কিশোর ঘোষ:
ভারতের চন্দ্রাভিযান পুরো ব্যর্থ না অনেকটা সফল, তা নিয়ে এখন জোর তর্ক দুনিয়া জুড়ে। নিন্দুকদের মতে ব্যর্থ, কারণ বিক্রম নামতে পারেনি চাঁদের মাটিতে। যদিও অরবিটার সঠিক কক্ষেই ঘুরছে বলে জানিয়েছেন ইসরোর বিজ্ঞানীরা। এবং তার সঙ্গে ইসরোর সম্পর্কও রয়েছে। সে আজ থেকে ছবি পাঠানোও শুরু করবে চাঁদ তথা মহাকাশের ওই অংশের। তাছাড়া বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ব্যর্থতা বলে যে কিছু হয় না, সবটাই যে প্রয়োগ ও প্রচেষ্টা, সে কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মজার হল, এই সবকিছুর মধ্যে দিয়ে মিশন চন্দ্রাভিযান ২-কে কেন্দ্র করে ভারতীয় সংস্কৃতির অনন্য চরিত্রটি ফের উজ্জ্বল হয়ে উঠল। যে উজ্জ্বলতা কতকটা বিতর্কীত।
কেন বিতর্কীত? কারণ, গোদা তাত্ত্বিকতায় একাধিক বিরুদ্ধ (contradictory) ভাব রয়েছে মেধাবী ভারতীয় সভ্যতার চরিত্রে । যেমন ধরুন, এবার এও দেখা গেল যে, একজন মহাকাশ বিজ্ঞানী মিশন চন্দ্রযান ২-এর সাফল্য কামনায় মন্দিরে পুজো দিচ্ছেন। দুম করে প্রশ্ন ওঠে, যে বিজ্ঞানী ঈশ্বরের কাছে সাফল্য কামনা করেন তিনি নিশ্চয়ই বিজ্ঞানী হিসেবে ততো আত্মবিশ্বাসী নন। যেহেতু, বিজ্ঞান মানে কার্যকারণ। সেখানে যুক্তিটাই আসল। সেই কাজ না করে ভগবানের পায়ে মাথা ঠুকবেন কেন?
প্রশ্ন সংগত, কিন্তু শুধু কি বিজ্ঞানী মশাই একা? গোটা দেশ যে গতকাল সারারাত প্রার্থনা করেছিল, ভগবান, আমাদের অভিযানটা সফল করে দাও প্লিজ। এসব দেখে অতি যুক্তিবাদী বলতেই পারেন, এদের তালের ঠিক নেই। এরা এক কাজ করছে আর আরেকভাবে চলছে! যাকে বলে ট্রু দ্বিচারিতা। এমনিতে এই মন্তব্যকে ঠিক বলেই মনে হয়। যেহেতু এদেশে ওঝা দিয়ে ভূত তাড়ানোর নামে মানুষ মারার ঘটনা ঘটে, যেহেতু ধর্মকে ব্যবসা হিসেবে কাজে লাগিয়ে বহু মানুষ ‘সফল’। রীতিমতো দু’পয়সা কামিয়ে নিচ্ছে। এবং এরাই মাঝেসাঝে রামায়ণ-মহাভারত-বেদ-পুরাণ ইত্যাদি টেনে, তার চূড়ান্ত অপব্যাখ্যা ক’রে টিভিতে-কাগজে নাম তোলে। ভারতীয় সভ্যতা তথা সংস্কৃতির নামে এমন কিছু করে এরা, যাতে করে নিন্দুকরা নিন্দার সহজ সুযোগ পায়।

এমনিতে পশ্চিমের দিকে তাঁকালেই বোঝা যায়, ভারতকে বোঝেনি বেচারারা। আজও বোঝেনি। আজকের দিনেও তাই ভারতীয় গুরুর কাছে পশ্চিমী শিষ্যদের লম্বা লাইন। যা শুরু হয়েছিল স্বামী বিবেকানন্দের বিখ্যাত শিকাগো বক্তৃতার মধ্যে দিয়ে, সেই ধারাবাহিকতা চলছে। আসলে একটা রহস্য কিছুতেই ভাঙতে পারছে না অভারতীয় সংস্কৃতি। প্রশ্ন হল, বাকি বিশ্বে যখন বিজ্ঞান আর ধর্ম দুটো আলাদা বিষয়। এমনকী একটি অপরটির বিরুদ্ধ চর্চা। সেই বিরুদ্ধতার উপরেই কতকটা নির্ভর করছে তাদের অস্তিত্ব। সেখানে ভারতে ঢুকলেই গুলিয়ে যাচ্ছে রসায়ণ! বিজ্ঞান, ধর্ম, ঈশ্বর, বিশ্বাস, পরম্পরা—সব একেবারে ঘেঁটে ঘ। আশ্চর্য, এদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী