নীল রায়:
আজ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ১২৩ তম জন্ম বার্ষিকী। মৃত্যুহীন এই বঙ্গসন্তান নিখোঁজ ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট থেকে। অন্তত ইতিহাসের পাতা সে কথাই বলে। এদিকে দেশ স্বাধীনতা লাভের ৭৫তম জয়ন্তী পালনের থেকে আর মাত্র তিন বছর দূরে। এই সময়কালে সুভাষের দেশ কি তাঁকে খোঁজার কোনও আন্তরিক প্রয়াস করেছে? আপামর ভারতবাসী জানে সে উত্তর ‘না’। কখনও শাহনাওয়াজ কমিশন, কখনও খোসলা কমিশন। আবার কখনও মুখার্জি কমিশনের গাজর ঝোলানো হয়েছে দেশবাসীর সামনে। তা করেছে বিভিন্ন সময়ের দিল্লির শাসকরা। শৃঙ্খলামুক্ত দেশের রাজনীতিকদের এই প্রয়াসগুলি কখনওই সেভাবে আন্তরিক হয়নি বলেই হয়তো, সুভাষ বোসকে নিয়ে কাহিনির অন্ত নেই। গুমনামী বাবা, শৈলমারীর বাবা, ফৈজাবাদের বাবা। আবার তাঁর শেষ পরিণতির কথাও শোনা যায় সাইবেরিয়ার জেলে।

এসব কিছুই দেশের নেতাদের দৌলতে আম আদমি পেতে অভ্যস্ত। সব মিলিয়ে আজ রাষ্ট্রের কাছে ২৩ জানুয়ারি শুধুমাত্র নেতাজি উৎসবে এসে ঠেকেছে। ঠিক যেন কালী, লক্ষ্মী বা সরস্বতী পুজো। আর রাজনৈতিক নেতাদের কাছেও তেমনই বিষয়। নেতাজির রাজনৈতিক জীবনের বড় অংশ কেটেছিল কংগ্রেসে। সেই দল তাঁর আত্মত্যাগের তুলনায় কোনও একটি বিশেষ পরিবারের ত্যাগকেই দেখিয়ে এসেছে ফলাও করে। এদিন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধী ট্যুইট করে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে এই অমর সন্তানের মৃত্যুর তারিখ লেখেন— ১৮ আগস্ট, ১৯৪৫। কিন্তু কংগ্রেসের এই নেতা মনে হয় জানেন না, নেতাজির মৃত্যু নেই। নেতাজির মৃত্যু হয় না। আর যদি থাকে, তাহলে তা প্রকাশ্যে আনার দায় ছিল তাঁর পূর্বসুরীদের। নেতাজির নিজের স্থাপিত দল ফরওয়ার্ড ব্লক এখন অস্বিত্ব সংকটে ভুগছে। এ বছর ১০-২১ জানুয়ারি নেতাজি ভাবনা যাত্রা করেছে তারা। এই কর্মসুচীর লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কী? তা কারো জানা নেই। নেতাজি অন্তর্ধান রহস্য উন্মোচনে কোনওদিনও আগ্রহ প্রকাশ করেনি ফরওয়ার্ড ব্লক। প্রথম ইউপিএ সরকারের প্রানভোমরা ছিল বামপন্থী সাংসদরা। সেই দলে ছিলেন ফব-র তিন সাংসদ। সেই সময় মনমোহন সিং সরকার যখন মুখার্জি কমিশনের রিপোর্ট ঠাণ্ডা ঘরে পাঠাল, তখনও অদ্ভুতরকম মৌন ছিলেন ফব-র সাংসদরা। দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁর সরকার এলে নেতাজি সংক্রান্ত যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর মিলবে।

গত সাড়ে চার বছরে তা হয়নি। কিন্তু তাঁর উদ্যোগে আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের তিনটি পৃথক দ্বীপের নামকরণ হয়েছে নেতাজি স্মরণে। আবার আজাদ হিন্দ বাহিনীর ৭৫তম বর্ষপুর্তিতে নজির গড়ে লালকেল্লায় পতাকা উত্তোলন করেছেন মোদী। এদিন লালকেল্লায় সুভাষ স্মরণে তাঁর নামে সংগ্রহশালা উদ্বোধন করা হয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর তৎপরতায়। রাজনৈতিক সমালোচকদের কথায়, এগুলো করে নরেন্দ্র মোদী আখেরে রাজনীতিই করেছেন। কংগ্রেস রাজনীতিতে সুভাষচন্দ্র বসুর কোনও মর্যাদা না থাকার বিষয়টিকে কৌশলে তুলে ধরতে চেয়েছেন মোদী। তেমনই বাংলায় দলের মাটি শক্ত করতে ব্যবহার করেছেন সুভাষ-আবেগ।

বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার সরকারীভাবে দিনটিকে ‘সুভাষ উৎসব’ পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। এসবের কোনও কিছুতেই নেতাজিকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হয় না আসলে। কারণ রাষ্ট্র এখনও কোনও উচিত সম্মান দেয়নি এই দেশ নায়ককে। জানায়নি তাঁর শেষ দিনগুলির রহস্যও। এ প্রসঙ্গে নেতাজি গবেষক পুরবী রায় বলেন, “কংগ্রেস দেশের সিংহভাগ সময় ক্ষমতায় থেকেছে। তাঁদেরই দায়িত্ব ছিল নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য উন্মোচন করে দেশবাসীকে তা জানানো। কিন্তু হয়তো কোনও গোপন চক্রান্তের কথা প্রকাশ্যে আসতে পারে। সেই ভাবনা থেকেই তাঁরা এ বিষয়ে উদ্যোগী হয়নি।”

নেতাজিকে রাষ্ট্রনায়ক ঘোষণা করা হোক এমন দাবিতে একাধিক কর্মসূচি নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই কার্ত্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমদের দেশের রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, স্বামীজির মতো মানুষদের বাণীকে পাথেয় করে চলা উচিত ছিল। কিন্তু দেশের বর্তমান রাজনীতিকরা তাঁদের ভুলিয়ে নিজেদের কার্যসিদ্ধি করতে চান। সত্য প্রকাশ পেলে সাধারণ মানুষ যে সজাগ হবে, সচেতন হবে। রাজনীতিকরা সেটা চান না বলেই নেতাজির মতো মানুষকেও সম্মান দেওয়া হয়নি।”
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news