পার্থসারথি পাণ্ডা :
পক্ষকাল পরেই শিবরাত্রি—এক্কেবারে নির্জলা দিশিব্রত; কিন্তু সে তো কেষ্টপক্ষে, তার আগে আজ এই শ্বেতপক্ষে সাহেবসুবোদের ভ্যালেন্টাইন ব্রতে বঙ্গবাসীর ইয়াং-অঙ্গে কষে রোমাঞ্চ। রোমাঞ্চিত হয়েছে মহানগরের লাল গোলাপও, তাড়সে কুড়ি থেকে সত্তর অব্দি উঠছে তার পারদ। চিলল্ড্রেন্স পার্কে শিশুদের নো এন্ট্রি! রেস্তোরাঁও সব ব্যস্ত অনেক।
বাংলার ব্রতমালা বড্ড একপেশে। মেয়েদের নিয়েই তার মাতামাতি! সেখানে ‘ভ্যালেন্টাইন’স ডে’ নামের ব্রতটি খাঁটি বিদেশি জিনিস—বিশ্বায়ন আর বাণিজ্যায়ণের বোটে চড়ে বঙ্গে এসে মেয়েমদ্দকে ‘এক ছাতার তলায়’ এনে হাজির করেছে! ইম্পোর্টেড জিনিসের জেল্লাই আলাদা! প্রথম প্রথম পেটপাতলা বাঙালির এই হ্যামবার্গার হজম হয়নি, এখন অবশ্য ধীরে ধীরে ধাতে সইতে শুরু করেছে। তাই, লাল গোলাপের দাম বাড়ছে!
বাণিজ্যগুরু বললেন, তুমি যদি সনাতনী—তোমার জন্য রইল শিবরাত্রি; তুমি যদি ‘হঠকে’ হও, তোমার ভাগে ভ্যালেন্টাইন। আর চিত্ত যদি চমৎকারী চকোর হয়, তবে তুমি দুয়েই থাকো নিশ্চিন্তে। আমি থাকব জিএসটিতে!
সেন্ট ভ্যালেন্টাইন আর ভগবান ভোলানাথ দুজনেই মহানপ্রেমিক। একজন ইতিহাসে, অন্যজন পুরাণে। যুগে যুগে তাঁরা অজস্র প্রেমিক-প্রেমিকার প্রেমেরতরীতে পরোক্ষে হাওয়া জুগিয়েছেন!
ভ্যালেন্টাইনের গল্পটা প্রায় দু’হাজার বছরের পুরনো। সেই সময় রোমের এক পাগলা রাজা ধাঁই করে প্রেম-বিয়ে-যৌনতায় ‘না’ আইন জারি করে বসলেন। কিন্তু যৌবনের হাওয়ায় ছেলেমেয়েরা যায় কোথায়? তখন তাদের একমাত্র সহায় হয়ে দাঁড়ালেন চার্চের পাদ্রী ভ্যালেন্টাইন। তিনি আকখুটে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চার্চে লুকিয়ে ছেলেমেয়েদের মেলামেশার সুযোগ করে দিলেন। আকছার তাদের বিয়ে দিতে লাগলেন। কথাটা পাগলার কানে গেল। ভ্যালেন্টাইনের জেল হল, ফাঁসির হুকুম হল। জেলে থাকতে থাকতেই জেলরক্ষীর মেয়ের সঙ্গে তাঁরও প্রেম হয়ে গেল। পাদ্রীর প্রেম শাস্ত্রে মানা। বলা যায়, প্রেমের পথে শাসক আর শাস্ত্র দুইয়ের বিরুদ্ধেই ভ্যালেন্টাইন বিদ্রোহ করে ‘সেন্ট’ হয়েছিলেন।
আর ভোলানাথ? একমাত্র শ্রীকেষ্ট ছাড়া তাঁর মতো প্রেমিক জগতে দুটি নেই। প্রথম পত্নী সতীকে তিনি এতটাই ভালোবাসতেন যে, সতীর মৃত্যুর পর তাঁর দেহ কাঁধে তুলে শোকে পাগল হয়ে ব্রহ্মাণ্ড নষ্ট করে দেবার জন্য তাণ্ডব নাচ শুরু করেছিলেন। বিষ্ণু এসে সে-যাত্রায় সুদর্শন দিয়ে সতীর দেহ খণ্ডবিখণ্ড করে শিবের দেহ থেকে সতীকে আলাদা না-করলে সমস্ত সৃষ্টিই নষ্ট হয়ে যেত! এমনই পাগল এক প্রেমিক-পুরুষকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার জন্য উমা অনেক তপস্যা করেছিলেন। তারপর শিবরাত্রির দিন ব্রত শেষে শিবকে স্বামীরূপে পেয়েও ছিলেন। সেই প্রার্থনার পথ ধরে কুমারী মেয়েরা এখনও শিবের মতো প্রেমিক ও স্বামী পাওয়ার জন্য শিবরাত্রি ব্রত করেন।
পাদটীকাঃ আসলে—সবই ‘তাঁর/তাঁদের’ ইচ্ছে, ‘ডে/ব্রত’ তো নিমিত্তমাত্র!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news