কিশোর ঘোষ:
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল, ভেতরে ‘জলপাই কাঠের এসরাজ’ পড়ছিলেন মৃদুল দাশগুপ্ত। পড়ছিলেন ‘এভাবে কাঁদে না’ থেকে, অথবা ‘সূর্যাস্তে নির্মিত গৃহ’ কিংবা ‘গোপনে হিংসার কথা বলি’, কখনও বা ‘সোনার বুদবুদ’-এর একটি দুটি তিনটি। এদিকে দর্শক-শ্রোতা সম্মোহিত। কারণ এলোমেলো এক অতীতের ভেতর পথ হারিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ দর্শক-শ্রোতা! কারণ ইতিমধ্যে মিথ হয়ে ওঠা বঙ্গ কবিতার অবিস্মরণীয় পংক্তিমালা পড়ছেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা। সবটা মিলিয়ে যেন এক ক্ষীণ শ্রাবণ সন্ধ্যার অলৌকিক জলযান!
আসলে সোমবার, ২৯ জুলাই সন্ধ্যায় নন্দনচত্ত্বরে জীবনানন্দ সভাঘরে ছিল মৃদুল দাশগুপ্ত’র একক কবিতাপাঠ। আয়োজক সপ্তর্ষি প্রকাশন। ঘন্টা দুয়েকের অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবিকে নিয়ে বললেন পরবর্তী প্রজন্মের উজ্জ্বল কবি বিভাস রায়চৌধুরী। ঘর ভরিয়ে হাজির ছিলেন বিশিষ্ট কবি থেকে সাধারণ পাঠক। মৃদুলের সমসাময়িক রণজিৎ দাশ, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অনেকেও। যাঁদের চারপাশ উড়ছিল রক্ত চলকে ওঠা পংক্তিমালা। কবি তো নিজেই ঘোষণা করেছিলেন—‘আমি মৃদুল দাশগুপ্ত, আমি আরব গেরিলাদের সমর্থন করি’। বাংলা কবিতার আবহমান ইতিহাস ভুলতে পারে না বরানগরের গঙ্গাঘাটের সেই মর্মান্তিক কাব্যদৃশ্যপ্রতিবাদ! মৃদুল কেন বলেছিলেন, ‘আমরা’ কি বাজাব না জলপাই কাঠের এসরাজ! বলেছিলেন হয়তো এইজন্য, যেহেতু একেকটি ভাষায় এমন একেকজন কবি এসে পড়েন আচমকা, যাঁরা সময়ের ক্ষতবিক্ষত আঙুলে সমগ্রের এসরাজ বাজান মৃত্যু অবধি সুর টান টান রেখে। সকলের মুখপাত্র হয়ে ওঠাই কি মহৎ কবির লক্ষণ? উপনিষদ তেমনটাই বলে। (বলে, ঈশ্বরের মুখপাত্র কবি। এখানে ঈশ্বরকে এক্সিসটেন্স হিসেবে ধরলে যাঁদের সুবিধা হয়, তাঁরা তাই ধরুন।) তাই তো এই সেদিনও প্রতিবিপ্লবে মৃদুলকে লিখতে হয়—‘রাজা ধানক্ষেতে ছুটিয়েছে/ ঘোড়া/ হতাহত পড়ে আছে/ কেউ বা বুলেট বেঁধা/ কেউ আধপোড়া’।

কবিতাপাঠের সঙ্গে সঙ্গে এদিন সাতের দশকের শুরুতে ঘুরতে নিয়ে যান মৃদুল আমাদের। তাঁর কৈশোর, যৌবনের কবিতাযাপন বলেন কিছু। মনে করেন স্কুলবেলা, কলেজবেলার দিনগুলি, রাতগুলি। মৃদুল ও তাঁর সমসাময়িক বন্ধুরা যখন বাংলা কবিতার অনন্ত নদীটিতে আপন আপন নৌকো নামিয়ে ফেলেছেন, তবে বেশিদিন হয়নি। সে সময় জীবিত বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে। কিন্তু