কিশোর ঘোষ:
কবির শারীরিক মৃত্যু খুব বড় কথা না। ‘কবির জন্ম আছে, মৃত্যু নেই’ কথাটা কথার কথা নয়। প্রকৃত প্রস্তাবে কবির মৃত্যুর পরেই ‘কবি’টি আদৌ কবি ছিল কিনা তা টের পাওয়া যায়। যদিও নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ইতিমধ্যে মিথ। তিনি যে চিরস্মরণীয় কবি তা তাঁর জীবৎকালেই টের পেয়ে গেছি আমরা। তাহলে এই যে ৯৪ বছর বয়সে তিনি মারা গেলেন, তাতে করে সত্যিকারের বড় ক্ষতি হল কি? এমনিতে বড় (সামাজিকভাবে সফল) কেউ মরলেই শোকপ্রকাশের ঢল নামে। এবং ঘুরেফিরে মুখস্থ বুলি—অমুকের মৃত্যুতে বড় ক্ষতি হয়ে গেল! কিন্তু সত্যিটা হল, সকলের মৃত্যুতে ‘বড়’ ক্ষতি হয় না, শুনতে নির্মম লাগলেও আসল কথা হল, অধিকাংশের মৃত্যুতে দুনিয়ার খুব বেশি এসে-যায় না। ব্যক্তিগত পরিসরের কথা এখানে হচ্ছে না। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে নিয়ে যখন কথা বলছি তখন বিচার্য সমগ্র। সেই সামগ্রিকতার দিক থেকেই নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর মৃত্যুতে প্রকৃতই বড়সড় ক্ষতি হল কি? হলে কেন ক্ষতি, কীসের ক্ষতি? বেশ তো বাঁচলেন প্রায় একশো বছর। অনেক কাজ করেছেন। শরীর আর দিচ্ছিল না। বার্ধক্যজনিত কারণেই বিদায় নিলেন।
আসলে সারা জীবন অনেক করেছিলেন বলেই মানুষটার মৃত্যু ক্ষতিকর হয়ে উঠল হয়তো। ফালতু হয়ে বাঁচলে ঝামেলা ছিল না। তাদের হল—এলুম, ঘুরলুম-ফিরলুম এবং চলে গেলুম। সমাজ-সংসারের তাদের নিয়ে ঝঞ্ঝাট নেই, তাদেরও সমাজ-সংসার নিয়ে ঝঞ্ঝাট নেই! কিন্তু নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বাংলা কবিতার মাইলস্টোন হয়ে উঠলেন। ৪৭টি কাব্যগ্রন্থ লিখলেন। সবচেয়ে বড় কথা এমন একটি আঙ্গিক রচনা করলেন বাংলা কবিতায় যার পূর্বসূরি তিনি, উত্তরসূরিও। এমনকী মিথ হয়ে গেল ‘উলঙ্গ রাজা’, ‘কলকাতার যিশু’, ‘অমলকান্তি’। এবং ছন্দের মাস্টার হওয়া সত্ত্বেও অসামান্য গদ্য কবিতা লিখেও ক্ষান্ত দিলেন না। ভাবলেন বাংলা ভাষা নিয়ে।

আমরা পেলাম ‘কী লিখবেন, কেন লিখবেন’। মনে আছে নয়ের দশকের শেষের দিক। কলেজে পড়ি। কলেজ লাগোয়া এক বুকস্টল থেকে বইটা কিনে লোকাল ট্রেনে পড়তে পড়তে বাড়ি ফিরেছিলাম। আর নিজেকে নিজের মাতৃভাষা বিষয়ে আহম্মক ঠাওরেছিলাম। যাই হোক, একই লোকের আরেক অসামান্য কাজ ‘কবিতার ক্লাশ’। যা এককালে ধারাবাহিক ছিল। পরে গ্রন্থকারে। যে গ্রন্থটি ছাড়া তরুণ কবিদের চলেনি, চলে না। বিশেষত সেই তরুণ কবির, যে কানকে ছন্দের গুরু মানে। যে ছন্দ লিখতে চায় না, কবিতা লিখতে চায় পদে পদে। যে কবিতায় প্রথাগত ছন্দ থাকতে পারে, আবার নাও পারে। তাঁকে স্বশিক্ষিত হওয়ার সুযোগ করে দিলেন নীরেন্দ্রনাথ।
