পার্থসারথি পাণ্ডা:
ডাক নামে নামডাক হওয়ার সৌভাগ্য সকলের হয় না, কারও কারও হয়। যেমন, নগেন্দ্রনাথ সান্যাল বাংলা চিত্রজগতে পাহাড়ি সান্যাল নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন, শচীন্দ্রনাথ বিশ্বাস বিখ্যাত হয়েছিলেন ছবি বিশ্বাস নামে; তেমনি ভারতীয় কন্ঠসঙ্গীতের ইতিহাসে প্রবোধচন্দ্র দে-ও বিখ্যাত হয়েছিলেন মান্না দে নামে।
যাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব মান্না দে’কে মান্না দে হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে, তিনি তাঁর সংগীতজ্ঞ কাকা কৃষ্ণ চন্দ্র দে। ১৯২০ সালের ১ মে হেদুয়ার সিমলে স্ট্রিটের মদন ঘোষ লেনে মান্নার যখন জন্ম হল, তখন কৃষ্ণ চন্দ্রের বয়স সাতাশ বছর। মাত্র তেরো বছর বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ততদিনে কৃষ্ণ চন্দ্র শুধু যে সঙ্গীতকেই জীবনের ধ্যানজ্ঞান করে তুলেছেন এমন নয়, গাইয়ে হিসেবে, থিয়েটারের অভিনেতা হিসেবেও তিনি বিখ্যাত হয়ে উঠেছেন। তাই মান্নার জন্মের আগে থেকেই সেই সময়ের বিখ্যাত পণ্ডিত-ওস্তাদদের আনাগোনায়, বিখ্যাত গায়কদের আড্ডায় গানে গানে বাড়ি একেবারে গন্ধর্ব-গুলজার। ফলে, শুদ্ধ সংগীতের এই আবহে মান্নার কান তৈরি হতে সময় লাগল না।

এর মধ্যে ঘটে গেল একটি ঘটনা। ঘটনাটিকে আশ্চর্য বা অদ্ভুত কিছুই বলব না। কারণ, এটাই হওয়ার ছিল—
বাড়িতে একদিন কাকাকে গান শেখাতে এসেছিলেন বাদল খাঁ সাহেব। একটা বেশ জটিল তান শেখাচ্ছিলেন। বাইরে থেকে সদ্য কিশোর মান্না সেই তানটি শুনলেন এবং শুনে তাঁর ভারি ভালো লাগল। যা ভালো লাগে, তা গেয়ে উঠতে মন তো চাইবেই। তিনিও গেয়ে উঠলেন। শুদ্ধ ভাবে। শুনে অবাক হলেন বাদল খাঁ সাহেব। ডাকলেন তাঁকে। ছোট্ট একটি ছেলে। শুনে শুনেই যে এই ছেলে এমন শুদ্ধভাবে কঠিন তানটি গাইতে পারবে, নিজের কানে না শুনলে এ যেন বিশ্বাস হয় না! তিনি গম্ভীর ভাবে মান্নাকে সেই তান আবার গাইতে বললেন। কিন্তু আড়ালে এক রকম, ওস্তাদের কাছে খুব লজ্জা পেলেন মান্না। তাঁকে তখন বাঁচাতে এলেন কাকা। কাকা আমতা আমতা করে বললেন, শুনে শুনে অনেকটাই তুলতে পারে বটে, ওকে শেখানো তো হয় না…তাই…। ওস্তাদ বললেন, হয় না কেন? শেখানো উচিত, এর হবে! ব্যস, এই হয়ে গেল তাঁর প্রথাগত সঙ্গীতশিক্ষার পত্তন।

এই সময় তিনি একইসঙ্গে কাকার কাছে শিখতে লাগলেন, ওস্তাদের কাছে শিখতে লাগলেন হিন্দুস্থানী রাগ সংগীত। বড়দা প্রণব দে’র কাছ থেকে শিখে নিলেন নোটেশন লেখার কৌশল। এরই মধ্যে স্কুল পেরিয়ে ঢুকলেন গিয়ে স্কটিশ চার্চ কলেজে। আড্ডা জমল লাস্ট বেঞ্চে। সেখানে বসে চলতে লাগল বন্ধুদের সঙ্গে বেঞ্চ বাজিয়ে গানের চর্চা। সবাই জানে দারুণ গান মান্না। কথাটা উঠল গিয়ে প্রিন্সিপাল কানে। সামনে ইন্টারকলেজ গানের কম্পিটিশন। প্রিন্সিপাল চান মান্না এতে কলেজের হয়ে অংশ নেন। কিন্তু মান্না জানালেন কাকা তাঁকে এখনই বাইরে গাইতে দিতে চান না, তবে প্রিন্সিপাল যদি তাঁর অনুমতি আনতে পারেন, তবে মান্নার আপত্তি নেই। প্রিন্সিপাল কাকার কাছ থেকে সম্মতি আদায় করতে পারলেন বটে, তবে একটাই শর্তে, কম্পিটিশনের প্রতিটি বিভাগে অর্থাৎ ধ্রুপদ, খেয়াল, গজল, ফোক প্রভৃতি দশটি বিভাগেই মান্নাকে নাম দিতে হবে এবং জিতে আসতে হবে। বেশ, তাই তো তাই। কথা রেখেছিলেন মান্না। পর পর তিন বছর দশটি বিভাগেই প্রথম হয়ে কাকার মুখ উজ্জ্বল করেছিলেন।বাবা পূর্ণ চন্দ্র চেয়েছিলেন ছেলে পড়াশুনো শিখে উকিল হবে, কিন্তু মান্না চেয়েছিলেন মিউজিক ডিরেক্টার হতে। আবার বিধি চাইলেন অন্যকিছু। মিউজিক ডিরেক্টার হওয়ার ইচ্ছে নিয়েই কাকার ওয়াসিস্ট্যান্ট হয়ে কালী ফিল্মস আর নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওতে আসাযাওয়া শুরু করলেন। ততদিনে ফিল্মের গায়ক-অভিনেতা এবং সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাকা কৃষ্ণ চন্দ্রের খুব নাম হয়েছে। সেটা ১৯৪২ সাল। এই সময় বোম্বে থেকে চিমন লাল ত্রিবেদী কলকাতায় এলেন। তিনি কলকাতা থেকে ভালো ভালো শিল্পী ও টেকনিশিয়ান বোম্বে নিয়ে যেতে চান, সেখানে তিনি একটি ফিল্ম প্রোডাকশন হাউস খুলবেন এবং ছায়াছবি তৈরি করবেন। তিনি কৃষ্ণ চন্দ্রকেও ধরলেন সেখানে যাবার জন্য। কৃষ্ণ চন্দ্র রাজি হলেন। তাঁর সঙ্গে সহকারী হিসেবে বোম্বে এলেন মান্না। ত্রিবেদী চালু করলেন লক্ষ্মী প্রোডাকশন কোম্পানি। তৈরি হল কোম্পানির ব্যানারে প্রথম ছবি ‘তামান্না’। পরিচালনা করলেন এক বাঙালি পরিচালক– ফণী মজুমদার। সঙ্গীত পরিচালনা করলেন কৃষ্ণ চন্দ্র, সহকারী মান্না দে। এই ছবিতে মান্না যে শুধু সহকারীর কাজ করলেন তাই নয়, প্লেব্যাকও করলেন। সুরাইয়ার সঙ্গে, ডুয়েট। ‘জাগো আযি ঊষা’। এই প্রথম গানের ভাষাই সেদিন যেন ঘোষণা করে দিলো, ভারতবর্ষ এক নতুন ও বহুমুখী প্লেব্যাক সিঙ্গার পেয়ে গেছে, সূচিত হয়ে গেছে ভারতীয় সঙ্গীতের নতুন ভোর। গৌরবের দিন। ইতিহাসের শুরু। পরের দশকগুলো সেই গৌরবময় ইতিহাসেরই সাক্ষী!
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news