কিশোর ঘোষ:
৯৫ বছর বয়স হয়েছিল। অর্থাৎ বয়সের ভারেই প্রয়াত হলেন মৃণাল সেন। কিন্তু খবরটা জানার পর কুটিল মন প্রশ্ন তুলল— ভদ্রলোক মারা গেলেন না ‘আমাদের’ সঙ্গ ত্যাগ করলেন! ‘আমাদের’ মানে?
আমাদের মানে আমরা—‘মধ্যবিত্ত’ বাঙালি সংস্কৃতি।
মধ্যবিত্ত না বলে নিম্নবিত্ত বললেও খুব ভুল বলা হয় না। না, তাই বলে কাউকে আক্রমণের উদ্দেশ্যে এ গদ্য নয়। কারণ এই আমিই তো আক্রান্ত! কীভাবে সেটাই বলি। এই যে চলচ্চিত্র নিয়ে দু’কথা বলার অধিকার হল, এর এক কারণ টানা বছর ছয়েক এক বহুল প্রচলিত দৈনিকপত্রের শিল্প ও সংস্কৃতি বিভাগের দায়িত্ব সামলেছি। সেই কাজ করতে গিয়ে আমাকে প্রচুর সিনেমা দেখতে হয়েছে এবং সেই সিনেমা নিয়ে লিখতে হয়েছে। কিন্তু সেটাও আসল কথা না, আসল কথা হল আমাকে অসংখ্য খারাপ, কুৎসিত, নোংরা, ভয়ঙ্কর, কিম্ভুত, বিচ্ছিরি, বিদ্ঘুটে সিনেমা দেখতে হয়েছে। তারপর সেইসব সিনেমা নিয়ে ‘গুছিয়ে’ লিখতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, অনেক ক্ষেত্রেই সেই সব সিনেমা ও সিনেমাওলাকে ‘ক্ষমা’ করতে হত! অবশ্য এই ‘ক্ষমা’ ব্যক্তিগত না, বরং ‘নিউজ লাইন’। যাই হোক, হত এরকম—ধরুন, এক ক্যালেন্ডার ইয়ারে ৫০টা সিনেমা দেখতাম। তার মধ্যে প্রাণভরে প্রশংসা করার মতো সিনেমা পেতাম অর্ধেক। অর্থাৎ বাহান্ন সপ্তাহের প্রতি শুক্রবারে যত ছবি মুক্তি পেত তার মধ্যে কোনওক্রমে এক সিনেমার একটি অংশ হয়তো চলচ্চিত্রের শিল্পের বিচারে ধোপে টেকে। এখন আপনি বলতেই পারেন, আমি কে? সিনেমার কী বুঝি? এত লোক ভাল বলছে! বাংলা সিনেমা কত্ত এগিয়ে যাচ্ছে! তা ঠিক। কিন্তু আমাকে যে ঝামেলায় ফেলে দিয়েছিলেন তিন বাঙালি জিনিয়াস।

সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক ও মৃণাল সেন। আমি যখন ফিল্ম রিভিউ শুরু করি ততদিনে এদের সিনেমা দেখে ফেলেছি। (কুরোসোয়া, ফেলিনি, আইজেনস্টাইন, গদার, ভিক্টর ডিসিকা, মাজিদি, কিম-কি-দুক, পানাহি, তারান্তিনোদের মতো বিদেশিদের প্রসঙ্গ আপাতত তোলা রইল)। ফলে সমস্যা হল—সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’ বা ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ কিংবা ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ দেখার পর, ঋত্বিক ঘটকের ‘অযান্ত্রিক’ বা ‘কোমলগান্ধার’ কিংবা ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ দেখার পর, মৃণাল সেনের ‘বাইশে শ্রাবণ’ বা ‘ভুবন সোম’ কিংবা ‘আকালের সন্ধানে’ দেখার পর এদের (এখনকার ‘মহান’ পরিচালকদের) সিনেমা দেখে মনে হত, ব্যাটার কানের গোড়ায় সপাটে দিই। ধরুন, এখনকার এক ঘ্যাম পরিচালকের সিনেমা দেখলাম। যাঁর সিনেমা নিয়ে পাতার পর পাতা খরচ করে থাকে সংবাদপত্রগুলো, টিভিতে যে পরিচালকের নখ কাটার এক্সক্লুসিভ দেখানো হয়, যেহেতু সে ‘বিরাট’ ডিরেকটর। অথচ সেই তাঁর সিনেমা দেখার পর মনে হত—আয় শয়তান, তোর কান ধরে ওঠবোস করাই। মাল্টিপ্লেক্সে দু’ আড়াই ঘণ্টা কাটিয়ে বাইরে চা আর সিগারেট খেতে খেতে বার বার সবচেয়ে বেশি যেটা মনে হত—এরা সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল দেখেনি নাকি! এদের কি মনে হয় না, ওঁদের পরের প্রজন্ম আমরা। তার মানে এর পরের ধাপে যেতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। সবচেয়ে বড় কথা মিনিমাম সিনেমা বানানোটা তো শিখতে হবে রে ভাই! সেটা পারলে তারপর জানতে হবে ‘নিজের ছবি’ তৈরির কৌশল। মনে পড়ল, ভারতীয় চলচ্চিত্রের ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথও চেষ্টা করেছিলেন সিনেমা বানানোর। নিজের বেশ কয়েকটি গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্যকে ছবির রূপ দিতে গিয়েছিলেন। হয়নি। সবার সব হয় না, ওঁর সিনেমাটা হয়নি। কিন্তু সেই অসফল অভিজ্ঞতা তাঁকে দিয়ে বলিয়ে নিয়েছিল সিনেমা সম্পর্কিত গোড়ার কথা—চলচ্চিত্র শিল্প যেদিন আপন ভাষা খুঁজিয়া পাইবে, সেইদিন সে আপন আসনে স্বগর্বে অধিষ্ঠিত হইবে।

