পার্থসারথি পাণ্ডা : 
শলাকার এক খোঁচায় মনসাকে কানা করে দিলেন চণ্ডী। মা দুর্গার আর এক নাম চণ্ডী। তখন তাঁর চণ্ড রূপ। সদ্য খুঁজে পাওয়া মেয়ে মনসাকে ঘরে রেখে মহাদেব বেরিয়ে গেছেন। তাঁরা যখন আসেন চণ্ডী তখন ঘরে ছিলেন না। ফিরে এসে সুন্দরী সুরূপা মনসাকে দেখে ভেবে বসলেন বুড়ো বয়সে মহাদেবের ভীমরতি হয়েছে, ঘরে সতীন এনেছেন। অমনি তাঁর মাথা গরম হয়ে গেল। মুখ থেকে ছুটল অকথা-কুকথার বন্যা। মনসাও মাকে চেনেন না। ফলে মুখের ঝগড়া হাতাহাতিতে গিয়ে পৌঁছল। এমনই এক মুহূর্তে হাতের কাছে একটা শলাকা পেয়ে তাই দিয়ে মনসার একটা চোখে আঘাত করলেন চণ্ডী। সুন্দরীর গুমোর নষ্ট করতে তাঁকে কানা করে ছাড়লেন! অথচ শুরু থেকেই মনসার কিন্তু কোন দোষ ছিল না। তাহলে চণ্ডী তাঁর ক্ষতি কেন করলেন? একজন দেবী হয়ে? কেন তিনি দৈব জ্ঞানে বুঝলেন না, মনসা তাঁর সতীন নয়, স্বামীসূত্রে মেয়ে?
আসলে এর আগে চণ্ডী যখন তাঁর মানসপুত্র গণেশের জন্ম দিয়েছিলেন, শনির দৃষ্টিতে তাঁর মুণ্ডপাত হয়েছিল। বিষ্ণুর চেষ্টায় গণেশের স্কন্ধে গজমুণ্ড স্থাপন করা হয়েছিল। গণেশের জন্ম থেকে এই অব্দি ঘটনা মহাদেব জানতে না। তিনি তখন ঘরে ছিলেন না। গণেশ জন্মের খবরও তিনি পাননি। কাজেই তাঁর ক্ষেত্রে গণেশকে চেনার কোন প্রশ্নই নেই (দেবাদিদেব হয়েও তিনি পুত্রকে চিনলেন না!)। তিনি যখন ফিরলেন, তখন গণেশ চণ্ডীর ঘরের সামনে পাহারা দিচ্ছিলেন। মহাদেবকে দেবীর ঘরে ঢুকতে বাধা দিলেন। দুজনেই দুজনকে চেনেন না। বাগযুদ্ধ গড়াল শস্ত্রযুদ্ধের দিকে। তাতে গণেশ তাঁর একটি দাঁত খুইয়ে বসলেন। চণ্ডীর মধ্যস্থতায় তাঁদের যুদ্ধ থেমেছিল। বাপব্যাটায় আলাপ হয়েছিল, মিলন হয়েছিল। তার মধ্যেও কি মনে মনে চণ্ডী ক্রোধ পুষে রেখেছিলেন, যার শিকার হলেন মনসা?
