পার্থসারথি পাণ্ডা:
আদর্শ নত হতে দেয় না। তাই আদর্শবাদী শিল্পীমাত্রেই অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হন। অন্তত বাঙালির ইতিহাসে সেটাই দস্তুর। চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটক, মৃনাল সেনও তার ব্যতিক্রম নন। ঋত্বিকের সংসারে সেই সংকটের উত্তরণ কোনদিন ঘটেনি। মৃনাল সেনের দীর্ঘ জীবনে এক সময় সেই সংকট অবশ্য মিটে ছিল। মৃনাল সেনের পুত্র কুনাল সেনের স্মৃতি চারণায় আমরা জানতে পারি সেই সংকটকালের দিনগুলোর কথা।
বাবাকে কুণাল ডাকতেন ‘বন্ধু’ বলে। হ্যাঁ, বন্ধু বলতে যা বোঝায় তাই ছিলেন তিনি। খুব ছোট্ট বেলার কথা, তখন কুণালের বয়স আর কত হবে, এই পাঁচ-ছয়। সেই তখনকার কথা বলছিলেন একদিন তিনি, একটি রেডিও চ্যানেলে। সেই বয়সে কুণাল খুব ভালোবাসতেন সন্দেশ খেতে। বাড়িতে তিনটে লোক, তবুও অভাব। সেই অবস্থায় সবার জন্য সন্দেশ আনাটা হঠকারিতা, আবার এক আধদিন ছেলের মুখে একটা সন্দেশ তুলে দিতে না পারাটাও বাবা-মার জন্য বড় কষ্টের ছিল। তাই বাড়িতে এক আধদিন সন্দেশ আসত। একটাই। কুণালের জন্য। ছোট্ট কুণালের খুব আনন্দ হতো পছন্দের জিনিসটি হাতে পেয়ে। শিশুসুলভ সেই আনন্দে নাচতে নাচতে তিনি যখন সন্দেশ খেতেন, তখন ঝরে ঝরে মেঝেয় পড়ত সন্দেশের গুঁড়ো। বন্ধু সেই গুঁড়ো কুড়িয়ে কুড়িয়ে খেতেন। সেই ছবিটা ছোট্ট কুণালের মনে গাঁথা হয়ে ছিল, পরে বুঝেছিলেন বন্ধুও সন্দেশ খুব পছন্দ করতেন, কিন্তু খাবার কোন উপায় ছিল না তখন!

আর একদিনের কথা। সেদিন বাড়িতে চাল নেই। কারণ, চাল আনার টাকা নেই। মৃণাল আর তাঁর স্ত্রী গীতা না হয় না খেয়েও থাকতে পারেন, কিন্তু ছোট্ট কুণালকে না খাইয়ে কেমন করে রাখবেন! মৃণাল বেরোলেন, কারও কাছে কিছু টাকা ধার যদি পাওয়া যায়, তারই সন্ধানে। ধার পেলে চাল কেনা হবে। গীতার মনেও আশা হল, মৃণাল যখন বেরিয়েছেন কিছু একটা ব্যবস্থা হবেই হবে। তিনি কয়লার উনুন জ্বেলে হাঁড়িতে জল বসিয়ে দিলেন। চাল আনতে আনতে জল গরম হয়ে থাক। তখন চাল ফেললে ভাত হতে দেরি হবে না। জল টগবগ করে ফুটতে শুরু করল, মৃণালের তখনও দেখা নেই।
ওদিকে মৃণাল তো বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। কিন্তু কার কাছে যাবেন টাকা চাইতে? কাকে বলবেন, আমার হাঁড়ি চড়ছে না, টাকা দাও! কেউ নেই। বন্ধুরা যারা আছেন, তাঁদের তখন নিজেদেরই চালচুলো নেই, পকেট গড়ের মাঠ। আর তাছাড়া মৃণাল কারও কাছে হাত পাততে শেখেননি, ছেলের মুখ চেয়ে হয়তো এবার হাত পাততে হবে। বন্ধুদের কাছে চাইতে দোষ তো নেই। অনেক দ্বিধা মনে, অনেক দ্বন্দ্ব! শেষ পর্যন্ত দ্বিধারাই জিতে গেল। পারলেন না, কারো কাছে হাত পাততে পারলেন না। কেটে গিয়েছিল অন্নহীন একটা দিন!

এমনি করেই সমগ্র পাঁচ আর ছয়ের দশকের দীর্ঘ দিনগুলি ও রাতগুলি কেটেছিল মৃণাল সেনের। তারপর সামান্য উত্তরণ। তবু মানুষটা প্রয়োজনের বাহানায় সহজ পথে গা ভাসিয়ে দেননি। আজীবন দারিদ্র্যের সঙ্গে আপোষহীন লড়াই আর আদর্শের সঙ্গে শিল্পের গাঁটছড়া বাঁধতে বাঁধতে নির্মাণ করেছেন ‘একদিন প্রতিদিন’, ‘খারিজ’, ‘বাইশে শ্রাবণ’, ‘পদাতিক’, ‘আকালের সন্ধানে’-র মতো কালজয়ী সব চলচ্চিত্রমালা। যাপন ও ভাবন একসঙ্গে না মিললে এ জিনিস হয় না।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news