নৃসিংপ্রসাদ ভাদুড়ী:
শবরীমালা মন্দিরে ঋতুমতী মেয়েদের প্রবেশ অধিকার নিয়ে যা হচ্ছে, আমার মতে তা অহেতুক। দেবতার কাছে সকলেই যেতে পারেন বলেই বিশ্বাস করি। এই বিশুদ্ধ সম্পর্কের মাঝে কেউ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না। যাঁরা বলছেন শবরীমালা মন্দিরের ব্রহ্মচারী দেবতা শাস্তা আয়াপ্পনের মন্দিরে ১০ থেকে ৫০ বছর বয়সি (ঋতুস্রাবের বয়সের নারী) মেয়েরা ঢুকতে পারবে না, তাঁরা এসব নিয়ম নিজেরাই তৈরি করছেন বা করেছেন। হতে পারে এই নিয়ম লাগু করার পেছনে কোনও উদ্দেশ্য রয়েছে। যা সকলের জানা নেই। কিন্তু সবটাই আমার কাছে অকারণ বোধ হচ্ছে। যেহেতু মানুষ দেবতার কাছে স্বাভাবিক ভাবেই যাবে বলে মনে করি।
উল্লেখ্য, এমন আরও কিছু নিয়ম রয়েছে কেরলের বর্তমানে বিতর্কিত বিখ্যাত মন্দির শবরীমালায়। তীর্থযাত্রীদের যে নিয়ম অত্যন্ত কঠোর ভাবে পালন করার নিদান দেওয়া রয়েছে বহু বছর ধরে। যেমন, মন্দির যাত্রা শুরুর আগে টানা ৪১ দিন আমিষ ভক্ষণ নিষিদ্ধ, নিষিদ্ধ মদ্যপান, এমন কী যৌনসংসর্গও এই সময়টায় করা যাবে না ইত্যাদি। সত্যি বলতে ইত্যাকার নিয়ম পালন করা বেশ কঠিন। কজন সেই নিয়ম পুঙ্খানুপুঙ্খ পালন করে তবেই মন্দিরে প্রবেশ করেন তা মন্দির কর্তৃপক্ষই বলতে পারবেন। তথাপি একটি বিষয় কোনওভাবেই মানা যায় না, তা হল মন্দির কর্তৃপক্ষের এই অনুদারতা। আমি বলব, সনাতন ধর্মের সঙ্গে এর বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। হ্যাঁ, অনেক ক্ষেত্রে ঋতুমতী মেয়েদের দেবতার ভোগ রান্না ইত্যাদিতে নিষেধাজ্ঞা আছে বটে শাস্ত্র মতে, তবে ওটুকুই। তবে এত কথা ওঠারও কোনও কারণ দেখি না আমি! কারণ সনাতন ধর্মে মন্দির বিষয়টিই ছিল না। ছিল তীর্থ। তীর্থস্থান। যেমন নর্মদা তীর। গঙ্গা বা নর্মাদার মতো পুন্যতোয়া পাড় হওয়াই ছিল তীর্থের পবিত্র পুন্য লাভ, দৈবের আশীর্বাদ। মন্দির ছিল না তবে কী ছিল!
ছিল গুরুগৃহ। ছিল আশ্রম। কিন্তু সেই আশ্রমে তথাকথিত দেবতার স্থান ছিল না। বরং ব্রহ্মচর্যের শিক্ষা দেওয়া হত বৈদিক চতুরাশ্রম প্রথায়।

এইসঙ্গে মনে রাখতে হবে, আমাদের ধর্মটা মসজিদ বা চার্চ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। সনাতন ধর্ম চিরকালই অতি অতি ব্যক্তিগত এক ধর্ম। এবং সেই মতো তার ধর্মাচারণ পদ্ধতি। অতএব নিয়ম নীতির ধুয়ো তোলার প্রয়োজনও ছিল না। মন্দির তৈরি করে তারপর সেই মন্দিরে ছেলেরা ঢুকবে কিন্তু মেয়েরা প্রবেশ করতে পারবে না, এমনতর অদ্ভুত ভাবনাও আমরা কোনও যুগে ভেবে উঠতে পারিনি। আবারও বলছি, সনাতন ধর্ম হাজার হাজার বছর ধরে টিকে আছে তার এই উদার সংস্কৃতির জন্যই। যেহেতু সে মসজিদ বা চার্চের মতো কোনও প্রতিষ্ঠান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। বরং ব্যক্তির অন্তর্গত ধর্মতেই সে বিশ্বাস রেখেছে এয়াবৎকাল। এমত অবস্থায় সেই মন্দিরে ঋতুমতী মেয়েদের প্রবেশ অধিকার নিয়ে ঝামেলা, আন্দোলন, পালটা আন্দোলন, এমনকী মানুষ খুন, এবং দেশের শীর্ষ আদালতে তা নিয়ে মামলা, বিচারপতিদের নিদান দেওয়া ইত্যাদি দেখে খারাপ লাগছে।
একদিকে যখন সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে, সব বয়সি মহিলাই মন্দিরে ঢুকতে পারবেন, কোর্ট স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে মহিলাদের বাধাদান ধর্মের অংশ নয়। মন্দিরে ঢোকার ক্ষেত্রে সকলের সমান অধিকার রয়েছে। তখন আবার শবরীমালার ট্রাস্টি বোর্ড সংবাদমাধ্যমকে বলেছে, ঋতুযোগ্য মেয়েদের প্রবেশ করতে দিয়ে শবরীমালাকে ‘থাইল্যান্ড বানাতে চায় না’ ইত্যাদি। এরপর সেই মন্দিরে দুই নারী মন্দির কর্তৃপক্ষের চোখে ‘ধুলো’ দিয়ে ঢুকেও দেখালেন। যা নিয়ে ফের সাম্প্রতিক অশান্তি সে রাজ্যে।
যাক গে, আসলে আমি একটা সহজ বিষয় বুঝি, দেবতার কাছে ভক্ত আসবে, এর মধ্যে কোনওরকম নিয়ম নিষেধ থাকতে পারে না। লিঙ্গভেদ থাকতে পারে না। সনাতন ধর্মের ঐতিহ্য আমাকে এমন উদার শিক্ষাই দিয়েছে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news