শ্রীনিবাস রামানুজন মনে করতেন, তাঁর যাবতীয় সংখ্যাতত্ত্বের আবিষ্কার আসলে দৈব ঘটনা। অঙ্কশাস্ত্রের জগৎবিখ্যাত বিজ্ঞানীর মতে, তাঁর আরাধ্য দেবতার আশীর্বাদেই তিনি স্বপ্নে পেয়েছেন যুগান্তকারী সূত্রগুলি। আবার অপরদিকে দাঁড়িয়ে বিবেকানন্দ মহারাজ। যাঁকে নিখাদ ভারতীয় সন্ন্যাসী বলেই দুনিয়া চেনে। অথচ যাঁর মধ্যে ভোজবাজি তিলমাত্র ছিল না। বরং একরকমের যুক্তিবাদী ছিলেন তিনি। তাই কম বয়সে জীবন গড়তে যে গীতাপাঠের চেয়ে ফুটবল খেলাটা বেশি জরুরি একথা নিশ্চিত করেন। গুরু পরমহংস রামকৃষ্ণের থেকেই হয়তো একাধারে আধ্যাত্মিকতা ও তার্কিক জীবন বিজ্ঞানে দিকদর্শী হয়ে উঠেছিলেন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রতিষ্ঠাতা। তাও রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ তো সেদিনের কথা। উপনিষদের যুগ থেকে দেখে আসলে পশ্চিমের জন্য প্রকৃত পক্ষেই গুলিয়ে যাওয়া বিষয় এই ভারতীয় মেধার চর্চা। কারণ সেখানে ভক্ত তথা সন্ন্যাসীই ‘সাধনা’ করেন বিজ্ঞানের।

মনে রাখতে হবে, এখানে কেবল উপনিষদীয় জীবন দর্শন তথা আর্ট অব লিভিঙের চর্চাকারীদের কথা হচ্ছে না, সেই সঙ্গে রয়েছে সুশ্রুত থেকে ধন্যন্তরী, ধন্যন্তরী থেকে পতঞ্জলীর মতো ঋষিরাও। হ্যাঁ, এরা ঋষি তথা মুনি। আবার এরাই আজকের ভাষায় সায়েনটিস্ট। অতএব, অভারতীয়দের কাছে চমকে দেওয়ার মতো ঘটনাই বটে। বুদ্ধ, মহাবীরের ভারতে তাঁদের মতোই এক বোধিপ্রাপ্ত ঋষি কিনা আবিষ্কার করেন শূন্যের। যে শূন্য আসলে অঙ্কশাস্ত্রের বুড়ো আঙুল, যা না আবিষ্কার হলে থমকে যেত এই পৃথিবীর বিজ্ঞানচর্চা। যাক-গে, আসল কথা হল মহাঋষি বরাহমিহির হলেন প্রাচীন পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। এই বিষয়টা সকলের বুঝে নেওয়া দরকার। অর্থাৎ কিনা ধর্ম তথা আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে বিজ্ঞানের যে বিরোধ রয়েছে পাশ্চাত্যে তার সঙ্গে ভারতীয় সংস্কৃতি কখনই একমত হয়নি। ভারতীয়রা বরাবর মনে করেছেন অনুশীলন অনুশীলনের জায়গায়, তেমনি ঘাসে হাত ছুঁয়ে মাঠকে প্রণাম করাও খেলোয়াড়ের ধর্ম। এই ধর্ম কিন্তু অন্ধবিশ্বাস নয়, বরং কর্মজগতের প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধা।
অতএব, ইসরোর বিজ্ঞানী যদি চন্দ্রাভিযানের সাফল্য কামনায় মন্দিরে পুজো দেন তাতে করে সেই পুরনো ভারতীয় সভ্যতার ঐতিয্যের কথাই মনে পড়ে আমাদের। স্পষ্ট হয় সুশ্রুত, ধন্যন্তরি, পতঞ্জলীর সন্তান আমরা। বিজ্ঞানী যদি বিজ্ঞানকে ঈশ্বর মনে করেন, বিজ্ঞানচর্চাকে ঈশ্বর-সাধনা জ্ঞান করেন তাতে অসুবিধাটা কোথায়? যাঁরা গরুর চোনা দিয়ে মহাকাশ রকেট পাঠায় কথায় কথায়, দয়া করে তাঁদের সঙ্গে মূল ভারতীয় সভ্যতার সংস্কৃতি তথা দর্শনকে গুলিয়ে ফেলবেন না।
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news