Breaking News
Home / TRENDING / ফুটো বেয়ে প্রশ্ন ফাঁস! পরিবর্তিত পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্য!

ফুটো বেয়ে প্রশ্ন ফাঁস! পরিবর্তিত পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্য!

 পার্থসারথি পাণ্ডা

ফুটো বেয়ে হ্যাট্রিক। ফুটোটা সাধারণ তো নয়ই, যাকে বলে একেবারে ‘ঐতিহাসিক’। যার সঙ্গে সাড়া জাগানো চাক্ষুষ পরিচয়, ২০১৫ সালে। তখন ফুটোটা দেখা গিয়েছিল একটা প্রশ্নপত্রবাহী বাসের পেছনে। টেট পরীক্ষার দিন দুয়েক আগে (২৭ আগস্ট) সেই ফুটো ব্ল্যাকহোলের মতো বিস্ফারিত হয়ে প্রশ্নপত্রের একটা পুরো বস্তাই গিলে ফেলল। সিআইডি থেকে শিক্ষামন্ত্রী বেজায় হাওয়ায় হম্বিতম্বি করলেন। বাসের ঝাঁকুনি, প্রশ্নপত্র রাস্তায় পড়ে যাওয়া, একটি ট্রাকের ড্রাইভার ও খালাসির সেই বস্তা তুলে মূল্যবান কিছু না পেয়ে খালে ফেলে দেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি নানান ভুঁইফোড় গল্প সামনে আসতে লাগল। পিছিয়ে দেওয়া হল টেট পরীক্ষা অক্টোবর অব্দি। তখন ফুটো ঢেঁকুর তুলল হোয়াটসঅ্যাপে। প্রশ্নফাঁসের প্রমাণও মিলল হাতেনাতে। পরীক্ষার দিন সকাল ৮টা দশেই নাকি তৎকালীন শিক্ষাসচিব অর্ণব রায়ের হোয়াটসঅ্যাপেও সেই উদ্গার উৎকীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু, তিনি স্পিকটি নট! পরীক্ষা হয়ে গেল দুপুর ২ টো-য়। সরকারী ব্যাপারই আলাদা গো দাদা! তারই জেরে কেস-খেয়ে টেট সেই যে হুমড়ি খেয়ে কোর্টে এসে পড়ল, এই সেদিন অব্দিও নাক ঘষছিল! এখন শুধু লোকসভার জিগিরে মাথা তুলে উঠেছে মাত্র। ভোটের দায় বড় দায়! হাজার হম্বিতম্বির মধ্য দিয়ে বলির বকরা করে যাদের ধরা হল, তারা ছাড়া পেল বেকসুর। মাঝখান দিয়ে চারটে বছর গলে গেল, কাজের কাজ হল ঘেঁচু!

২০১৭, মাধ্যমিকের ভৌতবিজ্ঞান পরীক্ষা শুরুর এক ঘন্টার মধ্যেই হোয়াটসঅ্যাপে হোয়াটসঅ্যাপে ঘুরতে দেখা গিয়েছিল প্রশ্নপত্র। সবাই দেখতে পেলেও, যথারীতি পর্ষদ দেখতে পায়নি। সরকারী চোখের পাওয়ার কম তো তাই! অন্যদিকে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে জনস্বার্থ মামলা ওঠে কলকাতা হাইকোর্টে। জানা যায়, মালদা জেলার রতুয়া ব্লকের একটি স্কুল থেকেই নাকি ফাঁস হয়েছিল প্রশ্ন। হাইকোর্টের ধমক খেয়ে পর্ষদ ঢোঁক গিলেছিল। কিন্তু, তারপর?

২০১৮, উত্তরবঙ্গের ময়নাগুড়ি সুভাষনগর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হরিদয়াল রায়ের বিরুদ্ধে উঠেছিল মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ। তিনি হাতেনাতে ধরা পড়েন। তিনি আবার ২০১৪’র ‘শিক্ষারত্ন’। রত্নই বটে! শাসক ঘনিষ্ঠ বলে তাঁর বেশ দাপট ছিল। তবুও তাঁকে এবং তাঁর চার সহশিক্ষক সাগরেদকে সাসপেন্ড করা হয়। ব্যাপারটাকে তারিফ না-করে পারা যায় না!

২০১৮-তে সিবিএসই বোর্ডও কম যায়নি। দ্বাদশে অর্থনীতি এবং দশমে গণিতের প্রশ্ন চুটিয়ে ফাঁস হয়েছে। এবং তার পরেও তাঁরা বুক ফুলিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন নতুন করে পরীক্ষা হবে না!

