পার্থসারথি পাণ্ডা :
কেউ বলেন চারশো বছর কেউ বা বলেন দেড়শ বছর আগে অবিভক্ত বাংলার ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, সিলেট প্রভৃতি অঞ্চলে এক ধরনের লোকগানের প্রচলন হয়েছিল, তার নাম ঘেটুগান। এই গানের দলে নদীর বুকে নৌকো নিয়ে ভাসতে ভাসতে ঘাটে ঘাটে নেমে বায়না নিয়ে নাচ দেখাত ও গান শোনাত বলেই এর নাম ‘ঘেটুগান’। ‘ঘাট’ থেকে ‘ঘেটু’। ‘ঘেটুগান’ আসলে কৃষ্ণের বিরহে রাধার গান। এই গান নেচে নেচে রাধা সেজে পরিবেশন করত কিশোরেরা। তাদের পরনে থাকত রাধার পোশাক, অলঙ্কার, পায়ে আলতা, চোখে কাজল। এ-সময় গড়ে উঠেছিল ঘেটুগানের অনেকগুলো দল। অভাবী ঘরের দেখতে সুন্দর কিশোরদেরই এ-সব দলে নেওয়া হত, তালিম দেওয়া হত নাচগানের। সবসময় তাদের সাজিয়ে রাখা হত মেয়ের সাজে। লোকে এদের বলত ‘ঘেটুপুত্র’। সেকালের অভিজাতশ্রেণির মানুষেরা বাড়িতে ঘেটুগানের আসর বসাতেন। রাধারূপী ঘেটুপুত্রকে মনে ধরলে, তাকে কিছুদিনের জন্য বাড়িতে রেখে দিতেন; বিশেষত পুরো বর্ষার সময়টা। এই সময়টায় তাদের নিয়মিত শয্যাসঙ্গী হতে হতো সেই অভিজাত মানুষটির। এক সময় এটাই প্রথা হয়ে দাঁড়ায়। তখন এই প্রথার বিপক্ষে সমাজ কোন প্রশ্ন তোলেনি। তুলবার সাহস করেনি। বাড়ির স্ত্রীরাও এটা মেনে নেন বা মেনে নিত বাধ্য হন। ঘেটুপুত্রদের সতীনের চোখে দেখতে থাকেন এবং ‘সতীন’ বলে ডাকতেও শুরু করেন। ষাট-সত্তর বছর আগেও এই প্রথার বেশ চল ছিল। প্রথার সঙ্গে এখন অবশ্য লুপ্ত হয়েছে এ গানের ধারাও। বাংলাদেশের বিখ্যাত সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হুমায়ুন আহমেদের শেষ পরিচালিত ছবি ‘ঘেটুপুত্র কমলা’। ছবিটিতে ঘেটুগানের সূত্র ধরে বাঙালির সমকামিতার ইতিহাসের এই অধ্যায়টি তিনি তুলে ধরেছেন। আসলে সমকামিতা ছিল, আছে ও থাকবেই; শুধু আইন করে মর্যাদাটুকু দিতে গেলেই, আমাদের যত উন্নাসিকতা, সেটাই আমাদের মজ্জাগত!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news