পার্থসারথি পাণ্ডা
স্কুলে পড়ার সময়, তখন কতই বা বয়স, এই ধরুন ক্লাস সেভেন এইটের ছাত্র তের চোদ্দ বছরের ছেলে, সেই সময় থেকেই মহম্মদ আজিজ ছিলেন মহম্মদ রফির অন্ধ ভক্ত। ভালোবাসতেন তাঁর গান গাইতে। কম বয়স থেকেই তিনি পাড়ার জলসা, ক্লাবের অনুষ্ঠান প্রভৃতি, যাকে বলে ‘মাচা-প্রোগ্রাম’, তাতে রফির গান গাইতেন। তখন থেকেই ধীরে ধীরে রফিকন্ঠী হিসেবে একদিকে যেমন তিনি খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন, অন্যদিকে তেমনি সিনেমা-পত্রিকার পাতায় সেইসময়ের বিখ্যাত গায়ক-গায়িকা রফি-কিশোর-লতা-আশা-মুকেশদের ছবি, গান রেকর্ডিং-এর ছবি দেখে প্লেব্যাক সিঙ্গার হবার স্বপ্ন দেখা শুরু। সেই স্বপ্ন নিয়ে আরও বছর কয়েক বয়স বাড়ে। এর মধ্যে বাড়ির অভাবে রোজগারের প্রয়োজন তাঁকে মাচা থেকে টেনে নিয়ে আসে কলকাতার বার-ক্লাবে। সেখানেও তাঁর গানের কদর করবার লোকের অভাব হয় না। স্বপ্নের সঙ্গে শ্রোতাদের উৎসাহ তাঁকে বম্বে গিয়ে লড়াই করার আত্মবিশ্বাস এনে দিল।

বাংলার অশোকনগরের ছেলে মহম্মদ আজিজ, বাড়িতে ডাক নাম ‘মুন্না’। পাড়ায়-ক্লাবে-বারে তিনি বেশ গাইছিলেন মহম্মদ রফির গান, কিন্তু ১৯৮০-তে রফি হঠাত মারা যাওয়াতে, রফিকন্ঠী আজিজ যেমন কষ্ট পেলেন, তেমনি ভাবনায় পড়লেন আর তো রফির নতুন গান পাবেন না, এবার কী গাইবেন! পুরনো গানের সঙ্গে শ্রোতারা নতুন গানও তো শুনতে চায়। এবার কী হবে? এখান থেকেই নিজে কিছু একটা করে দেখানোর তাগিদ অনুভব করলেন।
১৯৮২ সাল। বাড়িতে দু’বছর সময় চাইলেন, জানিয়ে দিলেন দু’বছর গায়ক হয়ে ওঠার লড়াই করবেন বম্বেতে, ‘হয়ে’ তাঁকে উঠতেই হবে। কিন্তু বম্বে এসে দেখলেন গান শুনে ‘বাহবা’ বলে পিঠ চাপড়ে দেবার লোক অনেক আছেন, কিন্তু কাজের কথা বললেই ফিরিস্তি অনেক। মিউজিক ডিরেক্টারদের দরজায় দরজায় গিয়ে স্ট্রাগল চলতে থাকে, দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ। শুধুই ধর্না দিয়ে তো আর পেট ভরে না, অভাবী পকেট গড়ের মাঠ, ফলে, কলকাতায় যা করছিলেন, সেই বারে-ক্লাবে গান গাওয়া শুরু করলেন বম্বেতেও। এই পরিস্থিতিতে কোথাও যখন কোন দিশা পাচ্ছেন না, ঠিক তখনই হঠাত তাঁর সঙ্গে আলাপ হল প্রযোজক সংস্থা ‘আফতাব পিকচার্স’ –এর মালিক সেলিম আফতাবের। সেলিম সব শুনে মিউজিক ডিরেক্টার অন্নু মালিকের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ করিয়ে দিলেন। অন্নু তখন বছর দুই হল মিউজিক ডিরেক্টার হিসেবে বলিউডে কাজ শুরু করছেন। আজিজ শুরু করলেন অন্নুর স্টুডিওতে আসাযাওয়া। অন্নু সুর বানান, তিনি বসে থাকেন। ছবিতে গাওয়া আর হয় না।