২০১৮’র সেপ্টেম্বর মাসে মধ্যমগ্রামের এক বেসরকারি ছাপাখানার প্রাক্তন কর্মী অশোক দেব চৌধুরী দাবি করেন যে, তিনি যে ছাপাখানায় কাজ করতেন সেখানে পশ্চিমবঙ্গের জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ছাপা হয় এবং সেখান থেকে মোটা টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। প্রথমে পুলিশের কাছে তিনি অভিযোগ জানাতে গেলেও তারা কোন পদক্ষেপ নেয়নি, তখন বাধ্য হয়ে আদালতের শরণ নিয়েছেন তিনি। তারপর এই এক বছরে হাজার খবরের স্রোতে অশোক দেবের খবর মিডিয়ার আগ্রহের তলানিতে গিয়ে হারিয়ে গেছে। কেসটা যে কি হল, তা আর জানা গেল না! মিডিয়া চলে বাতপতাকায়!

২০১৮, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা শুরুর এক ঘন্টার মধ্যেই হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলা প্রশ্নপত্র। ঘটনাটা ঘটেছিল মালদহে। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ থেকে জানানো হয়েছিল যে, প্রশ্ন ফাঁসের খবর তাঁদের কাছে নেই। আর তাছাড়া, পরীক্ষা শুরুর এক-দেড় ঘন্টা পরে প্রশ্নপত্র বাইরে বেরোলে তার আর নাকি তেমন গুরুত্ব থাকে না! শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমি কিছু জানি না। যাঁদের দেখার কথা, তাঁরা ব্যবস্থা নেবেন।’ এটাই বোধহয় তাঁর আদি ও অকৃত্রিম বক্তব্য!

২০১৮-তে ডিএলএড এবং নানান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএড পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের কেচ্ছাও অনেক। এদিক থেকে বছরটাকে প্রশ্ন ফাঁসের সুবর্ণ বছরও বলা যায়! সে-সবের বিস্তার এখন থাক, নতুন দিনের হাতছানিতে এবার বরং ১৯-এ যাই—

২০১৯-এ শুরুটা চমৎকার। বাংলা, ইংরেজি ও ইতিহাস-তিনটে পরীক্ষা শুরুরই আধঘন্টার মধ্যে মাধ্যমিকের প্রশ্নপত্র হোয়াটসঅ্যাপে চরে বেড়িয়েছে। এই ধারাবাহিক বিস্ফোরণেও প্রশাসন কারো টিকিটিও ছুঁতে পারেনি। অবশ্য যে রাজ্যে চাকরির নিরাশাই একমাত্র ভরসা, প্রতিশ্রুতিই একমাত্র শিল্প-লগ্নি, দু’হাজার আড়াই হাজার টাকা মাস-মাইনের ‘ইন্টার্নশিপ’ নামের সরকারী অনুগ্রহলাভের প্রস্তাবনার সঙ্গে সঙ্গে যে রাজ্যে ফড়ের খোঁজ শুরু হয়ে যায়, সে রাজ্যে ছুঁয়েই আর হবে কি! বরং, প্রশ্ন ফাঁসের তোয়াক্কা না-করে বহাল তবীয়তে পরীক্ষা চলুক। আমরা মিড ডে মিল খেয়ে থালা বাজিয়ে বরং গদগদ হয়ে স্লো-গান ধরিঃ ‘শিক্ষা ভিক্ষা নয়, সহজাত অধিকার’!!!

শিক্ষা খাতে সরকারের বড্ড টানাটানি। টিচার রাখো রে, পরীক্ষা নাও রে, মাইনে দাও রে, ডিএ দাও রে, এটা দাও রে, সেটা দাও রে—‘ঘেউ ঘেউ’ বায়নাক্কার অন্ত নেই। তার চেয়ে এসব স্কুলফুল তুলে সব ক্লাব করে দাও না গো দাদা। অনুদানে আপ্লুত হই, মেলা বসাই, পুজোয় মাতি! ভোটের সময় এক ছুট্টে হাজির হবে আমাদের শান্তিরক্ষা বাহিনী। কথা দিচ্ছি!

ফুটোটা বাড়তে বাড়তে এখন সর্বগ্রাসী এক ব্ল্যাকহোল। আসুন, সমবেত বঙ্গবাসী অগ্রদানী সেজে শিক্ষার পিণ্ডি খুঁটতে খুঁটতে তার মধ্যে তলিয়ে যাই। সহিষ্ণু বলে আমাদের সুনাম বাড়ুক! আমেন!

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *