Breaking News
Home / TRENDING / জোড়া জুতোর গপ্পো

জোড়া জুতোর গপ্পো

মূল রচনাঃ শরদ জোশী
অনুবাদঃ পার্থসারথি পাণ্ডা

বাঁ পায়ের জুতো ডানেরটাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘ও ভাই, তুই কোম্পানির রে?’ ডানেরটা একগাল হেসে একটু গর্বের সঙ্গেই যেন বলল, ‘আমি ভাই বাটা কোম্পানির!’

‘ও মা, তাই নাকি!’—কথাটা শুনে বাঁয়ার আনন্দ আর ধরে না। সেও গদগদ হয়ে বলল, ‘আরে ভাই আমিও তো তাই!’

এমনি করে দু’জনের ভাব হল। পাশাপাশি থাকতে থাকতে একের ওপর অন্যের টান বাড়ল। একটা অন্যটাকে কখনই একলা ছাড়তে চায় না। সঙ্গে থাকে। সঙ্গে যায়। সঙ্গে ফেরে। কখনই এমন হয় না যে, একটা জুতো বাইরে যেতে চাইলে অন্যটা বলবে, ‘না যাবো না’। এমনটাও কখনো হয় না যে, একটা জুতো ঘরে ফিরে এলো, অথচ অন্যটা এলো না। এমনই তাদের ভাব, এমনই তাদের ভালোবাসা।

দুটো জুতোই দারুণ টেঁকসই আর চমৎকার চকচকে। দুজনেরই এক এক খানা করে নিজস্ব মোজা ছিল, আর ছিল একটা করে পা। আসলে এই পা-ই তাদের চালায়। তবুও এক জুতোর পা অন্য জুতোয় গিয়ে সেঁধোবার মতো ভুল কখনই করে না। কথার কথা, ভুলটা করে ফেললেও না-শুধরে পায়ের উপায় থাকে না। ফলে, দুই জুতোর মধ্যে পায়ের দাবী ঘিরে ভুল বোঝাবুঝি হবারও কোন সুযোগ নেই।

এরইমধ্যে দুটো জুতো একদিন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কপাল ফেরে হঠাতই বেয়াড়া একটা পাথরে হোঁচট খেয়ে বাঁয়ের জুতোটা দারুণ চোট পেয়ে একেবারে কঁকিয়ে উঠল। অমনি ডানেরটা তার কাঁধে হাত রেখে সাহস দিয়ে বলল, ‘কোন ভয় নেই ভাই, একটু সহ্য কর। মন শক্ত কর। সব ঠিক হয়ে যাবে, আরে আমি তো আছি তোর সঙ্গে!’

হঠাৎ এই বিপত্তির মধ্যে পড়ে তাদের সাহস আর একতা যেমন বাড়ল, তেমনি অভিজ্ঞতাও বাড়ল। তারা বুঝল যে, যদি তারা একসঙ্গে লড়াই করে, তাহলে জীবনের সমস্ত বাধা, সব সমস্যাই একে একে তারা কাটিয়ে উঠতে পারবে।

দুটো জুতোরই একটা ভীষণ অপছন্দের বিষয় হল, তাদের পায়েদের মন্দিরে যাওয়া। দুটো জুতোরই ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই। পায়েরা মন্দিরে ঢুকলে তারা দাঁড়িয়ে থাকে বাইরে। পা ভেতর থেকে না ফেরা অব্দি তারা বাইরেই বসে থাকে। আসলে তারা ভাবে, পা-ই হল তাদের একমাত্র ঈশ্বর। কারণ, পা যতক্ষণ তাদের মধ্যে থাকে, ততক্ষণ তাদের থামানোর ক্ষমতা কারও নেই!

অবশেষে, এভাবে চলতে চলতেই তাদের দিন ঘনিয়ে এলো। একদিন একটা জুতো এমন ঘায়েল হল যে, তার আর চলার ক্ষমতাই রইল না। জীবন সম্পর্কে সম্পূর্ণ হতাশ হয়ে পড়ল সে। সঙ্গীকে করুণ গলায় বলল, ‘ভাই, আমার তো সব শেষ হয়ে গেছে! তুই আমার কথা ভেবে কষ্ট পাস না। তোর গায়ে জোর আছে, চাইলে জীবনে অনেক কিছুই করতে পারবি। আমার সঙ্গে পড়ে না থেকে তুই ভাই অন্য কোথাও চলে যা!

কথাটা শুনে অন্য জুতোর বুকে উথালি পাথালি হল। তার কেমন যেন কষ্ট হল। হাতে হাত রেখে সে বলল, এভাবে বলতে নেই ভাই। তোকে এভাবে একা ফেলে আমি কি কোথাও যেতে পারি! সে আমি কিছুতেই পারব না। আমরা একসাথে ছিলাম, একসাথে আছি, একসাথে থাকব! মরতে হলে ভাই দুজনে একসাথেই মরব! তোকে ছেড়ে কোত্থাও যাবো না, কোত্থাও না!

