জয়ন্ত চৌধুরী :
মোদী জুজুর ভয়!
তাই কি দেড় দশক ব্রাত্য থাকার পর হঠাৎ করে পি ভি নরসিংহ রাওয়ের পুজোয় ব্যস্ত হয়ে পড়ল কংগ্রেস?
ঘটনা পরম্পরায় এমন কৌতূহল জাগাটা যথেষ্ট সংগত। দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তথা দলীয় নেতাকে কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গাঁধী যেভাবে দিল্লি থেকে উৎখাত করেছিলেন, তা শুধু নজিরবিহীন নয় মানবিকতার নিরিখেও খুব নিম্নস্তরের বলে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। এখন সনিয়া বা রাহুল গাঁধী যতোই নরসিংহ ব্রত পালন করুন না কেন, সেই পাপ স্খলন সম্ভব নয়। অনুশোচনা থাকতে পারে। ইতিহাসের পুনঃ মূল্যায়নে অবস্থান বদলও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু প্রয়াত কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রীর শতবর্ষ নিয়ে সনিয়া-রাহুলের টনক নড়া কতটা আন্তরিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেল। ঘটনাচক্রে, গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে তাঁর পূর্বসূরী প্রয়াত পি ভি নরসিংহ রাওয়ের আসন্ন শতবর্ষ পালনের সরকারি পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন। তার পরপর গাঁধী পরিবারের নরসিংহ রাওকে নিয়ে দরদ উথলে ওঠায় ধন্দ জাগাটা প্রত্যাশিত।
দেশের প্রথম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, স্বাধীনতা সংগ্রামী বল্লভভাই প্যাটেলকে ইতিমধ্যে কংগ্রেসের ঘর থেকে ছিনিয়ে নিয়েছেন মোদী। জাতির জনক মহাত্মা গাঁধীকে তাঁর স্বচ্ছ ভারত অভিযানের আইকন বানিয়ে কংগ্রেসের একাধিপত্যে ভাগ বসিয়ে দিয়েছেন মোদী। এবার দেশের প্রথম নেহরু গাঁধী পরিবারের বাইরের কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাওকেও যদি তিনি হাইজ্যাক করে নেন, তাহলে বিড়ম্বনার একশেষ সনিয়াদের। তাই নরসিংহ রাওয়ের মৃত্যুর পর চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে সনিয়ার মনরক্ষায় কংগ্রেস নেতৃত্ব যে অপকর্ম করেছিল, এখন তার প্রায়শ্চিত্ত করতেই নরসিংহ বন্দনায় ব্রতী হয়েছে তারা। সনিয়া রাহুল নিজেরা তো বটেই, রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর থেকে দেশের আর্থিক সংস্কারের কান্ডারী পদে তুলে আনা মনমোহন সিংহকে সামনে এনে হাজির করেছেন তাঁরা নরসিংহ বন্দনায়।


বেশিদিন আগের ঘটনা নয়। তাই খুব বেশি স্মৃতি হাতড়াতে হবে না। প্রথম ইউপিএ সরকারের আমল। ২০০৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর। দিন পনের দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এইমস) এ গুরুতর অসুস্থ হয়ে ভর্তি থাকার পর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন তেলেগু বিড্ডা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী (১৯৯১-১৯৯৬) নরসিংহ রাও। কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়ার মন রেখে চলার ব্যাপারে নরসিংহ রাওয়ের মোটেই সুনাম ছিল না। তাই দলের অন্যদের কাছ থেকে যে তোয়াজ পেতে গাঁধী পরিবার অভ্যস্ত, তা মেটাতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী রাও। বাবরিকান্ড ঘটেছিল রাওয়ের প্রধানমন্ত্রীত্বের জমানায়। রাজীব গাঁধী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ১৯৮৯ সালে হিন্দুদের তুষ্ট করতে মসজিদের অভ্যন্তরে তখনও পর্যন্ত বিতর্কিত রামলালার মন্দিরের চাবি খুলে দিয়েছিলেন। শাহবাণু মামলায় মুসলিম মোল্লাতন্ত্রকে খুশি করতে সফল হয়েছিলেন রাজীব। ধর্মীয় রাজনীতির ভারসাম্য রাখতে তাই তাঁকে রামলালাকে হাতিয়ার করতে হয়েছিল। তার তিন বছরের মাথায় ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ‘বাবরি মসজিদ’ ধ্বংস করেছিল হিন্দুত্ববাদীরা। কেন্দ্রে তখন যেহেতু নরসিংহ রাওয়ের সরকার, তাই তার দায় এড়াতে পারেনি কংগ্রেস। কিন্তু পুরো দায় এককভাবে রাওয়ের উপর চাপিয়ে বাবরিকাণ্ড থেকে হাত ধুয়ে ফেলতে রাওকেই বলির পাঁঠা করেছিল সনিয়া বাহিনী। ফলে বাবরি মসজিদ ও রাম মন্দির বিতর্কে তাঁর স্বামীর ভূমিকা ভুলিয়ে দিতে নরসিংহ বলির কোনও বিকল্প পাননি সনিয়া। ওই বিরোধ এতটাই প্রবল ছিল, যে তাঁর মৃত্যুর পরমুহূর্ত থেকেই রাজধানীতে যে কুনাট্যের সূচনা হয়েছিল তা গাঁধী পরিবারতন্ত্রের সংস্কৃতিকে বেআব্রু করে দিয়েছিল।
![]()
প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর অনুগামী ও পরিবার চেয়েছিল, তাঁর তিন দশকের কর্মভূমি দিল্লিতে, পূর্বসূরীদের মতো মর্যাদায়, অন্তেষ্টি হোক। সনিয়া তখন শুধু কংগ্রেসের সভানেত্রী নন ইউপিএ-র চেয়ারপার্সন। কেন্দ্রে তাঁদের সরকার। দল ও সরকারে তাঁর দোর্দণ্ড প্রতাপ। কিন্তু জীবদ্দশায় রাওকে দল থেকে বস্তুত উৎখাত করেও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর প্রতি প্রতিশোধ স্পৃহা শেষ হয়নি সনিয়ার। তাই দলকে জানিয়ে দিলেন, রাওয়ের শেষকৃত্য দিল্লির নিগমবোধ শ্মশানে নয়, অন্ধ্রপ্রদেশে হবে। প্রথমে মানতে চায়নি রাওয়ের পরিবার। শিবরাজ সিংহ, গোলাম নবী আজাদ প্রমুখ হেভিওয়েট নেতা, রাও পুত্রদের বোঝাতে শুরু করলেন। তাঁদের যুক্তি অন্ধ্রপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর শেষকৃত্য তার জন্মভূমিতে হওয়া বাঞ্ছনীয়।

তিরিশ বছর আগে অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হলেও তারপর দেশের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া পর্যন্ত এই সুদীর্ঘকাল যাঁর কর্মভূমি দিল্লি, তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কেন রাজধানীতে হবে না, এর কোনও গ্রহণযোগ্য যুক্তি দিতে পারেননি কংগ্রেস হাইকমান্ড। শেষ পর্যন্ত হায়দরাবাদ থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছিল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা কংগ্রেস নেতা ডাক্তার ওয়াই এস আর রেড্ডিকে। তিনিই রাও পরিবারকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করান। সেখানেই ইতি হয়নি। কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রয়াত নেতাকে অমর্যাদা প্রদর্শনে বেনজির কাণ্ড ঘটিয়েছিল। ২৪ ডিসেম্বর সামরিক বাহিনীর শকটে তার মৃতদেহ হায়দরাবাদের উদ্দেশে বিমান বন্দরে রওনা দেয়। যাওয়ার পথে এআইসিসির সদর দফতর ২৪ আকবর রোডে ঢুকতে দেওয়া হয়নি তাঁর মরদেহ। প্রথা অনুসারে কংগ্রেস নেতাদের মরদেহ দলের কর্মী সমর্থকদের অন্তিম শ্রদ্ধা অর্পণের জন্য সদর দফতরে রাখা হয়। সনিয়ার নির্দেশে তাও সম্ভব হয়নি।
কংগ্রেসের সেই উপেক্ষিত নেতার শতবর্ষ উদযাপনের ডাক দিয়ে সনিয়া বাহিনীকে যে মোদী এমন প্যাঁচে ফেলে দেবেন, সেটা বিলক্ষণ আঁচ করতে পারেনি হাইকমান্ড। অগত্যা, চাঁদ সওদাগরের মতো বাঁ হাতে মনসার পুজো করার মতো তিক্ত কাজটি করতে বাধ্য হলেন কংগ্রেস সভানেত্রী। যেন কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে তাঁকে। তাই দেশের অর্থনীতির সংস্কারে নরসিংহ রাওয়ের ঐতিহাসিক অবদানের কথা স্মরণ করে তাঁর শতবর্ষ উদযাপনে তৎপর হয়ে উঠেছেন সনিয়া-রাহুল ব্রিগেড। তবে মুখে তাঁরা যতই রাও সম্পর্কে মধু ঝরান, আদতে মোদী জুজুর ভয় থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে কংগ্রেস যে দিশাহারা, সেটা ফের প্রকট হয়ে পড়েছে।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news