কিছুটা তরুণকবির আত্মশ্লাঘায়, কিছুটা পাকেচক্রে তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি বলে মৃদু আক্ষেপ মৃদুলের। আবার আনন্দ করে বলেন, প্রেমেন্দ্র মিত্রর সঙ্গে অপূর্ব প্রথম আলাপের কাহিনি। টুকরো টাকরা স্মৃতি রোমন্থনের পর শুরু হয় বাংলা কবিতার অহঙ্কার শ্রী দাশগুপ্তের নিরবচ্ছিন্ন কবিতা পাঠ— ‘কৃপাসিন্ধু বরাবর। করুণাবৃক্ষের ডালে অবিকল অন্তর্বাস আলো-আঁধারির’ বা ‘বয়েস হয়েছে। তবু, গোপন হাসির সব রেণু/ জলপথে শূন্যগামী। কী বলি অধিক, তুমি/ ওই দেখো, মাঝির উনুন…’, অথবা ‘নিয়তি ব্রাহ্মণকন্যা, একদিন অন্ধকারে পথপার্শে পেয়ে/ রাত্রি অসম্ভব জ্ঞানে বায়ুপথে শকটে তুলেছি’। এভাবে আলগোছে সাতের দশকে শুরু হওয়া এক গান এগোতে থাকে জোনাকির মতো নিরন্তর নেভা-জ্বলা পথে। যে গান মৃদুল ছাড়া আর কারো পক্ষে গাওয়া (পড়ুন—লেখা) সম্ভব ছিল না হয়তো।
সোমবার পাঠের মাঝে বেশ কয়েকবার থমকান কবি। দর্শক শ্রোতাকে যাচাই করেন! গোপন খাঁচায় পোষা অভিমানেই কি ঘুরেফিরে বলেন, এই যে এত কবিতা পড়ছি আপনাদের অসুবিধা হচ্ছে না তো। যদিও ঘন্টা দু’য়ের অনুষ্ঠানের দেড় ঘন্টা দখল করে মৃদুল দাশগুপ্তের কবিতারা, তথাপি সময় ম্যাজিকের মতো ফুরোয়।
একদম শেষকালে কবি তাঁর আগামী গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি থেকে বেশ কয়েকটি শোনান। তার একটি কবিতা আবার দাশগুপ্ত বাড়িরই এক বিশালাকার প্রাচীন কাঠের বাক্স নিয়ে। বলা বাহুল্য যা কিছুটা রহস্যময়। আসল কথা হল, সেই মহাবাক্সে মৃদুল একটি একটি করে শতটি কবিতা জমানোর সংকল্প নিয়েছেন বাস্তবিক। তারপরই প্রকাশ করতে চান আগামী বই। মহাবাক্স নিয়ে লেখা সে কবিতা শোনার পর, অনুষ্ঠান শেষে জীবনানন্দ সভাঘর ছেড়ে বৃষ্টি ভেজা নন্দন চত্ত্বরের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে টের পাওয়া যায়—পিছু নিয়েছে মৃদুল দাশগুপ্তের আশ্চর্য কবিতা। শেষপাতে পড়া যেতেই পারে সেই মরমী কাব্য—
গুপ্তপুঁথি-জ্ঞানে আমি দিয়ে যাব পাণ্ডুলিপিখানি
বিরাট কাঠের ওই পেটিকায় রেখে দিও গৃহে, এক কোণে
সযত্নে কিছুটা কাল, ক্রমে তুমি ভুলে যাবে, জানি।
কী আছে ভিতরে শুধু ভাবনাই ঢেউ দেবে মনে
সহজ সরল বাক্সে মনে হবে দাপাদাপি চৈত্রের বিকেলে
কলরব, হট্টগোল, ঘোররাতে ক্ষুধাতুর ক্রন্দনের ধ্বনি
আবার প্রভাতে হাসি খিল খিল—আমাদের একশত ছেলে!
তখন মুদ্রণে দিও, ওরা যেই চেঁচাবে—জননী
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news