শিব-গণেশের যুদ্ধের পর পরিচয় পেয়ে শিব গণেশকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন, তাঁকে দিয়েছিলেন সমস্ত দেবতার আরাধনার সূচনায় পূজা পাবার অধিকার। কিন্তু চণ্ডী? তিনি মহাদেবের কাছে মনসার পরিচয় পেয়েও তাঁকে বুকে টেনে নিলেন না, কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা তো কোন ছার; দূর হয়ে যেতে বললেন চোখের সামনে থেকে। কোন উপায় না দেখে শিব মনসাকে নির্জন সিজুয়া পর্বতে রেখে আসতে বাধ্য হলেন। বাপের ঘরে মনসার ঠাঁই জুটল না।
মনসার জীবনটাই দুঃখ আর বঞ্চনার, তাঁর দেবী হয়ে ওঠার সাধনাও বড়ই করুণ। জন্ম থেকেই বাপ-মার স্নেহ কী জিনিস মনসা বুঝলেনই না। দুই চখাচখির মিলন দেখে শিবের বীর্য স্খলন হয়েছিল, সেই বীর্য তিনি পদ্মপাতায় রেখেছিলেন। সেই পদ্মের নাল বেয়ে বীর্য পৌঁছে গিয়েছিল নাগলোকে। নাগলোকের নাগরাজ সেই বীর্য পেয়ে তা থেকে নির্মাণ করেছিলেন মনসাকে। শিবের মানসকন্যা নন তিনি। তিনি তাঁকে জন্ম দিতেও চাননি। ফলে পাতালে জন্ম হল অবাঞ্ছিত এক দেবীর, যার নাম তবুও হল মনসা। ইচ্ছে থেকে যিনি জন্ম নিয়েছেন, তিনিই ‘মনসা’ বোঝাতে। নাগলোকে তাঁর নাম ছিল ‘পদ্মা’। পদ্মের নাল থেকে তাঁর জন্মবীজ নেমে এসেছিল বলে। সাপেদের সঙ্গে বড় হতে হতে তিনিও তাদের মতো হয়ে উঠেছিলেন স্বভাবে ক্রুর, অসহিষ্ণু। আর এই স্বভাব তাঁর জীবনে শুধু অশান্তি ডেকে এনেছে, আর কিছুই দেয়নি।
বড় হয়ে যখন মর্ত্যলোকে এসেছেন তখন পড়েছেন পিতার নজরে। সে নজর বড় সুনজর নয়। সেই নজরে ছিল কামের আর্তি। মহাদেব নিজের মেয়েকেই চিনতে পারেননি। মনসা যখন নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন, তখন অবশ্য মহাদেব লজ্জা পেয়েছিলেন। মেয়েকে ঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন যোগ্য সম্মান দিয়ে। তারপরই ঘটেছিল মনসার চোখ হারানোর দুর্ঘটনা।
সিজুয়া পর্বত বড় ছোট নানান ধরনের কাঁটা গাছে ছিল ভরা। সেখানেই মহাদেব তৈরি করে দিয়েছিলেন মনসার জন্য ঘর। দু’একজন সখীসঙ্গ পাওয়া ছাড়া সে হল মনসার সমাজ থেকে সংসার থেকে দূরে এক নির্বাসনের সাজা দেওয়া জীবন। চারপাশে শুধু দিনরাত নানান ধরনের বিষধর সাপের হিস হিস সেখানে। এই অবস্থায় সুস্থ চিন্তা আসে কী করে? এই অবস্থায় স্বাভাবিক জীবন কেমন করে কাটানো যায়!
মহাদেব দেখে শুনে জরৎকারু নামের এক ঋষির সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিলেন। ভাবলেন, মেয়ের সংসার গড়ে দিলেন! কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাসে সে সংসারও টিকল না, মনসার সঙ্গে মুনির কিছুতেই বনিবনা হল না। তিনি একমাত্র শিশুপুত্র আস্তিককে নিয়ে স্ত্রীকে ত্যাগ করে চলে গেলেন। মনসার জীবনের নেমে এলো আবার চরম একাকীত্ব, হতাশা, নিজের ওপর নিস্ফল ক্রোধ।
এই রকম অবস্থা থেকে তাঁকে বের করে আনতে সখীরা পরামর্শ দিলেন তাঁকে দেবী হয়ে ওঠার জন্য সাধনা করার। এতে তিনি যেমন আত্মগৌরব উপভোগ করবেন, তেমনি নিজেকে ব্যস্তও রাখতে পারবেন; তাতে তাঁর মনের অচল অবস্থা কাটবে এটাই ছিল সখীদের ভাবনা।
পূজা পেতে গিয়েও মনসাকে যতটা হেনস্থা হতে হয়েছে আর কোন দেবদেবীকে এতটা হতে হয়নি। চাঁদ সদাগরের হাতে হেঁতালের বাড়ি খেয়েছেন, ‘চ্যাং মুড়ি কানি’ বলে গালাগালি শুনেছেন, এমনকি ক্ষমাঘেন্নার মধ্য দিয়ে চাঁদের অপাংক্তেয় বাম হাতে পূজা নিয়ে মর্ত্যে নিজের পূজার প্রচলন মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন। সবদিক থেকেই মনসা সমস্ত দেবলোকের মধ্যে এক ভাগ্যবিড়ম্বিত দেবী, যার জীবনপথ হতাশা, না-পাওয়া আর দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণামুখর কাঁটা বিছানো কঠোর এক পথ। আর এ-কারনেই হয়তো তাঁর পূজায় কাঁটাময় সিজুয়া মনসার গাছ স্থাপন করা হয় বাংলার গাঁ-গঞ্জের মনসার থানগুলিতে, ঐতিহ্যের আড়ালে এও আসলে লোক-দর্শন…
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news