দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ কলাম
:
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ দেখে মানুষ তৃণমূলকে ভোট দেয়, মুকুল কোনও ফ্যাক্টর নয়।
মুকুল রায়ের বিদায়ের পর তৃণমূলের বড়-মেজ-সেজ-ছোট নেতাদের তো বটেই এমনকি কাল কা যোগীদের মুখেও এখন এই এক কথা।
কিন্তু সত্যিই কী তাই!
একটা সময় ছিল যখন মমতার মুখ দেখে জনসভায় ভিড় হত কিন্তু ভোট হত না। যদি শুধুমাত্র মুখেই ভোট হত তাহলে সম্ভবত ক্ষমতায় আসার জন্য ২০১১ পর্যন্ত ওয়েটিং রুমে বসে থাকতে হত না তৃণমূল কংগ্রেসকে। ২০০১-এই সে কম্ম সারা হয়ে যেত! তা হয়নি। তার মানে কি এই যে মমতার ভাবমূর্তিতে ভোট আসে না? অবশ্যই আসে, তবে সে ভোট জেতায় না।
২০০১-এ জেতায়নি, ২০০৬-এ জেতায়নি। ২০১১-তে বাড়তি যে ভোট মমতার দিকে এসেছে তা ভাবমূর্তির নয়। এমনকি বামেদের ভোটও সেবার এসেছে মমতার দিকে। এর সঙ্গে মমতার মুখের কোনও সম্পর্ক নেই। ‘সততার প্রতীক’ প্রচারের কোনও সম্পর্ক নেই। আছে সংগঠন এবং নির্বাচন মেশিনারি। যে দুটি বস্তুর কোনও অস্তিত্বই তৃণমূল কংগ্রেসের গোড়ার দিকে বা তার পরেও অনেকদিন ছিল না।
নিজেকে অত্যন্ত লো প্রোফাইলে রেখে, নিভৃতে প্রচার এড়িয়ে, সকাল এগারোটা থেকে রাত দুটো পর্যন্ত পরিশ্রম করে এই কাজটি যিনি করেছেন তিনি মুকুল রায়। তৃণমূলে এখন যাঁরা দিদি ভোলানো ছড়া আওড়াচ্ছেন তাঁরাও খুব ভালভাবে জানেন, কথাটা কি নিদারুন সত্যি।
ভোট মেশিনারি এখন তৈরি, সংহঠন এখন তৈরি। সাজান বাগানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাদের দিয়ে জলসা করাবেন এটা তাঁর ব্যাপার। দলে জন্য যাঁরা ঘাম রক্ত দিয়েছেন তাঁরা দলে সম্মান ও গুরুত্ব পাবেন নাকি রক্তের সম্পর্ক সেই জায়গাটা উত্তরাধিকার হিসেবে দখল করবে, সেটাও তাঁর ব্যাপার। তাবলে এতদিনের সত্যিটা মিথ্যে হয়ে যাবে কী!
পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে দিয়ে দলনেত্রী মুকুল রায়কে আক্রমণ করাচ্ছেন। এই ধরণের আক্রমণ করার কাজ তিনি পার্থকে দিয়েই করিয়ে থাকেন। সে প্রণব মুখোপাধ্যায় হোন বা মানস ভুইঞা, কিংবা লক্ষণ শেঠ হোন বা গৌতম দেব। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ও নিজেকে অনুগত সৈনিক বলে পরিচয় দিয়ে এই কাজটি নিপুণ ভাবে করার চেষ্টা করেন। এমনিতে নিজের যোগ্যতাকে মিনিমাইজ করে আর বিশ্বাসযোগ্যতাকে ম্যাক্সিমাইজ করে দলের মহাসচিবের পদটি ধরে রেখেছেন পার্থ। ব্যক্তিগতভাবে ভদ্র, কর্পোরেট মানুষটির কী আক্ষেপ নেই! তাঁর থেকে তাঁর চেনা পরিসর, শিল্প মহল থেকে সরিয়ে শিক্ষাঙ্গনে ঠেলে দেওয়ার অপমান কী তিনি ভুলতে পেরেছেন! তবু যদি দেখা যেত বর্তমান শিল্পমন্ত্রী উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পেরেছেন, তাহলেও একপ্রকার হত!
তাঁর কাকা ছিলেন নকশাল। ঝোড়ো সময়ে পুলিশের মার খেতে খেতে, মুখ থেকে রক্ত তুলে মারা গেছিলেন, তবু কমরেডদের নাম বলেনি। তিনি হলেন, সুব্রত বক্সী। সৎ, বড় হদয়, ভালবাসতে জানেন প্রাণ দিয়ে। অল্পেতেই মাথা গরম করেন। দীর্ঘ সময় দলের রাজ্য সভাপতি এখন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। বড় জনসভায় কর্মীদের জন্য খিচুড়ি রান্নার দেখভাল করেই রাজনৈতিক জীবনের একটা বড় সময় কাটিয়ে দিলেন। ইদানীং সতত বিরক্ত থাকেন। সাক্ষাৎকার তো দুরের কথা কোনও প্রশ্ন করতে উদ্যত হলেই বলেন, ফোন রাখছি। অনেকে বলেন, দলে তিনি অব্যবহৃতই রয়ে গেলেন! তাঁর যোগ্যতা কাজেই লাগান হল না!
মুকুল রায়ের ক্ষুরধার রাজনৈতিক মস্তিষ্কের সঙ্গে এঁদের তুলনা অনেকেই করতে চাইবেন না। তবে নিজেদের মত করে এঁরাও যোগ্য। তাঁদের আনুগত্যের আতিশয্যে যোগ্যতা চাপা পড়ে গেছে।
তাঁরা সারসত্য বুঝেছেন, যে দলে যোগ্যতার চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যতার দাম বেশি, সেই দলে নিজেকে নেত্রীর ইচ্ছামত আকারে ও আয়তনে বনসাই করে রাখাই ভাল!
তৃণমূলে মুকুল – পার্থ – বক্সী , ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর নামে খ্যাত। ঘটনাচক্রে মুকুল মমতার মত বটবৃক্ষ না হলেও এক মহীরুহে পরিণত হয়েছেন। বাকি দুজন তাঁদের স্বাভাবিক বৃদ্ধিও নিয়ন্ত্রণ করেছেন, বুঝতে চেয়েছেন নেত্রী ঠিক কতটা চাইছেন!
মমতার বাগান থেকে মহীরুহ -মুকুল আজ পাড়ি দিলেন অন্য বাগানে। এখানে তাঁকে ধরছে না!
দলে আর মুকুলের মত রাজনৈতিক মস্তিষ্ক রইল না। জননেত্রীর ভাবমূর্তি বা ‘মমতার মুখ’, যা দেখে মানুষ ভোট দেয় বলে তৃণমূলের দাবি, আর স্বেচ্ছায় সংকুচিত পার্থ-বক্সীর মত অনুগত দুই সৈনিককে নিয়ে তৃণমূলের নবপর্যায় শুরু।
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news