ভাবতে অবাক লাগে, যে লোক মূলত কবি ও মস্ত বড় পণ্ডিত সে-ই টিনটিন অনুবাদ করেছেন দিনের পর দিন! আমি, আপনি যখন ছোটবেলায় টিনটিন পড়ে মুগ্ধ হয়েছি, তখন কি একবারও ভাবতে পেরেছি যে টিনটিনের অনুবাদক কবি, পণ্ডিত তথা ভাষাবিদ নীরেন চক্রবর্তী! কেউ ভাবেনি। বড় হয়ে জানতে পেরে ভেবলে গেছিলাম এক্কেবারে। আর কত কত মন মাতানো ছড়া। এর উপরে আনন্দমেলা সম্পাদনা। এমনকী আরও আরও আখ্যান রচনা। বলে শেষ করার নয়। এখন কথা হচ্ছে, এইরকম হাজারটা কাজ তো তিনি কবেই সেরে ফেলেছেন। বাংলা ভাষা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য পেয়েছেন উল্টোরথ পুরস্কার, তারাশঙ্কর স্মৃতি পুরস্কার, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে সাম্মানিক ডি-লিট দিয়েছে এবং সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারও আছে কবির ঝুলিতে। অর্থাৎ কিনা কাজ করেছেন যেমন, তেমনি তার জন্য স্বীকৃতিও পেয়েছেন কমবেশি। তারপর বয়সকালে সেই লোক মারা গেলে ক্ষতির কী আছে? সত্যি বলতে ইদানীংকালে এক দুটো কবিতা বই অন্য কিছু লিখতেন না। শরীর দিত না। কিন্তু, তথাপি, তবুও নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর মৃত্যু অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু কেন?

কারণ গঙ্গাপাড়ের আকাশে হিন্দি-কালো, ইংরেজি-কুচকুচে মেঘ। কারণ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি ক্ষয়ে আসছে পশ্চিমবাংলায়। যুক্তিযুক্ত কারণেই নতুন প্রজন্মের কাছে ইংরেজি প্রথম, বাংলা দ্বিতীয়, কখনও বা তৃতীয় ভাষা। ফলে আমরা এমন একটা সময়ে এসে পড়েছি যখন ভবিষ্যৎ বিপ বিপ বিপদসংকেত দিচ্ছে থেকে থেকে। বলছে—বছর পঞ্চাশ পর বাংলা পড়ে থাকবে একটি অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষা হয়ে। হয়ে উঠবে বিলুপ্তপ্রায় ভাষা। সেই ভাষায় লেখার প্রয়োজন ফুরোবে আগেই। বর্ণমালা মিলবে জাদুঘরে।
অর্থাৎ এক ভয়ঙ্কর কঠিন সময়ে চলে গেলেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। কে চলে গেল?
যাঁর আজীবনের কাজ ছিল মাতৃভাষা বাংলার উজ্জীবন। কবিতা লেখা, ভাষাচর্চা, ছন্দচর্চা, অনুবাদ সবই সে কথাই প্রমাণ করে। এমন একজনের চলে যাওয়া মানে বাংলা ভাষায় অনুপ্রাণীত হওয়ার সম্ভাবনাও কমতে থাকা। কারণ এতকাল তবুও তো চোখের সামনে একটা মানুষ ছিল। যে জীবনে সফল। নিজের ভাষাকে ভালোবেসেই সফল! হয়তো একারণেই আজ শীর্ষেন্দু মুখোপাধায় নিজের শোকবার্তায় বললেন, নীরেনদার মৃত্যু মানে আমার কাছে একজন অভিভাবকের মৃত্যু।
এই হল কথা। ক্ষয়িষ্ণু বাংলা ভাষার অভিভাবক ছিলেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news