Bloc) বিধায়কের সঙ্গে বৈঠক করে তৃণমূলে যোগদান সহ মন্ত্রিত্বের লোভনীয় প্রস্তাব দিলেন তৃণমূলের পরামর্শদাতা প্রশান্ত কিশোর। মাত্র মিনিট দশেক বৈঠকের পরেই পিকে স্যারের সেই প্রস্তাব সযত্নে ফিরিয়ে দিলেন আলি ইমরান রামজ ওরফে ভিক্টর। প্রশান্ত কিশোরের (Prashant Kishor) প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন এই যুবা বিধায়ক। ঘটনা প্রকাশ, জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে চাকুলিয়া থেকে নির্বাচিত তিনবারের এই বাম বিধায়ককে বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন করা শুরু করেন আইপ্যাকে প্রতিনিধিরা। প্রস্তাব একটাই, ‘যে কোনও মূল্যে যোগ দিতে হবে তৃণমূল কংগ্রেসে (TMC)।’ প্রত্যেকবার না করে দেওয়া সত্ত্বেও আইপ্যাকের সদস্যদের নাছোড়বান্দা মনোভাব দেখে বিরক্ত ইমরান জানিয়ে দেন, “যে কোনও ধরনের প্রস্তাব নিয়ে কথা বলতে হলে প্রশান্ত কিশোর স্বয়ং যেন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।”
এরপর আসরে নামে প্রশান্ত কিশোর। ১৭ জুলাই রাতে ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাসের এক পাঁচতারা হোটেলে স্ত্রীকে নিয়ে যান ফরওয়ার্ড ব্লক ইমরান। সেখানে পৌঁছানো মাত্রই বেজে ওঠে মোবাইলের রিংটোন। ফোন রিসিভ করতেই ফোনের ওপার থেকে নিজেকে প্রশান্ত কিশোর বলে দাবি করেন এক ব্যক্তি। খানিকটা অবাক হন ইমরান ! জানতে চান কেন ফোন করেছেন আপনি ? পিকে জবাব দেন, “আপনার সঙ্গে একটিবারের জন্য দেখা করতে চাই।” জবাবে ফরওয়ার্ড ব্লক বিধায়ক বলেন, “আমি এখন স্ত্রীকে নিয়ে ডিনারে এসেছি এখন কথা বলতে পারব না। আর আপনি তৃণমূলের পরামর্শদাতা। আমি বিরোধীদলের বিধায়ক। কি হবে কথা বলে ?” তাঁর এমন নেতিবাচক উত্তরে এবার অনুরোধে সুরে সাক্ষাতের কাতর আবেদন করেন তৃণমূলের পরামর্শদাতা। এমন নাছোড়বান্দা আবেদন শুনে শেষে বাম বিধায়ক বলেন, “খুব অল্প সময়ের জন্য দেখা করতে পারি। বেশিক্ষণ দিতে পারব না।” ফব বিধায়কের এমন জবাব শুনে প্রশান্ত কিশোর জানান, “মাত্র ১০ মিনিট হলেই হবে। আপনি এখন কোথায় আছেন ?” কলকাতার এক পাঁচতারা হোটেলে থাকার কথা পিকেকে জানান তিনি। শুনেই ফোন কেটে দেন প্রশান্ত কিশোর। খানিকক্ষণ পরেই বিধায়কের মোবাইলে অচেনা নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপ কল আসে। কলটি গ্রহণ করলে পিকের কণ্ঠস্বর। মোবাইলের ওপার থেকে জানান, “হোটেলের ঠিক কোন জায়গায় রয়েছেন আপনি ? আমি এসে গিয়েছি।” বিধায়ক প্রশান্ত কিশোরকে হোটেলে নিজের অবস্থানের কথা জানিয়ে দেন ভিক্টর।
খানিকক্ষণের মধ্যেই বিধায়কের সামনে এসে দাঁড়ান সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পড়া বিহারী ভোট কৌশলী প্রশান্ত কিশোর। করোনাকালে হাত না মিলিয়েই আলোচনা শুরু হয়ে যায় প্রশান্ত-ইমরানের মধ্যে। একেবারে কর্পোরেট কায়দায় তৃণমূলে যোগদান করলে কি কি সুযোগ সুবিধা তিনি পাবেন তা চাকুলিয়ার বিধায়কের সামনে তুলে ধরতে থাকেন প্রশান্ত কিশোর। জানান, “যে কোনও তিনটি দপ্তরের নাম আমাকে বলুন। তৃণমূলের টিকিটে জিতলে আগামী মন্ত্রিসভায় সেই তিনটি দপ্তরের মধ্যে যে কোনও একটি দপ্তরের মন্ত্রী করা হবে আপনাকে।” এছাড়াও আরও বেশ কিছু লোভনীয় প্রস্তাব দেওয়া হয় চাকুলিয়া তিনবারের বিধায়ককে। ৫-৭ মিনিট চুপচাপ প্রশান্ত কিশোরের প্রেজেন্টেশন শোনেন। তারপর জবাব দেওয়া শুরু করেন তিনি।