স্বাধীনতার পরে পরে, গত শতাব্দীর পাঁচের দশকে সেই কাণ্ড ঘটল। বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের সেই ত্রিমাত্রিক অধিষ্ঠান হল সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক। সত্যজিৎ অভিজাত, ঋত্বিক মেঠো আর মৃণাল নাগরিক।
মৃণাল সেনের সিনেমা মানেই মানুষ ও সভ্যতার কুয়াশা-সম্পর্ক। এসব কথা পুরনো। সবার জানা। অধিকাংশই জানেন, ছাত্র বয়সেই কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখার সঙ্গে যুক্ত হন মৃণাল। পরে হন আইপিটিএ-র সদস্য। এর ফলেই মৃণালের গায়ে সেঁটে গেছে বামপন্থী চলচ্চিত্রকারের তকমা। কিন্তু হায়, মৃণাল সেনের সিনেমা যাঁরা দেখেছেন, বাম আদর্শবাদী হয়ে নয়, সিনেমাকে সিনেমা হিসেবেই যাঁরা দেখছেন, তাঁরা জানেন শিল্পবিপ্লবকে বাদ দিয়ে সমাজবিপ্লবের পথে হাঁটেননি মৃণাল। যদি তাই-ই হত তাহলে শোষক ও শোষিতের গল্প বলেই দায় সারতে পারতেন পদ্মভূষণ পরিচালক। কিন্তু না, আমরা দেখি মৃণাল সেনের ক্যামেরা গল্পের স্বাভাবিক ধাঁচা ভেঙে দেয় বার বার। প্রথাগত স্ক্রিপ্টকে চ্যালেঞ্জ করে। জীবনের আকস্মিকতাকে বোঝাতে আচমকা কিছু দৃশ্যের আবির্ভাব মৃণালের সেনের সিগনেচার। এইসঙ্গে ঋত্বিক ও মৃণাল ক্যামেরাকে ব্যক্তিচরিত্র করে তোলেন দরকারে। ঋত্বিকের অযান্ত্রিক দেখলে যেমন মনে হয়। সত্যজিৎ-এর ক্যামেরা আবার ক্লাসিক দ্রষ্ট্রা। মৃণালের শিল্পী মন যেন কখনও সত্যজিৎ, কখনও ঋত্বিক! তাঁর ক্যামেরা কখনও চরিত্র, কখনও দূরে সরে যাওয়া সাক্ষীভাব। যাক গে। এসব উচ্চবিত্তের চেতনা। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনদের মতো উচ্চবিত্তের বোধ। আমরা এসবের মধ্যেই নেই।

আমরা ঝুটঝামেলায় থাকি না। আমরা মাল কামাতে চাই। তাই বেছে বেছে ইন্ডাস্ট্রির স্টারদের কাস্ট করি। দুম করে মৃগয়ার জন্য আনকোরা মিঠুন-মমতাশঙ্করকে নিয়ে ছবি করার প্রয়োজন দেখি না। স্টার ইজ নিডেড। কারণ গল্প ফসকালেও, পরিচালনা হড়কালেও স্টার নায়ক বা নায়িকাকে দেখতে হলে লোক আসবে। মাঝে মাঝে সাহিত্যের গল্প নিয়েও সিনেমা বানাই। আঁতেল সাজি। আমরা আসলে পাকেচক্রে সিনেমা করিয়ে। হতে পারতাম মাছের আড়তের বাঘা ব্যবসাদার, বড়বাজারের পেটমোটা গদিওলা, কিংবা নামকরা চিটফান্ডের চিটিংবাজ মালিক। তবে আমাদের ইচ্ছেটা ইন্টারেস্টিং—কামাব পয়সা কিন্তু কমার্সিয়াল তকমাটা গায়ে লাগতে দেব না। দাড়ি পাকিয়ে, চুল উস্কোখুস্কো করে, সিক্স পকেট প্যান্টের উপর পাঞ্জাবি গলিয়ে রুচিশীল পরিচালক সাজব খুব। উঠতি নায়িকাদের সঙ্গে হেঁটে, বসে, শুয়ে কাটিয়ে দেব আমাদের বিন্দাস জীবন।
এই ‘আমাদের’, মধ্যবিত্ত আমাদের সঙ্গ ত্যাগ করলেন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র শিল্পের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচালক মৃণাল সেন।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news