নিজস্ব সংবাদদাতাঃ
কবি ও অধ্যাপক ভারাভারা রাও-সহ একাধিক ‘সমাজকর্মী’র গ্রেফতারি ঘিরে তোলপাড় দেশ। জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিদ্বজ্জনদের একটা অংশ। অন্যদিকের প্রসঙ্গটিও কিন্তু ছোট নয়। সেটা সবাই বুঝছেন তো? সন্দেহ হয়!
দেশের প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ষড়যন্ত্র কী ভয়ঙ্কর বিষয় নয়! পাশাপাশি উঠছে দেশপ্রেমের প্রশ্ন। যদিও ভারাভারা রাও, অরুণ ফেরেরা, গৌতম নওলাখা, ভার্নন গঞ্জালভেস, সুধা ভরদ্বাজের মতো কবি, আইনজীবী, লেখকদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণ করতে হবে রাষ্ট্রকে। অর্থাৎ একদিকে যখন কবি, অধ্যাপক, আইনজীবী তথা ‘মানবাধিকার কর্মী’দের একের পর এক গ্রেফতারি নিয়ে সমালোচিত হচ্ছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার, তখন একাধিক প্রশ্নও দানা বাঁধছে।
যেমন, সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ভাবে ভারভারা রাও সহ বাকিদের গ্রেফতার করার সাহস পায় কি করে প্রশাসন? মনে রাখতে হবে যে এঁরা কেউ ‘চুনোপুটি’ না। এই গণগ্রেফতারির পর যে দেশে যথেষ্ট শোরগোল হবে তাও নিশ্চয়ই জানত প্রশাসন। তারপরেও গ্রেফতারির অর্থ কী ডাল মে কুছ কালা হ্যায়! যাই হোক, আসল কথা সব মিলিয়ে টালমাটাল সংবাদ মাধ্যম থেকে সোশ্যাল মিডিয়া। ওঁদের গ্রেফতারির পক্ষে ও বিপক্ষে কাজিয়া চলছে। একদল যখন বিজেপি সরকারকে ফ্যাসিস্ট বলছে, আরেক দল তখন জাতীয় নিরাপত্তার প্রসঙ্গ তুলছে। চ্যানেল হিন্দুস্থানকে গত শতাব্দীর সাতের দশকের অন্যতম প্রধান কবি মৃদুল দাশগুপ্ত বললেন, ‘এটা হল বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের ফ্যাসিবাদি চরিত্র। এ এক ধরনের অঘোষিত জরুরি অবস্থা। ১৯৭৫ সালে ঘোষিত জরুরি অবস্থা হয়েছিল। আর এই সরকার ধাপে ধাপে জরুরি অবস্থা তৈরি করছে। যা করছে ভেবেচিন্তে করছে। ভারভারা রও সহ অন্য মানবাধিকার কর্মীদের গ্রেপ্তারির তীব্র প্রতিবাদ করছি আমি। দেশ জুড়ে প্রতিবাদ আন্দোলন হওয়া উচিত ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার প্রসঙ্গটি গল্পগাথা ছাড়া কিসসু না। যে দেশের নিরাপত্তার জন্য এত সেনা, অস্ত্র সস্ত্র রয়েছে…। আজগুবি অভিযোগ। এরা আসলে বিরুদ্ধ মতের গলা টিপে ধরতে চায়। তাই এই গ্রেফতারি।’
অন্যদিকে ড. জিষ্ণু বসুর মতো সঙ্ঘনেতা বললেন, ‘তথাকথিত কিছু শিক্ষিত মানুষের মধ্যে দেশেপ্রেমের বড় অভাব। ভুলে গেলে চলবে না, যে আজ যাঁরা গ্রেফতার হয়েছেন এই অতি বামেরাই তালিবানদের কাছ থেকে কাশ্মীরের মুজাহিদিনদের মাধ্যমে রেডিওকন্ট্রোল এক্সপ্লোসিভ বা রিমোটকন্ট্রোল এক্সোপ্লোসিভ প্রযুক্তি ভারতে নিয়ে এসেছিল। মোদ্দা কথা, এদেশে অনেক দিন থেকেই একটা বিরাট দেশবিরোধী চক্র কাজ করছে। জেহাদিদের উদ্দেশ্য আর এঁদের উদ্দেশ্যের মধ্যে তফাত নেই। এদের জন্য নরেন্দ্র মোদী খুবই অসুবিধাজনক একজন মানুষ।’
অর্থাৎ সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর। একদিকে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ, অন্যদিকে ফ্যাসিস্ট দমননীতির প্রসঙ্গ। একদিকে রাহুল গাঁধী, সীতারাম ইয়েচুরিরা এই গ্রেফতারির বিরোধিতা করছেন। অন্যদিকে রাহুল গাঁধীকে একহাত নিচ্ছেন কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র বিষয়ক রাষ্ট্রমন্ত্রী কিরণ রিজুজু। তাঁর স্পষ্ট কথা, ‘এই সময়ে রাহুল গাঁধীর রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে দেশের নিরাপত্তার কথা ভাবা উচিত ছিল।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘মাওবাদীরা দেশের অভ্যন্তরীন শান্তি বিঘ্নিত করছে। আর কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধী তাঁদের সহমর্মীদের সমর্থন জানাচ্ছেন।’
আরেকটি প্রসঙ্গ, যা নিয়ে কথা উঠছে না, তা হল ভারভারা রাওদের কিন্তু বিনা অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়নি। ধৃতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ভীমা কোরেগাঁওয়ে দলিতদের সঙ্গে উচ্চ বর্ণের সংঘর্ষে মাওবাদী যোগ তৈরি এবং ওই সংঘর্ষে উস্কানি দেওয়া। যদিও এর আগেও এদের অনেককেই একাধিকবার গ্রেফতার হতে হয়েছে। কিন্তু কোনওবারই অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। আইনজীবী ও সমাজকর্মী প্রশান্ত ভূষণ যেমন জানিয়েছেন, ‘২০০৭ সালে অরুণ ফেরেরার বিরুদ্ধে ইউএপিএ ধারায় চারটি মামলা দায়ের করে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু কোনও অভিযোগই প্রমাণ হয়নি। অথচ পাঁচ বছর তাঁকে জেল খাটতে হয়েছে।’ অবশ্য দাগি অপরাধির বিরুদ্ধে অভিযোগও সব সময় প্রমাণ করা যায় না!
যাই হোক, শেষে একটা বড় প্রশ্ন তোলা যাক—প্রশ্ন হল একদিকে যখন অতিবাম মাওবাদিদের শায়েস্তা করতে গুলি বন্দুক খরচ করছে সরকার। আগে জঙ্গলমহলে, এখনও ছত্তিশগড়ের মতো অঞ্চলে মাওবাদিদের দাপট চলছে। সেখানে ঠিক করে নির্বাচন হতে পারে না। মাইন বিস্ফোরণ, রেল লাইন উপড়ে দেওয়া, খুন অপহরণ চলে। মাঝে মাঝেই খণ্ডযুদ্ধে প্রাণ যায় পুলিশ ও জওয়ানদের, তখন মাওবাদিদের সমর্থনকারী অতিবাম বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না? তা কি একধরনের দ্বিচারিতা নয়?
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news