শুরুতেই প্রশান্ত কিশোরকে চাকুলিয়া ছেলে ভিক্টর বলেছেন, “তৃণমূলের গত ৯ বছরে শাসনকালে ১০ বারের বেশি সময় তাঁকে দলবদলে প্রস্তাব দিয়েছিলেন তৃণমূলের মন্ত্রী, পর্যবেক্ষক ও জেলা সভাপতিরা। ২০১৪ ও ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটে টিকিট দেওয়ার প্রস্তাব হিসেবে পাঠিয়েছিল তাঁরা ।” তিনি আরও বলেন, “যতবার প্রস্তাব এসেছে ততবার ফিরিয়ে দিয়েছি। টাকা রোজগার বা অনৈতিক পথে আয় করার জন্য রাজনীতি করি না।” এরপর নিজের বংশ পরিচয় ও ফরওয়ার্ড ব্লক করার কারণ জানান প্রশান্ত কিশোরকে। চাকুলিয়ার এই বাম বিধায়ক বলেন, “আমার বাবা ছিলেন রমজান আলী। দিনাজপুর জেলার বামপন্থী নেতা। কিছু পাওয়ার জন্য রাজনীতি করতেন না। আমার কথা বিশ্বাস না হলে দিনাজপুরে নিজে গিয়ে খোঁজ করে আসতে পারেন। আমার কাকার নাম হাফিজ আলম সৈরানি। তিনিও ফরওয়ার্ড ব্লকের দীর্ঘ দিনের নেতা। আমাদের পরিবার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে দেখে ফরওয়ার্ড ব্লক করতে শুরু করেছিল। আজও আমি আমার নেতা সুভাষচন্দ্র বসুকে মনে করি। তাই অন্য কাউকে সেই জায়গায় বসাতে পারব না।” কথাগুলো বাধ্য ছাত্রের মতো শুনছিলেন তৃণমূলের পরামর্শদাতা পিকে স্যার। মিনিট দশেকের বৈঠক শেষে খালি হাতেই ফিরতে হলো তাঁকে। যদিও, আইপ্যাকের পক্ষে দাবি করা হয়েছে আলী ইমরান রামজই স্বয়ং প্রশান্ত কিশোরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
ইতিমধ্যে ধূপগুড়ির প্রাক্তন সিপিএম বিধায়ক লক্ষীকান্ত রায় ও বামফ্রন্ট সরকারে মন্ত্রী থাকা দেবেশ দাসকেও এই এক প্রস্তাব দিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল আইপ্যাক। প্রশান্ত কিশোরের সঙ্গে তাঁর বৈঠক প্রসঙ্গে ফরওয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সম্পাদক নরেন চট্টোপাধ্যায়কেও বিস্তারিত জানিয়েছেন তিনি। বৈঠক প্রসঙ্গে চাকুলিয়ার এই যুব নেতা বলেন, “রাজ্যের তৃণমূল নেতাদের সাধারণ মানুষ এলাকায় এলাকায় এক ঘরে করে দিয়েছে। প্রশান্ত কিশোর হয়তো বুঝতে পেরেছেন। তাই হয়তো কখনও সিপিএম, কখনও বিজেপি, কখনও কংগ্রেস, কিংবা কখনও ফরওয়ার্ড ব্লকের ঘরে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির লোকজন খুঁজতে বেরোচ্ছেন তিনি। মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সততার ভাবমূর্তিও যে আর কাজে আসবে না তাও প্রশান্ত কিশোর বুঝেছেন বলেই আমার মনে হয়েছে সেদিনের বৈঠকে।”
ঘটনাচক্রে, গত ৯ বছরেই নয়, আলী ইমরান রামজ যখন যোগেশচন্দ্র চৌধুরী কলেজে ফরওয়ার্ড ব্লকের ছাত্র সংগঠন করতেন, তখনও স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে তৃণমূলে আসার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তৃণমূলের এক অধ্যাপক নেতা তাঁকে ওই সময় কালীঘাটে তৃণমূল নেত্রীর বাসভবনে নিয়ে গিয়েছিলেন যোগদান প্রসঙ্গে কথাবার্তা বলতে। সেখানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভিক্টরকে প্রস্তাব দেন তৃণমূল ছাত্র পরিষদের এসে রাজনীতি করার। সালটা ২০০৮। সেবারও স্পষ্ট ভাষায় কালীঘাটের অফিসে দাঁড়িয়ে তৃণমূল নেত্রীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন আলি ইমরান রামজ (Ali Imran Ramz)। সেই সময় থেকেই রাজ্যে বইতে শুরু করেছিল পরিবর্তনের হাওয়া। ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে উপনির্বাচনে প্রথমবার প্রার্থী হয়েই গোয়ালপোখর কেন্দ্র থেকে বিধায়ক হন ফরওয়ার্ড ব্লকের যুবনেতা। পরে ২০১১ ও ২০১৬ সালের তৃণমূলের প্রবল ঝড়ে ও নিজের চাকুলিয়া দুর্গ অক্ষত রেখেছিলেন তিনি। বৈঠকের একসময় প্রশান্ত কিশোরকে বলেছেন, “বিধায়ক থাকি আর না থাকি। ফরওয়ার্ড ব্লকে ছিলাম, আছি থাকব।”
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news