বাতিল হয়ে এমনি করে ধীরে ধীরে তাদের জীবন এগিয়ে চলল শেষের দিনের দিকে। বন্ধুতা আর ভালোবাসার যে বাঁধনে তারা বাঁধা পড়েছিল, শেষদিন অব্দি হয়তো সেই বাঁধনেই তারা বাঁধা থাকত। কিন্তু হঠাৎই ঘটে গেল একটা ঘটনা।

একদিন তাদের পায়েরা তাদের পরে প্রায় ছুটে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। ঘষটাতে ঘষটাতে তারাও সেই পায়ের সঙ্গে ছুটে চলল।

যে লোকটার দুই পা তাদের পরেছিল সে এক রাজনৈতিক নেতার সভায় গিয়ে পৌঁছল এবং তার ভাষণ শুনতে লাগল। শুনতে শুনতে তার কি জানি কি হল, হঠাতই সে ঝুঁকল, ডান পা থেকে জুতোটা খুলল এবং সাঁই করে হাওয়ায় ছুঁড়ে দিল।

জুতোটা হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে তিরের মতো সপাটে লাগল গিয়ে নেতার নাকে। অমনি নাক ফেটে একেবারে হৈ হৈ হুলুস্থুল যা তা অবস্থা হয়ে গেল!

তক্ষুনি সেখানে অসম্ভব হুড়োহুড়ি ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল, পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করল। সমবেত পাবলিক যে যেদিকে পারল দম নিয়ে পালাতে লাগল। তখন সেই লোকটা, যার পায়ে জুতো ছিল, সেও হট্টগোলের ফাঁকতালে অন্য জুতোটাকেও সেখানেই ফেলে পালিয়ে গেল।

কয়েক মুহূর্তেই মঞ্চ থেকে অডিয়েন্স সব একেবারে ভোঁ ভাঁ। ধারেপাশে কারও টিকিটিও আর দেখা গেল না।

একটা জুতো মঞ্চে পড়েছিল, অন্যটা অডিয়েন্সে। মঞ্চের জুতোটার দারুণ ফুর্তি। সে চেঁচিয়ে বলল, ভাই রে, আমার তো জন্ম সার্থক হয়ে গেল! ওরে, আমি যে রাজনীতিতে ঢুকে পড়লাম রে! দেখলি, কেমন হাওয়ায় ওড়লাম, আর নেতার নাকটা ফাটিয়ে দিলাম! শেষ জীবনটা এবার ভাবছি রাজনীতিতেই কাটিয়ে দেব!

অডিয়েন্সে পড়ে থাকা জুতোটার তখন বেজায় আফসোস। সে মনের দুঃখে বলল, হায় রে ভাই, আমায় কেন তুলে লোকটা ছুঁড়ল না! তুই নাক ফাটিয়েছিস, আমি অন্তত মাথাটাও তো ফাটাতে পারতাম!

ফাঁকা পেয়ে একসময় এক কাগজ কুড়ুনি তাদের তুলে নিয়ে গেল এবং এক রদ্দিওয়ালার কাছে বেচে দিল।

আজকাল দুটো জুতোই ঐ রদ্দিওয়ালার কাছে পড়ে আছে। আর অপেক্ষা করছে কেউ এসে যাতে ঐ ভেকধারী, দুশ্চরিত্র, অকাল কুষ্মান্ড আর বদমাশ নেতাদের দিকে তাদের তুলে ছুঁড়ে মারে! তারা এখন হয়তো কারও পায়ের যোগ্য নয়, কিন্তু গায়ের যোগ্য তো বটে!

বন্ধুগণ, আপনাদের যখনই ইচ্ছে হবে, যদি আপনাদের হাতে ক্ষমতা থাকে, প্রবল ইচ্ছে হয়, রাগ ওঠে, আপনারা ঐ জুতো জোড়া ব্যবহার করতে পারেন। তবে আপনাদের যদি একান্তই ইচ্ছে হয়, তাহলে শুধু ওগুলো কেন, যে-কোন জুতোই ব্যবহার করতে পারেন। দেশের সমস্ত জুতো রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য আপনার সেবায় হাজির!

Spread the love

Check Also

Big Breaking: হুমায়ুনকে ওয়েসির ‘ফিলার,’ কী উত্তর দিলেন তৃণমূলের বিধায়ক

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় হুমায়ুনকে ওয়েসির ফোন! দল তাঁকে শো-কজ করেছে। তিনি সেই শো-কজের উত্তরও দিয়েছেন। তাতেও …

রাহুলের পাইলট প্রোজেক্ট, মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসে আধিপত্য হারাতে পারেন অধীর

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে রাহুল গান্ধির নতুন উদ্যোগে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস রাজনীতিতে খর্ব হতে পারে অধীর …

আমি আসছি! নাম না করে শুভেন্দুকে শাসালেন আনিসুর

চ্যানেল হিন্দুস্থান, নিউজ ডেস্ক: নাম না করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিকে শাসালেন আনিসুর রহমান। একদা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *