কমলেন্দু সরকার

কাল রাত্রে ঝড় এসে ঢুকেছিল পরিচিত ঘরে।/ লোকেন ছিল না। তার জার্নালের পাতা কটি উড়ছে/ হাওয়ায়;
দিব্যেন্দু কী জানতেন তাঁর কবিতার ঝড় নিজের ঘরে ঢুকেছে! তিনি কী জানতেন তাঁর লেখার পাতাগুলো উড়ছে হাওয়ায়! হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন। কিংবা পারেননি।
দিব্যেন্দু অর্থাৎ দিব্যেন্দু পালিত। তিনি বলছেন, একাকী, নিঃসঙ্গ, এই আত্মঘাতী শোকের ভিতর/ থেকো, তবু অপেক্ষায় থেকো।
তিনি অপেক্ষায় রেখে চলে গেলেন না-ফেরার কড়ারে।
সকালে কবি পিনাকী ঠাকুরের মৃত্যুর ধাক্কা সামলাতে না সামলাতে খবর এল সাহিত্যিক দিব্যেন্দু পালিতের প্রয়াণ-সংবাদ। দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। সুস্থ হয়ে আবার কর্মজীবনে ফিরেছিলেন। সভাসমিতিতেও যাতায়াত করেছেন। দু’চার কথা বলেননি তা নয়, বলেওছেন। হঠাৎই দুঃসংবাদ।
ঠিক ৬৪ বছর আগে দিব্যেন্দু পালিতের প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার ‘রবিবাসরীয়’-তে। ১৯৫৫-র ৩০ জানুয়ারি। গল্পের নাম ‘ছন্দপতন’। এই গল্প কিন্তু দিব্যেন্দু পালিতের লেখকজীবনে বিন্দুমাত্র ছন্দপতন ঘটায়নি। ছন্দে চলেছিল তাঁর লেখনী। বাংলা সাহিত্য এবং বাঙালি পেয়েছিল এক সফল লেখককে।
পিতার মৃত্যুর পর ভাগলপুর থেকে কলকাতা চলে এসেছিলেন দিব্যেন্দু। তারপর লড়াই আর লড়াই। শুরু হল কর্মজীবন। তিনি তখন যোগ দিলেন আনন্দবাজার গ্রুপের ‘হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড-এ। সাব এডিটরের পোস্ট। পরবর্তী কালে আসেন বিপণন ও বিজ্ঞাপন জগতে। দীর্ঘদিন ছিলেন ক্ল্যারিয়ন, আনন্দবাজার এবং দ্য স্টেটসম্যান-এ। আনন্দবাজারে বিজ্ঞাপনে থাকার সময় থেকে আমার সঙ্গে দিব্যেন্দু পালিতের সখ্য। দিব্যেন্দুদার ভীষণ বন্ধু ছিলেন আনন্দ পাবলিশার্স-এর বাদল বসু। বাদলদার সঙ্গেও আমার খুবই ভাল সম্পর্ক ছিল। তাই দিব্যেন্দু পালিতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। দিব্যেন্দুদার নতুন বই প্রকাশিত হলেই একটা আমাকে দিতেন।
হঠাৎ একদিন শুনলাম দিব্যেন্দুদা আনন্দবাজার ছেড়ে চলে গেছেন দ্য স্টেটসম্যান-এ। প্রায় দিনই ফোন করে ডাকতেন তাঁর অফিসে। প্রথম দিন দিব্যেন্দুদার ঘরে ঢুকে চমকে গেছিলাম। বিশাল ঘর। বেশ সাজানো। ঝকঝক করছে। বসতে বললেন। তারপর নানারকম গল্প। এককাপ সুন্দর চা খাওয়ালেন।
আবার একদিন শুনি দিব্যেন্দু পালিত আনন্দবাজারে ফিরছেন। আনন্দবাজার পত্রিকার সাময়িকীর দায়িত্ব নিয়ে। শুক্রবার এবং রবিবাসরীয়-র কিছুটা দেখবেন। আমাকে একদিন ডাকলেন তাঁর ঘরে। বললেন, “তুমি তো সিনেমার চর্চা করো। ফিল্ম রিভিউ করবে?” আমি সম্মতি জানাতেই ফি-সপ্তাহে ডেকে রিভিউ করতে বলতেন। মাঝেমধ্যে নাটকের সমালোচনাও করিয়েছেন। উনি অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়ার সময় বেঁধে দিতেন রিভিউয়ের শব্দসংখ্যা। এই নিয়ে আমি আর অনিরুদ্ধ(ধর) নিজেদের মধ্যে মজা করতাম। দিব্যেন্দুদা নিজে পোশাকে আচার-আচরণে যেমন পরিপাটি ছিলেন তেমনই ছিলেন লেখার ব্যাপারে। পুজোসংখ্যায় যখন তাঁর লেখা উপন্যাস দেখতে হত ছাপতে যাওয়ার আগে, পড়তে পড়তে বুঝতাম তাঁর লেখায় একদম মেদ নেই। অর্থাৎ একটা শব্দও অতিরিক্ত নয়। এমনকী কমা, দাঁড়ি, ফুলস্টপও অতিরিক্ত বা অযথা থাকত না। দিব্যেন্দু পালিতের বহু লেখা পড়েছি আমি অতিকথন সচরাচর পাইনি। এবং তিনি গল্প-উপন্যাসে যেসব চরিত্র সৃষ্টি করতেন সেসব ছিল খবর থেকে উঠে আসা জীবন। তাঁকে সমসাময়িক ঘটনা খুব টানত, ভাবাত। বিশেষ করে নকশাল আন্দোলন। সবসময় যে আসত তা নয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা দেখা গেছে। উদাহরণ হিসেবে ‘অন্তর্ধান’-এর কথা বলা যেতে পারে। এই উপন্যাসটি নিয়ে তপন সিনহা ছবি করেছিলেন। দিব্যেন্দু পালিতের একাধিক গল্প-উপন্যাস নিয়ে ছবি হয়েছে। সিনেমার ব্যাপারে একটা কথা বলি, দিব্যেন্দুদা আমার জীবনের মোড়ই ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। আমি তখন সিনেমা করব বলে মেতে উঠেছিলাম। সে-কথা দিব্যেন্দুদার কানে যেতেই আমাকে একদিন ডাকলেন ওঁর ঘরে। বললেন, “চাকরি ছেড়ে সিনেমা করার কথা ভেবো না। চাকরির বাজার ভাল নয়। তার ওপর আনন্দবাজারের সাংবাদিকতার কাজ। যা করবে ভাবনাচিন্তা করে।” আমার আর ক্যামেরার পিছনে যাওয়া হয়নি ঠিকই কিন্তু সাংবাদিকতা-জীবনে যা পেয়েছি তা খুব কম নয়।
দিব্যেন্দু পালিত কবিতা লিখতেন। বহু বইও রয়েছে— রাজার বাড়ি অনেক দূর, নির্বাসন নয়, নির্বাচন, কিছু স্মৃতি কিছু অপমান ইত্যাদি।
দিব্যেন্দু পালিতের গদ্য এবং পদ্য দুটোতেই আছে স্বকীয়তা। ছিল নিজের একটা ভিন্ন স্টাইল। যা সুনীল, শীর্ষেন্দু, সিরাজ, অতীন, বুদ্ধদেব প্রমুখের থেকে আলাদা করে চিনিয়েছে দিব্যেন্দুকে। এঁদের মতো আলাদা পাঠককুল তৈরি করতে পেরেছিলেন দিব্যেন্দু পালিত।
দিব্যেন্দুদার একটা নেশা ছিল। সেই নেশার টানে প্রতিদিন দুপুরে তাঁকে অফিসে পাওয়া যেত না। যাঁরা এই নেশার কথা জানতেন তাঁরা কেউ ওই সময় অফিসে এসে খোঁজ করতেন না। সটান চলে যেতেন কফি হাউসে। সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ কফি হাউসের লর্ডসে নিত্য আড্ডা দেওয়াটা ছিল দিব্যেন্দুদার প্রচণ্ড নেশা। অতিবৃষ্টি, অতিগরম এবং অতিঠান্ডাতেও দিব্যেন্দুদার দুপুরের ঠেক কফি হাউস। তখন কফি হাউসে ছিল হাউস অফ লর্ডস এবং হাউস অফ কমনস। লর্ডস-এ ছিল সব ইন্টেলেকচুয়াল এবং বিখ্যাত লোকদের আড্ডা। শুনেছি একসময় সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, চিদানন্দ দাশগুপ্ত প্রমুখও আড্ডা দিতেন। তবে পরবর্তী কালের বহু নামীদামি লোককে দুপুরের আড্ডায় দেখেছি লর্ডসে।
দিব্যেন্দু পালিত পুরস্কার পেয়েছেন— আনন্দ (১৯৮৪), ভুয়ালকা (১৯৮৬), ‘ঢেউ’-এর জন্য বঙ্কিম (১৯৯০), ‘অনুভব’-এর জন্য সাহিত্য অকাদেমি (১৯৯৮)।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news