পার্থসারথি পাণ্ডা :
শুধু গ্রিক সাহিত্য নয়, নারীর সমকামিতাকে আধুনিক বিশ্ব সাহিত্যে প্রথম স্থান দিয়েছিলেন যিনি, তাঁর নাম স্যাফো। গ্রিসের একটি দ্বীপ লেসবোতে তিনি জন্মেছিলেন। তাই তিনি তাঁর কবিতায় নারীর সঙ্গে নারীর প্রেমের যে জয়গান গেয়েছিলেন, নারীর সঙ্গে নারীর দৈহিক সম্পর্কের কথা বলেছিলেন, সেই সম্পর্কটির নাম দেওয়া হয়েছিল তাঁরই জন্মস্থানকে যুক্ত করে, ‘লেসবিয়ান’। স্যাফোর জীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। কারণ, তাঁর জন্ম হয়েছিল যিশু খ্রিস্টের জন্মের সাড়ে ছ’শো বছর আগে। তাঁর লেখা কবিতার সামান্যই একালের পাঠকের হাতে এসে পৌঁছেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, তাঁর হাতেই প্রথম আধুনিক রোম্যান্টিক কবিতার সমৃদ্ধি ঘটেছে। কারণ, তিনিই প্রথম দেবতাকে ছেড়ে বা দেব-নির্ভর প্রেমের কচকচি ছেড়ে মানবিক প্রেমের কথা তুলে ধরেছেন তাঁর কবিতায়। তাঁর প্রেম সরাসরি নিবেদন করেছেন কখনও তাঁর পারিপার্শ্বিক মেয়েদের প্রতি, কখনও একজন বিশেষ নারী ‘ক্লেই’-কে। ক্লেই তাঁর মেয়ে না প্রণয়িনী, এ নিয়ে অবশ্য ধন্দ আছে সাহিত্যের ঐতিহাসিকদের মধ্যে। স্যাফোর কবিতার মধ্যে সরাসরি সমকামিতা বা কামের উদ্দাম রগরগে বর্ণনা অবশ্য নেই, তবে পংক্তির পরতে পরতে সমরতির ইঙ্গিত আছে, আর আছে অতৃপ্তমনের ঈর্ষাতুর হাহাকার— ‘কী কোমল সেই বালিকা! ঐ বালককে ভালোবেসে এরই মাঝে আমাকে হত্যা করেছে।’ কিম্বা, ‘অবশ্যই আমি তোমাকে ভালোবাসি, কিন্তু যদি আমাকে ভালোবাসো, কেন বিয়ে কর এক তরুণীকে? আমি ভাবতেই পারি না কোন তরুণের ঘর করছি আমি বোধহয় সেকেল হয়ে যাচ্ছি!’ (কবিতার অনুবাদ ইন্টারনেট থেকে নেওয়া) স্যাফোর বিয়ে হয়েছিল, স্বামীও ছিলেন। তবু হয়তো দেহেমনে কোন আলোড়ন ছিল না। আসলে, তাঁর নারীর শরীর যে পুরুষকে চাইছিল না, চাইছিল একজন নারীকেই—এ ব্যাপারে তাঁর তো কোন হাত ছিল না, অন্তরের যে ক্ষরণ থেকে এই চাহিদার শুরু, তাতেও তাঁর কোন হাত ছিল না। তাই তাঁকে সন্ধান করতে হয়েছে শরীর আর মন চায় যাকে, সেই নারীটিকে। এই পর্বে তাঁর রোম্যান্টিক অবচেতনায় ছিল গ্রিক পুরাণের সুন্দরী আফ্রোদিতির মতো সেই কুৎসিত অথচ প্রেমের পথ দেখানো নাবিক মাঝিটির জন্য অপেক্ষা। আসলে নিটোল প্রেম চেয়েছিলেন তিনি, চেয়েছিলেন প্রেমের মধ্যে শান্তি। শরীরে তার স্পর্শ। কামনায়। তাই সেই কামনা নিয়ে নারীদের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন তিনি। তাই তাঁর কবিতার সমকামিতা আসলে জীবন থেকেই নেওয়া। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে তিনিই তো একা নন, তাঁর আগে নারীর সঙ্গে নারীর দৈহিক সম্পর্কের ইতিহাস একটা ছিলই। সমাজের তা নিয়ে কোন মাথাব্যথা ছিল না। তবে স্যাফোর সমকামি যৌনজীবন নিয়ে কমেডি নাটকের ধারায় সেসময় ভাঁড় যাত্রা হয়েছে ঠিকই, লোক তাই দেখে হেসেওছে, যেমনটা সে যুগে যৌনতা ও কেচ্ছা নিয়ে মঞ্চে ভাঁড়ামো করা হত সেরকমই—আজও সিনেমায়-মঞ্চে অনেকসময়ই সমাকামিতা নিয়ে ভাঁড়ামো করা হয়, এ বিষয়ে আড়াই হাজার বছরের সভ্যতার পথে আমরা এক পাও এগোইনি। বরং উন্নাসিকতা নিয়ে পিছিয়ে আছি কয়েক যোজন দূরে; কারণ, আর যাই হোক, স্যাফোর যুগে উন্নাসিকতার ন্যাকামো ছিল না, থাকলে আড়াই হাজার বছরের পথ পেরিয়ে স্যাফো আজকের যুগে এসে পৌঁছতেন না।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news