কিশোর ঘোষঃ

ব্যতিক্রমী বাজপেয়ী। অন্তত সাম্প্রতিককালের রাজনীতিতে অটল বিহারী বাজপেয়ী এক অসাধ্য সাধন করে দেখিয়েছেন। কী সেই অসাধ্য? বাজপেয়ী রাজনীতিবিদ হওয়া সত্ত্বেও মানুষ হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য ছিলেন। আজকের ভারতের সাধারণ নাগরিক যা ভাবতে পারে না। তাদের দোষ নেই। আসমুদ্রহিমাচলের রাজনীতির ধুরন্ধর খেলোয়াড়রা ক্রমাগত যেভাবে ভোলবদল করেন, যেভাবে একের পর এক দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন, তাতে করে তাদের বিশ্বাস করা যায়? কখনই যায় না। অতএব, সাধারণ জনতা জেনে গেছেন, তাঁরা ভোট ব্যাংক বৈ কিছু না। আর রাজনীতিবিদরা প্রতি মুহূর্ত সৎ বা অসৎ উপায়ে সেই ভোট নিজের পকেটে ঢোকানোর চেষ্ঠায় মত্ত। এবং দেশজুড়ে টালমাটাল আর্থসামাজিক পরিস্থিতি। এবং হায়, ১৯৮০ সালের তৃতীয় বিশ্ব ২০১৮ সালেও তৃতীয় বিশ্বই থেকে যায়!

মোদ্দা কথা, ক্রমশ স্পষ্ট, যে রাজনীতির সঙ্গে মানবিকতার, ভালো-মন্দের, ন্যায়-নীতির, ভাবাবেগের কোনও সম্পর্ক নেই। কারণ মানুষ এক জিনিস, আর রাজনীতিবিদ আরেক! বিজেপির অন্যতম জনক অটল বিহারী বাজপেয়ী সেই রাজনীবিদদের দলে পড়লেন না। আশ্চর্য ব্যতিক্রম!
অথচ তিনি এবং দীনদয়াল উপধ্যায় জনসঙ্ঘের গোড়ার কার্যকর্তা। অথচ তিনি শ্যামপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে গুরু মানতেন। সবচেয়ে বড় কথা নিজেকে হিন্দু বলতেও বাঁধেনি বাজপেয়ীর। কিন্তু এখানেই থমকাতে হবে আপনাকে। কারণ অটল বিহারী বাজপেয়ী নিজেকে হিন্দু বললেও অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি কখনই অশ্রদ্ধা দেখাননি।
তাঁর মৃত্যুর পর আরও বেশি করে প্রকাশিত হচ্ছে, গোটা ভারতের সব দলের নেতা, মন্ত্রী, তাঁর সতীর্থ, ভাই, বন্ধু বলতে ভুলছেন না, যে বাজপেয়ী পরধর্ম বিদ্বেষী ছিলেন না। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর মানবিক ব্যবহারের কথা যেমন বলছেন সৌগত রায়, তেমনই বলছেন সৌরভ গাঙ্গুলি, লতা মঙ্গেশকররা। তবে দলের নেতারা বা রাষ্ট্র প্রশাসকরা কী বলছেন সেটা বড় কথা না। কারণ তারা ডিপ্লোম্যাটিক প্রোটোকল মেনে শোকবার্তা দিয়ে থাকেন। বরং জননেতাটি প্রকৃত জননেতা ছিলেন কিনা তা বোঝা যায় দেশের সাধারণ মানুষের অভিব্যক্তিতে। যাদের প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধানের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করার কোনও অফিসিয়াল দায় নেই।
এখানেই জিতে গেছেন বাজপেয়ী। তিনি অসুস্থ জানতেই শোকস্তব্ধ হয়েছে দেশ। গতকাল তাঁর মৃত্যু সংবাদ মিডিয়া মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই দেড়শো কোটির দেশ বিহ্বল হয় শোকে। অদ্ভুত এক মন মরা আবহাওয়া তৈরি হয় ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামে ও বড় শহরে। ঠায় টিভির সামনে বসে থেকেছে মানুষ। ইন্টারনেট চালিয়ে দেখেছে অটল বিহারী বাজপেয়ীর মৃত্যু পরবর্তী প্রতিটি আপডেট।

বেদনার এই উৎসাহ বাজপেয়ী আদায় করলেন তাঁর কাজ দিয়েই। প্রশাসক হিসাবে তাঁর কর্মকাণ্ড যে প্রকৃতই প্রশংসার দাবি রাখে তা তাঁর শত্রুও বলবে। আমরা ভুলব না সর্বশিক্ষা অভিযান, পোখরান, সোনালি চতুর্ভুজ, টেলিকমিউনিকেশন বিপ্লব, রাষ্ট্রীয় সংস্থা বেসরকারিকরণ, বিজ্ঞান ও গবেষণায় উৎসাহ দান এবং পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি উদ্যোগের কথা।
তবু, সন্দেহ হয়, আজ যতখানি নিখাদ শোকে মুহ্যমান হল সাধারণ ভারতবাসী, তা কি ওই সফল প্রশাসকের প্রতি শ্রদ্ধায়? মনে হয় না। কারণ অন্য এক বিরল গুণ ছিল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর। যা সচরাচর ভারতের রাজনীতিবিদ কিংবা প্রশাসকদের মধ্যে দেখা যায় না। দুর্নীতির কালিমাহীন, শিক্ষিত, বাগ্মী, মিষ্টভাসি ইত্যাদি গুণের কথাও হচ্ছে না। এমন নেতাও হয়তো মিলবে। বলছি এক আটপৌরে মানুষের কথা। বাজপেয়ীর চরিত্রে ছিল সবার সঙ্গে মিশে যাওয়া এক সৎ মানুষের সুগন্ধ। যা তাঁর দম্ভহীন পোশাকে, সরল চোখেমুখে, প্রাণবন্ত হাসিতে, ক্যাজুয়াল চলা ফেরায় ভেসে উঠত। ভারতের গরিব জনতা যে ওয়েভলেন্থ ছুঁতে পেরেছিল। তারা মনে করেছিল হ্যাঁ হ্যাঁ, এই লোকটাই আমাদের আত্মীয়। মনে রাখতে হবে, চরিত্রের এই চলন আসলে একজন গভীর কবির। দাদা কবিতা লিখতেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জনসংঘের সাহিত্য সম্পাদকই তো ছিলেন তিনি। সবচেয়ে বড় কথা, রাজনীতির ময়দানে অতি ব্যস্ত থেকেও নিজের কবি সত্বাকে মুছে যেতে দেননি অটল বিহারী বাজপেয়ী। লিখেছেন, ‘ম্যাঁয় জি ভর জিয়া, ম্যাঁয় মন সে মরুঁ, লৌটকর আউঙ্গা, কুছ সে কিঁউ ডরুঁ?’
একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী একজন সংবেদনশীল কবিও, এই সমাপতন হয়তো আর সম্ভব হবে না এ দেশের ভাগ্যে!
বিভিন্ন বিষয়ে ভিডিয়ো পেতে চ্যানেল হিন্দুস্তানের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
https://www.youtube.com/channelhindustan
https://www.facebook.com/channelhindustan
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news