তারপর একদিন সুযোগ এলো। বাড়িতে। স্টাগল শুরুর ঠিক দু’বছরের মধ্যে, ১৯৮৪’র এক সকালে ঘুম থেকে তুলে তাঁকে ডেকে নিয়ে এলো অন্নুর লোক, তাঁকে দিয়ে গাওয়ানো হল তাঁর জীবনের প্রথম প্লেব্যাক গান। মনমোহন দেশাই পরিচালিত ‘মর্দ’ ছবির টাইটল সঙ—‘মর্দ টাঙ্গেওয়ালা’। কিশোর কুমারের পাশাপাশি তিনিও হয়ে উঠলেন অমিতাভের প্লেব্যাক গায়ক। আজিজ কিশোর কুমারের প্রশংসা তো পেয়েইছেন, এমনকি তাঁর সঙ্গে এগারোখানা গানও গেয়েছেন, ডুয়েট। মহম্মদ রফির পর আজিজ এমন একজন গায়ক ছিলেন, যিনি অনায়াসেই ছুঁতে পারতেন সপ্তম স্বর, নিষাদ। ১৯৮৫-তে মুক্তিপাওয়া ‘মর্দ’ ছবি দিয়ে শুরু করে ২০০১-এ ‘ঢোল বাজা’ অব্দি অসংখ্য ছবিতে তাঁর ফিল্মি গানের সফর। ভারতের প্রায় সমস্ত ভাষাতেই তিনি গান গেয়েছেন। তাঁর ফিল্মি ও নন-ফিল্মি মিলিয়ে তাঁর গানের সংখ্যা প্রায় বিশ হাজার। তিনি সুফি, কাওয়ালি, মুসলিম ভক্তিগীতি যেমন অনায়াসে গেয়েছেন, তেমনই মর্মস্পর্শী স্বাচ্ছন্দ্যে শুনিয়েছেন হনুমান চালিশা, তুলসীদাস ও কবীরের দোঁহা। তিনি অমিতাভ থেকে শুরু করে দিলীপ কুমার, অনিল কাপুর, জ্যাকি শ্রফ, গোবিন্দা, সানি দেওল, রাজেশ খান্নাসহ তিন প্রজন্মের নায়কের লিপে গান গেয়েছেন, লতা-আশা থেকে শ্রেয়া ঘোষাল তিন প্রজন্মের গায়িকার সঙ্গে ডুয়েট গেয়েছেন, নৌশাদ-ওপি নায়ার থেকে শুরু করে সঞ্জীব-দর্শন অব্দি তিন প্রজন্মের মিউজিক ডিরেক্টারের সুরে গান গেয়েছেন। শুধু হিন্দিতেই নয় তাঁর মাতৃভাষা বাংলাতেও অসংখ্য গান গেয়েছেন এবং জনপ্রিয় হয়েছেন। তাঁর প্রথম বাংলা ছবি, ‘জ্যোতি’।

‘পাংচুয়াল’ বলে অভিনেতা অমিতাভের যতটা খ্যাতি, গায়ক মহম্মদ আজিজের ছিল ঠিক ততটাই। ‘পাঁচটা বলতে’ তিনি ‘পাঁচটাই’ বুঝতেন। গায়ক হিসেবে তিনি বেশ কিছু পুরস্কার পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তিনি বলতেন, আশা ও লতার সঙ্গে ডুয়েট গাওয়ার সময় আজিজের স্বর চালনা দেখে তাঁরা যখন ‘বাহ’ বলে উঠতেন, সেটাই ছিল তাঁর শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। অনেক উপেক্ষা অতৃপ্তির মাঝে অগুন্তি শ্রোতার ভালোবাসা তাঁকে দিয়েছিল অফুরান তৃপ্তি, তাই সেই গুণমুগ্ধ শ্রোতাদের জন্যই আজ চলে গিয়েও রেখে গেলেন অবিস্মরণীয় সব গান আর মনে রাখার আর্তি—‘মিতওয়া ভুল না জানা…’
Channel Hindustan Channel Hindustan is Bengal’s popular online news portal which offers the latest news